মায়ের অপেক্ষা
যে মানুষটা বেঁচে থাকলেন সবার জন্য,
তার মৃত্যুর মুহূর্তে পাশে ছিল না কেউ—
এটাই কি প্রবাসের শেষ দেনা?
কুদ্দুছের মা ভোর থেকেই উঠোনে বসে ছিলেন। বয়স হয়েছে, শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না, তবু আজ তাঁর চোখে ঘুম নেই। আজ তাঁর ছেলে ফিরবে। পঁচিশ বছর পর। এই একটা বাক্যই তাঁর সমস্ত কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছিল। তিনি উঠোন ঝাড়ু দিয়েছেন, তুলসীতলায় পানি ঢেলেছেন, ছেলের ঘরের জানালাটা খুলে রেখেছেন—যেন বাতাস ঢুকে বলতে পারে, “সে আসছে।”
মায়ের মনে বারবার একটাই কথা ঘুরছিল—
“এইবার আর কোথাও যাবি না তো, কুদ্দুছ?”
ছেলে ফোনে হেসে বলেছিল,
“না মা, আর না। এবার তোমার কাছেই থাকব।”
এই কথাটুকু তিনি বুকের ভেতর আগলে রেখেছিলেন। বয়সের ভারে যখন চোখে ঝাপসা আসে, তখন এই আশাটুকুই তাঁকে শক্ত করে রেখেছিল। ছেলের শৈশব তাঁর চোখে ভাসছিল—ছোট্ট কুদ্দুছ, খালি পায়ে উঠোনে দৌড়ায়, বাবার মৃত্যুর পর হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া ছেলেটা, যে কখনো কাঁদেনি, শুধু বলেছিল—“আমি আছি মা।”
কুদ্দুছ বিদেশে যাওয়ার দিন তিনি ছেলের কপালে হাত রেখে দোয়া করেছিলেন। জানতেন, এই যাত্রা সহজ নয়। কিন্তু জানতেন, এই ছেলেটা পরিবারের জন্য নিজের জীবনটাকেই বাজি রাখবে। মা হয়ে তিনি বহু রাত নামাজে দাঁড়িয়ে কেঁদেছেন—ছেলের জন্য, তার নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু কোনোদিন ছেলেকে বলেননি—ফিরে আয়। কারণ তিনি জানতেন, ছেলের ফেরার সঙ্গে অনেক মানুষের ভাত জড়িয়ে আছে।
আজ সেই ফেরার দিন।
কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেল। বিকেল নামল। বাড়িতে কেউ ফোন ধরছে না। বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কা দানা বাঁধছিল। মায়ের মন বলছিল—কিছু একটা ঠিক নেই। এই অনুভূতি কোনো যুক্তি মানে না, তবু মা’র মন কখনো ভুল বলে না।
শেষ পর্যন্ত খবরটা এলো।
শুনেই তিনি চুপ করে বসে রইলেন। কান যেন কাজ করছিল না। সবাই কথা বলছে, কাঁদছে, কিন্তু তাঁর কাছে শব্দগুলো আসছিল ভাঙা ভাঙা। তিনি শুধু জিজ্ঞেস করলেন,
“সে কি একবারও ডাকেনি?”
কেউ উত্তর দিতে পারল না।
এই প্রশ্নটাই তাঁকে ভেঙে দিল। যে ছেলেটা সারাজীবন সবার জন্য বেঁচে থাকল, সে কি শেষ মুহূর্তে মাকে ডাকতে পারল না? পাশে কি কেউ ছিল না, যে তার হাতটা ধরবে? বিদেশের রোদে পুড়ে পুড়ে বড় হওয়া এই মানুষটা কি দেশের মাটিতে এসেও একা রইল?
মায়ের চোখে তখন আর জল ছিল না। শুধু এক ধরনের শূন্যতা। তিনি বুঝে গেলেন—প্রবাস শুধু জীবনের সময় নেয় না, শেষ মুহূর্তের সঙ্গটুকুও কেড়ে নেয়।
তিনি কুদ্দুছের ঘরে ঢুকলেন। সবকিছু যেমন ছিল, তেমনই আছে। ছেলের ফেরার জন্য রাখা বিছানা, আলমারির একপাশ খালি করে রাখা জায়গা। তিনি বিছানায় বসে ছেলের কপালে হাত রাখার ভান করলেন। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো—যেন বহু বছরের অপেক্ষা হঠাৎ নিঃশেষ হয়ে গেল।
তিনি ভাবলেন—এটাই কি প্রবাসের শেষ দেনা?
যেখানে মানুষটা সবার জন্য বাঁচে, কিন্তু মরার সময় একা থাকে?
কুদ্দুছের মা জানেন, তাঁর ছেলে কোনো অভিযোগ রেখে যায়নি। সে এমনই ছিল। কিন্তু একজন মা হিসেবে তাঁর প্রশ্ন রয়ে গেল—এই সমাজ, এই রাষ্ট্র, এই পৃথিবী কি কখনো হিসাব করে দেখবে, কত কুদ্দুছ এভাবে একা চলে যায়?
সন্ধ্যার আকাশে আজ আলো কম। উঠোনে বাতাস থমকে আছে। মা চোখ বন্ধ করে দোয়া করেন—
“হে আল্লাহ, আমার ছেলেটা দুনিয়ায় বিশ্রাম পায়নি। ওপারে যেন সে একা না থাকে।”
কুদ্দুছ আর ফিরবে না।
কিন্তু মায়ের অপেক্ষা—
তা কি কখনো শেষ হয়?
চলবে…..