রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আসন ঢাকা–৮ থেকে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এলাকায় তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উপস্থিতি, সাংগঠনিক শক্তি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে এবারও তিনি বিজয়ী হবেন—এমন প্রত্যাশা করছেন শাহজাহানপুরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষ। এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে যত ধরনের অপপ্রচারই চালানো হোক না কেন, মাঠের বাস্তবতায় তার জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, এলাকার মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থনের প্রতিফলন আবারও ভোটের ফলাফলে দেখা যাবে।
আব্বাস উদ্দিন আহমেদ—যিনি মির্জা আব্বাস নামেই অধিক পরিচিত—বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত ও আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, সংগঠক ও ব্যবসায়ী। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত এই নেতা ঢাকার রাজনীতিতে আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
মির্জা আব্বাসের জন্ম ১৯৫১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তার পিতার নাম আব্দুর রাজ্জাক এবং মাতার নাম কমলা খাতুন। জন্ম কিশোরগঞ্জে হলেও শৈশবকাল থেকেই তার বেড়ে ওঠা ঢাকার শাহজাহানপুর এলাকায়। পারিবারিক সূত্রে তিনি ঢাকার একটি পুরোনো জমিদারি পরিবারের উত্তরসূরি। জানা যায়, তার দাদার মালিকানায় একসময় শাহজাহানপুর এলাকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ছিল। ফলে ঢাকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্ক বহু পুরোনো।
শিক্ষা ও ছাত্রজীবন
স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর ১৯৬৬ সালে তিনি তৎকালীন নাজিম উদ্দীন ভূইয়া ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তীতে মদনপুর এলাকার অধীনে বাণিজ্য শাখা থেকে ১৯৭১ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। রাজনীতি ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যার প্রতি তার আগ্রহই তাকে পরবর্তীতে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পথে নিয়ে আসে।
পারিবারিক জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা আব্বাস ১৯৮৩ সালের ১৩ জানুয়ারি আফরোজা আব্বাসকে বিবাহ করেন। আফরোজা আব্বাস বিএনপির অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের সংসারে দুই ছেলে ও এক কন্যা রয়েছে। রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারকে সময় দেওয়া এবং পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখার বিষয়টি তার ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে পরিচিত।
ব্যবসা ও সামাজিক অবদান
রাজনীতির পাশাপাশি মির্জা আব্বাস ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ‘মির্জা এন্টারপ্রাইজ’ নামে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হন। পরে তিনি ঢাকা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৯৫ সালে তাকে ঢাকা ব্যাংকের বিকল্প পরিচালক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং একই বছরের ২৯ মার্চ তিনি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান।
সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রেও অবদান রাখেন। ১৯৮০ সালে ঢাকার শাহজাহানপুর এলাকায় নারী শিক্ষার প্রসারে ‘মির্জা আব্বাস মহিলা কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
রাজনীতিতে পথচলা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠার পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মির্জা আব্বাস বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি দলের প্রথম দিককার নেতাদের একজন। ১৯৮০-এর দশকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঢাকায় আন্দোলন সংগঠনে তার ভূমিকা দলীয়ভাবে বিশেষভাবে মূল্যায়িত হয়।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। ওই আন্দোলনের সাফল্যের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা–৬ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরের ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত তিনি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের ১৯ মে তিনি অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৯৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নগর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় ঢাকা–৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সংসদে তিনি ভূমিমন্ত্রী এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০০১ সালের ১১ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার মেয়াদকালেই ২০০৬ সালে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সংশোধিত আইন পাস হয়, যা নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
মির্জা আব্বাস ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মামলার কারণে এবং ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অংশ নিতে পারেননি। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা–৮ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিতি
ঢাকার রাজনীতিতে মির্জা আব্বাস কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে সুপরিচিত। তার অনুসারীদের দাবি, ঢাকায় তার কয়েক লক্ষ কর্মী-সমর্থক রয়েছে। কর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো, ব্যক্তিগত খোঁজখবর রাখা এবং সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখার কারণে তার একটি শক্ত কর্মীবাহিনী গড়ে উঠেছে।
তবে তার জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী মনে করে—মির্জা আব্বাসকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে পারলে ঢাকার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার সহজ হবে।
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা মির্জা আব্বাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার রাজনৈতিক জীবন সাফল্য, বিতর্ক এবং উত্থান-পতনে ভরপুর। সমর্থকদের কাছে তিনি সাহসী, কর্মীবান্ধব ও পরীক্ষিত নেতা; আর সমালোচকদের কাছে তিনি বিতর্কিত এক রাজনৈতিক চরিত্র। তবে এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—ঢাকার রাজনীতিতে মির্জা আব্বাস একটি প্রভাবশালী ও আলোচিত নাম, যাকে বাদ দিয়ে নগর রাজনীতির হিসাব করা কঠিন।