আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীর রাজনীতিতে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন চিকিৎসক ও গবেষক তাসনিম জারা। ঢাকা–৯ আসন থেকে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্বল্প সময়ের রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে শান্ত, ভদ্র ও যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক আচরণ উপস্থাপন করেছেন, তাতে তার প্রতি সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ ও প্রত্যাশা ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচনের আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন তাসনিম জারা। তার এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা থাকলেও ব্যক্তিগত আচরণ ও প্রচারণার ধরনে তিনি নিজেকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে সক্ষম হয়েছেন—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শান্ত ও সংযত রাজনীতির প্রতিচ্ছবি
নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে তাসনিম জারাকে কখনোই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কটূক্তি বা অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য করতে দেখা যায়নি। ঢাকা–৯ আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হলেও জারা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তার মতে, “সাধারণ মানুষই ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। অন্যকে আক্রমণ করে নয়, মানুষের কাছে গিয়ে নিজের কথা বলাই রাজনীতির সঠিক পথ।”এই মনোভাবই তাকে অন্যান্য প্রার্থীদের থেকে আলাদা করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। এলাকায় তার চলাফেরা, কথা বলার ভঙ্গি এবং আচরণে একটি ভদ্র ও মেধাবী রাজনীতিকের ছাপ স্পষ্ট—এমন মন্তব্য করছেন অনেকেই।
ঢাকা–৯ এ ভোটের সমীকরণ
ঢাকা–৯ আসনে তাসনিম জারাকে ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার, নারী ভোটার এবং পেশাজীবীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি। যদিও ভোটের হিসাবের দিক থেকে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে তার লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাসনিম জারাকে ঘিরে বড় কোনো বিতর্ক না থাকায় তিনি একটি “পরিষ্কার ভাবমূর্তির” প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন। এ কারণে সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তার দিকে ঝুঁকতে পারে।
জন্ম, শিক্ষা ও বেড়ে ওঠা
তাসনিম জারা জন্মগ্রহণ করেন ৭ অক্টোবর ১৯৯৪ সালে ঢাকায়। তিনি রাজধানীতেই বেড়ে ওঠেন। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে, যেখানে তিনি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে এবং সেখান থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পরে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং এভিডেন্স-বেইজড হেলথ কেয়ার বিষয়ে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি লাভ করেন।
চিকিৎসা পেশা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
চিকিৎসক হিসেবে তাসনিম জারা তার কর্মজীবন শুরু করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে। পরে তিনি ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৯ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি হাসপাতালসমূহে অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা বিভাগের রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একই সঙ্গে তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল স্কুলে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সুপারভাইজারের পদে উন্নীত হন।
স্বাস্থ্যখাতে উদ্যোক্তা ও গবেষক
তাসনিম জারা ‘সহায় হেলথ’ নামের একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এই প্ল্যাটফর্মটি বাংলাভাষী মানুষের জন্য প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যতথ্য সহজভাবে উপস্থাপন করে। ২০২৩ সালে তিনি ‘সহায় প্রেগন্যান্সি’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপ উন্নয়নের নেতৃত্ব দেন, যা গর্ভবতী নারীদের জন্য সপ্তাহভিত্তিক তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করে।
গবেষক হিসেবেও তিনি সক্রিয়। আন্তর্জাতিক পর্যালোচিত জার্নাল যেমন ঔঅঈঈ: ঈধৎফরড়াধংপঁষধৎ ওহঃবৎাবহঃরড়হং এবং ঋৎড়হঃরবৎং রহ এষড়নধষ ডড়সবহ’ং ঐবধষঃয–এ তার একাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
সমাজকর্ম ও সামাজিক সচেতনতা
২০১৪ সালে তাসনিম জারা জাতিসংঘের বাংলাদেশ যুব উপদেষ্টা প্যানেলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই ভূমিকায় তিনি যুবসম্পৃক্ততা ও নীতিনির্ধারণ বিষয়ে জাতিসংঘকে পরামর্শ প্রদান করেন।
২০১৬ সালে নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানে গয়না ও মেকআপ ছাড়াই দাদীর রেখে যাওয়া একটি সাধারণ সাদা শাড়ি পরার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি সামাজিকভাবে আলোচনায় আসেন। এই ঘটনা নারীদের উপর আরোপিত সৌন্দর্যচাপ নিয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনা তৈরি করে।
এ ছাড়া তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছেন এবং স্কুল পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ডিজিটাল মাধ্যমে প্রভাব
কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে তাসনিম জারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলায় স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন। টিকা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে তার ভিডিও ব্যাপক সাড়া ফেলে। তার এই উদ্যোগ নিয়ে বিবিসি, স্কাই নিউজ, আইটিভি ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস–সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
রাজনীতিতে যাত্রা
২০২৪ সালের শেষ দিকে তাসনিম জারা সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সংগঠনটি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে রূপ নিলে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হন।
তবে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে অবস্থান নিয়ে ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন।
চিকিৎসক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী হিসেবে পরিচিত তাসনিম জারা এখন নিজেকে উপস্থাপন করছেন একজন ভদ্র, যুক্তিনির্ভর ও আধুনিক রাজনীতিক হিসেবে। ঢাকা–৯ আসনে তার প্রার্থিতা রাজধানীর রাজনীতিতে এক নতুন ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল যাই হোক, শান্ত ও সংযত রাজনীতির একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে তাসনিম জারা ইতোমধ্যে আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছেন—এ বিষয়ে দ্বিমত খুব কম।