পর্ব ৩: দুই জগতের ছায়া
ঢাকার কফের আলো থেকে বেরিয়ে সিডনির রাস্তায় কুদ্দুছ ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার হাতে ল্যাপটপ, মাথায় ভারি চিন্তা। অ্যামেলিয়ার কথা বারবার মনে হচ্ছে—তার চোখে কৌতূহল, তার মুখে অদ্ভুত এক আনন্দের ঝিলিক।
কিন্তু বাস্তবতা ছাড়ায় নয়। কুদ্দুছ জানে, তার জীবন এক অস্থির সমুদ্র। স্কলারশিপের সময়সীমা, ভিসার নিয়ম, পড়াশোনার চাপ—সবই তার পিছনে ঘুরছে। তবে আজ, অ্যামেলিয়ার চোখে দেখা নতুন সম্ভাবনা তার মনকে চঞ্চল করে দিচ্ছে।
একদিন ক্যাফেতে বসে কফি খেতে খেতে তারা গল্প করতে লাগল।
“তুমি জানো, কুদ্দুছ,” অ্যামেলিয়া বলল, “আমার জীবন সবসময় প্রস্তুত, নিয়মমাফিক। তবে ভিতরে এক শূন্যতা আছে, যা কেউ বুঝতে পারবে না।”
কুদ্দুছ একটু দূরে তাকিয়ে বলল, “আমি জানি। আমি ঢাকা শহরের ভিড়, গ্রামের মেঠো পথ—সব দেখেছি। তবে বুঝতে পারি, সুখ কোথায়। এবং যে মানুষ সত্যিই শোনার চেষ্টা করে, সে তা অনুভব করতে পারে।”
অ্যামেলিয়া হেসে বলল, “তুমি তো শুধু গল্প বলছ। তুমি কি জানো, আমার বাবার জীবন কেমন?”
“না,” কুদ্দুছ ধীরে বলল, “তুমি বলো। আমি শুনব।”
অ্যামেলিয়ার চোখে হালকা বিষণ্ণতা ভেসে উঠল। “বাবা ব্যবসায়িক প্রভাবশালী। ধন, ক্ষমতা, আভিজাত্য। তবে তার জন্য আমার জীবন শুধু একটি সংখ্যা। একা, নিঃস্ব, বন্দি।”
কুদ্দুছ তার ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আমার জীবন হয়তো ছোট, সীমিত। তবে এখানে, এই কফের গরম বাতাসে, আমি স্বাধীন।”
অ্যামেলিয়ার চোখে বিস্ময়। “স্বাধীন?”
“হ্যাঁ। আমি বলতে চাই, স্বাধীনতা হলো নিজের গল্প নিজের চোখে দেখা। আমার শহর, আমার মানুষ, আমার সুখ—সবই ছোট, তবে সত্য।”
একটু নিঃশ্বাস নিল অ্যামেলিয়া। “আমি কখনও এমন কিছু ভাবিনি। সবই পরিকল্পিত। সবই সম্পদ, প্রভাব, আভিজাত্য। তবে তোমার চোখে সত্যি। তুমিৃ তুমি এক ধরনের মুক্তি দেখাচ্ছ।”
দু’জনের মধ্যে মুহূর্তের নীরবতা। কফির গরম, বাতাসের হালকা ছোঁয়া, মানুষের দূরত্ব—সবই মিলেমিশে এক অদ্ভুত শান্তি তৈরি করল।
কিন্তু তাদের শান্তি দীর্ঘ স্থায়ী নয়। কয়েকদিন পরে, অ্যামেলিয়ার বাবা জানতে পারলেন তার মেয়ে এক বাংলাদেশি ছাত্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা অল্প প্রেমিক সম্পর্ক শুরু করেছে।
বাড়িতে, সন্ধ্যার আলো নেমে আসে। অ্যামেলিয়া পেছনে ফিরে তাকিয়ে কেবল কফির কাপটা ধরল। বাবা প্রবেশ করলেন, কড়া স্বরে বললেন,
“অ্যামেলিয়া, তুমি কি ভাবছো ঠিক কী করছো? তুমি আমার বাড়ি, আমার নাম, আমার পরিচয় লুকিয়ে কোনো ছাত্রের সঙ্গে?”
অ্যামেলিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “বাবা, আমিৃ আমিৃ আমি শুধু চাই সত্যি অনুভব করতে।”
“তোমার এই অনুভূতি, এই অবাস্তব ভালোবাসাৃ এটা তোমার জন্য বিপদ ডেকে আনবে। তুমি বুঝছো?” বাবা রাগে কণ্ঠে কড়া স্বর।
অ্যামেলিয়া নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “আমি জানি, কিন্তু আমার হৃদয় যা চায় তা আমি লুকাতে পারি না। কুদ্দুছের চোখে আমি দেখেছি এক জীবনের সত্য।”
কুদ্দুছ অন্যদিকে, তার ছোট আবাসে বসে রাত জেগে ভাবল—“কাল সকালেই হয়তো ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। আমার স্কলারশিপ বাতিল হবে, অথবা একদিন রাস্তায় জীবনটা নিয়ে নেবে।”
ফোনে ফিসফিস করে সে অ্যামেলিয়াকে বলেছিল,
“অ্যামেলিয়া, তুমি ভুল করছো। তোমার ভালবাসা অবাস্তব, অকল্পনীয়। তোমার এই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আমার অনিশ্চিত জীবনে আসাৃ ভুল। আমি হয়তো কালই চলে যাব।”
ফোনের ওপাশ থেকে শান্ত গলায় আসে উত্তর,
“পৃথিবী যদি আমাদের জায়গা না দেয়, আমরা আমাদের নিজের একটি পৃথিবী বানাব। তুমি চিন্তা করো না, আমি দেখবো তোমাকে কিভাবে।”
কুদ্দুছের চোখে অদ্ভুত দম বন্ধ অনুভূতি। এই দৃঢ়তা, এই সাহস—কোনও বইয়ে লেখা নয়, কোনও প্রভাবশালী পরামর্শে শেখানো নয়। এটি শুধু সত্যি ভালোবাসার শক্তি।
কয়েক রাত পরে, তারা ক্যাফেতে মিলিত হল। অ্যামেলিয়া বলল,
“আজ আমি যাব। এক রাতের জন্য, শুধু পাসপোর্ট, কিছু কাপড় আর সামান্য টাকা। তুমি আমার পাশে থাকো।”
কুদ্দুছ অবাক, “তুমি কি একা?”
“হ্যাঁ, কিন্তু তুমি আছো।” তার চোখে অদ্ভুত শান্তি, রোমাঞ্চ, এবং জেদ।
সেই রাতের অন্ধকারে, তারা বিমানবন্দরে পৌঁছাল। কুদ্দুছের মনে হলো, এটি কোনো সাধারণ যাত্রা নয়। এটি এক যুদ্ধ, এক স্বাধীনতার যুদ্ধ। এক জীবনের মুক্তি, আরেকজনের জীবনের স্বাধীনতা।
হাত ধরে বোর্ডিং গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে, কুদ্দুছ মনে করল—ভিসার যান্ত্রিক ঝুঁকি, বিদেশের কঠিন জীবন—সবকিছুর চেয়ে অ্যামেলিয়ার হাতটা ধরা অনেক বেশি জরুরি।
“আমাদের যাত্রা আজ শেষ না, তবে নতুন সূচনা,” কুদ্দুছ ধীরে বলল।
অ্যামেলিয়া হেসে বলল, “আমাদের পৃথিবী তৈরি হবে, তুমি দেখবে।”
সেদিন, তাদের হৃদয়ে এক অদৃশ্য বন্ধন আরও দৃঢ় হলো। সামাজিক শ্রেণীর দেয়াল, প্রভাব, বিপদ—সবই কিছু সময়ের জন্য থেমে গেল। শুধু দুইটি হৃদয়, এক অদৃশ্য পৃথিবী বানাচ্ছে।
“দুই জগতের ছায়া মিলেছে, এক অদ্ভুত পৃথিবীতে—যেখানে ভালোবাসা সবকিছুর চেয়ে বড়।”
চলবে..........