ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১০:০৭:৩৮ PM

নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও গুজবে টানটান পরিস্থিতি

মান্নান মারুফ
22-01-2026 08:12:43 PM
নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও গুজবে টানটান পরিস্থিতি

আর মাত্র ১৭ দিন পর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা করেছে, প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে এবং ভোটগ্রহণের দিন-ক্ষণ নির্ধারিত রয়েছে। কাগজে-কলমে সব প্রস্তুতি এগিয়ে চললেও বাস্তবে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এখনো স্পষ্ট অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বিশেষ করে একাংশ সচেতন ও অভিজ্ঞ ভোটার আদৌ নির্বাচন হবে কি না—সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না। নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল ও চায়ের আড্ডায় নানা ধরনের গুজব ও আলোচনা ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ বলছেন, শেষ মুহূর্তে নির্বাচন স্থগিত হতে পারে। আবার কেউ দাবি করছেন, নির্বাচনের পরিবর্তে জাতীয় সরকার গঠনের মতো কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটতে পারে রাষ্ট্র। এসব আলোচনা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে এবং নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে।

বিএনপি ঘিরে নানা আলোচনা ও সন্দেহ

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বিএনপিকে ঘিরে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বিএনপিকে নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন মন্তব্যে বলা হচ্ছে, দলটির ভেতরে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ইস্যু বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

দাবি করা হচ্ছে, বিএনপির বিদ্রোহী ৯৭ জন প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৫০ জনের দলীয় পদ-পদবি থাকলেও আদর্শিকভাবে তারা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। এসব নেতা বিএনপির নাম ব্যবহার করলেও ভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য ও স্বার্থে কাজ করছেন। ফলে দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশ অমান্য করার মতো সাহস তারা পাচ্ছেন। অনেকের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় ফেলতে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হতে পারে।

এ বিষয়ে বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী প্রকাশ্যে ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙার এই প্রবণতা নির্বাচনের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং দলের ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে।

রাজনৈতিক কৌশল ও পাল্টা ব্যাখ্যা

অন্যদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন মতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, একটি রাজনৈতিক দলের কৌশলগত খেলায় বিএনপি জড়িয়ে পড়েছে এবং তারা সেটি এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। আবার অনেকে মনে করেন, এসব আলোচনা অতিরঞ্জিত এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন সময়মতোই অনুষ্ঠিত হবে।

তাঁদের যুক্তি হলো—বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচন স্থগিত বা ভিন্ন পথে যাওয়ার সুযোগ সরকারের জন্য খুব সীমিত। দেশের ভেতরে ও বাইরে নানা চাপ, কূটনৈতিক বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সময়মতো নির্বাচন আয়োজনই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তার পেছনে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সন্ত্রাসীদের হাতে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও হতাশা তৈরি করছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে নির্বাচনের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে। অনেকের মতে, এতে নির্বাচনের অংশগ্রহণমূলক চরিত্র প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থেই নেওয়া উচিত।

আঞ্চলিক ও কূটনৈতিক চাপ

নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনেও অস্থিরতা বিরাজ করছে।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, একটি রাজনৈতিক দল প্রতিবেশী একটি দেশে অবস্থান করে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এসব কর্মকাণ্ড দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে এবং নির্বাচনী পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।

সাধারণ মানুষের হতাশা ও অর্থনৈতিক চাপ

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়িয়েছে। অনেক ভোটার মনে করছেন, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে সংঘাতে লিপ্ত থাকলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা তেমনভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও মিশ্র। একদিকে পরিবর্তনের আশা, অন্যদিকে নির্বাচন আদৌ হবে কি না—এই দ্বিধা ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমান বাস্তবতা গভীরভাবে বিবেচনা করছে এবং একটি গ্রহণযোগ্য ও সময়োপযোগী নির্বাচন আয়োজনের ওপর জোর দিচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, নির্বাচনই চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট থেকে উত্তরণের প্রধান পথ।

সরকারি পর্যায়ে বারবার বলা হচ্ছে, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের বর্তমান সংকটের সমাধান সম্ভব। তাঁরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংযম, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্য ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক ভুল হিসাব দেশকে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে সংকট মোকাবিলায় দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।

সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশ একটি সংবেদনশীল সময় পার করছে। গুজব, অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে এবং দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সবার আগে প্রয়োজন ভোটারদের আস্থা ফেরানো। আর সে জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচন।