পর্ব ৬: শ্রেণীর দেয়াল
ঢাকার রাস্তায় ভোরের আলো ফোঁটাতে শুরু করেছে। কুদ্দুছ জানে আজকের দিন তার জীবনের জন্য অন্যরকম। সিডনির সেই স্বপ্নময় শহর থেকে এখানে ফিরে এসে সে বুঝতে পারছে—ভালোবাসা শুধু দু’জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের দেওয়াল, শ্রেণীর বিভাজন, এবং পরিবারিক প্রভাব—সবই এখন তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্যাফেতে বসে কফি খেতে খেতে কুদ্দুছ অ্যামেলিয়ার দিকে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত দম বন্ধ করা আবেগ।
“তুমি কি জানো, আজ তোমার সঙ্গে দেখা করা আমার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল।
অ্যামেলিয়া হালকা মাথা নাড়িয়ে বলল, “আমি জানি। কিন্তু আমি চাই তোমার সঙ্গে থাকব, যত ঝুঁকি আসুক না কেন।”
কুদ্দুছ নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “আমার ভিসা, পড়াশোনা, সবই ঝুঁকির মধ্যে। কখনও কখনও মনে হয়, পৃথিবী আমাদের জন্য কোনও জায়গা রাখছে না।”
“পৃথিবী যদি জায়গা না দেয়,” অ্যামেলিয়া বলল, “আমরা নিজেরাই তৈরি করব। একে অপরের জন্য, আমাদের ছোট পৃথিবী।”
তাদের কথায় ছিল অদ্ভুত সাহস, অদ্ভুত দৃঢ়তা। কফির গরম আর বাতাসের হালকা স্পর্শ—সব মিলেমিশে তাদের দু’জনের জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করল।
কিন্তু বাস্তবতা তত সহজ নয়। কয়েকদিন পরে, অ্যামেলিয়ার বাবা জানতে পারলেন মেয়ের বাংলাদেশি ছাত্রের সঙ্গে সম্পর্ক। বাড়িতে প্রবেশ করে তিনি কড়া স্বরে বললেন,
“অ্যামেলিয়া! তুমি কি ভাবছো ঠিক কী করছো? তুমি আমাদের নাম, আমাদের পরিচয়, আমাদের পরিবারের সম্মান লুকিয়ে রেখেছ?”
অ্যামেলিয়া কণ্ঠে অদ্ভুত দৃঢ়তা দিয়ে বলল, “বাবা, আমি চাই আমার হৃদয় শুনবেন। আমি চাই সত্যি অনুভব করতে। কুদ্দুছের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সত্যি।”
“তুমি কি জানো, তুমি কি বিপদের মধ্যে ফেলেছো নিজেকে?” বাবা রাগে বললেন। “আমি তোমার জন্য ভিসা বাতিল করতে পারি, তোমার ভবিষ্যৎ ধ্বংস করতে পারি। তোমার ভালোবাসাৃ এটি শুধু ভুল।”
অ্যামেলিয়ার চোখে অদ্ভুত শান্তি, আর মুখে অদ্ভুত হাসি। “আমি জানি। কিন্তু হৃদয় কখনও ভুল বোঝায় না। এবং কুদ্দুছ—তিনি শুধু আমার হৃদয় বোঝেন।”
সেই রাতে কুদ্দুছ তার ঘরে বসে বারবার ভাবল—“কাল সকালেই ইমিগ্রেশন পুলিশ ধরে নেবে, আমার স্কলারশিপ বাতিল হবে। আমার জীবন যেন এক অস্থির সমুদ্র। তবেৃ অ্যামেলিয়ার সঙ্গে এই মুহূর্তের জন্য সব ঝুঁকি মূল্যবান।”
ফোনে ফিসফিস করে কুদ্দুছ অ্যামেলিয়াকে বলল,
“অ্যামেলিয়া, তুমি ভুল করছ। তোমার এই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আমার অস্থির জীবনে আসাৃ ভুল। আমি হয়তো কালই চলে যাব।”
ফোনের ওপাশ থেকে আসে শান্ত গলায় উত্তর,
“যদি পৃথিবী আমাদের জন্য জায়গা না দেয়, আমরা নিজেদের পৃথিবী বানাব। তুমি চিন্তা করো না, আমি দেখবো তোমাকে কিভাবে।”
কুদ্দুছের চোখে অদ্ভুত দম বন্ধ অনুভূতি। এই দৃঢ়তা, এই সাহস—কোনও বইয়ে লেখা নয়, কোনও প্রভাবশালী পরামর্শে শেখানো নয়। এটি শুধু সত্যি ভালোবাসার শক্তি।
একদিন, তারা কফে বসে আবার গল্প করতে লাগল। অ্যামেলিয়া বলল,
“আমি জানি, আমরা নিঃসন্দেহে বিপদের মধ্যে। তবে আমি চাইৃ আমি তোমার পাশে থাকব।”
কুদ্দুছ চোখে অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল। “আমার ভিসা, পড়াশোনা, সব কিছু হুমকির মধ্যে, কিন্তু যদি তোমার হাত আমার হাতে থাকে—সব ঝুঁকি সহজ হয়ে যায়।”
তাদের সংলাপগুলো ছোট, সরল, কিন্তু হৃদয় স্পর্শ করে। কফির গরম আর বাতাসের নরমতা—সব মিলেমিশে একটি অদ্ভুত পৃথিবী তৈরি করল।
“তুমি কি জানো,” কুদ্দুছ ফিসফিস করে বলল, “আমি কখনও ভেবিনি যে কারো চোখে এত দৃঢ়তা থাকতে পারে। তুমি শুধু ভালোবাসো না, তুমি দেখাও কিভাবে ভালোবাসা সম্ভব।”
অ্যামেলিয়ার চোখে জ্বলজ্বলানি। “আমি জানি। আমি এখানে আছি। এবং থাকব।”
হঠাৎ, বাইরে বাতাসের শব্দ। কফের কাপের গরম হালকা স্পর্শ দিয়ে তাদের দু’জনের হাত একে অপরের হাতে মিলল।
“এটাই আমাদের পৃথিবী,” কুদ্দুছ বলল।
“হ্যাঁ,” অ্যামেলিয়া হেসে বলল, “আমাদের নিজের ছোট পৃথিবী। পৃথিবী যত বাধা দিক না কেন।”
সেই রাত, তারা শুধু চোখে চোখ মিলিয়ে বসে ছিল। শব্দ নয়, অনুভূতি। ক্যাফের হালকা আলো, কফির গরম—সব মিলেমিশে তাদের এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করল।
“শোনো,” কুদ্দুছ ধীরে বলল, “যদি পৃথিবী আমাদের জন্য দরজা বন্ধ করে দেয়, আমরা জানি—আমরা নিজেই জানলা খুলব।”
অ্যামেলিয়ার চোখে অদ্ভুত রোমাঞ্চ। “আমি জানি। আমরা একে অপরকে হারাব না।”
“শ্রেণীর দেয়াল যত উঁচু হোক না কেন, আমাদের চোখে চোখের পৃথিবী সব বাধা পার হবে—যেখানে ভালোবাসা সবকিছুর চেয়ে শক্তিশালী।
চলবে........