বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নাহিদ ইসলাম একটি ব্যতিক্রমী নাম। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের এক জীবন্ত প্রতীক। তরুণ প্রজন্মের সাহস, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রতিনিধিত্বকারী এই নেতা রাজনীতিতে এসেছেন ভিন্ন এক পথ ধরে—ঢাকঢোল বা জাঁকজমক ছাড়াই, সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও আস্থাকে পুঁজি করে। নাহিদ ইসলামকে ঘিরে সবচেয়ে বড় যে পরিচয়টি গড়ে উঠেছে, তা হলো—তিনি অহংকারহীন একজন মানুষ। ব্যক্তিজীবনে সাদামাঠা, চলাফেরায় বিনয়ী এবং আচরণে মিষ্টভাষী। মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাওয়ার যে গুণটি তাঁর মধ্যে রয়েছে, সেটিই ধীরে ধীরে তাঁকে রাজনীতির উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষিত তরুণ সমাজ—সব মহলেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা চোখে পড়ার মতো।
ছাত্র আন্দোলন থেকে জাতীয় রাজনীতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার সময় থেকেই নাহিদ ইসলাম সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক। সেই আন্দোলন কেবল ছাত্রদের দাবি-দাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা একসময় জাতীয় গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পথ তৈরি করে।
এই আন্দোলনের সময় নাহিদ ইসলাম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, সংগঠন ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে। তরুণদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন একজন নির্ভরযোগ্য মুখ—যিনি কথা বলেন যুক্তিতে, নেতৃত্ব দেন দায়িত্ববোধে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা
২০২৪ সালের আগস্টে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে নাহিদ ইসলাম ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অল্প বয়সে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আরও পরিপক্ব করে তোলে।
২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি স্বেচ্ছায় উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় থাকার চেয়ে তিনি গণভিত্তিক রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এরপরই তিনি পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ১০-দলীয় জোট
নাহিদ ইসলাম বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক। দলটি তরুণদের নেতৃত্বে একটি বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এনসিপি বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীসহ আরও কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গঠিত ১০-দলীয় জোটের অংশ।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই জোট অংশ নিচ্ছে। জোটের যৌথ প্রতীক হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ এবং এনসিপির নিজস্ব প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা কলি’ ব্যবহারের ঘোষণা এসেছে।
ঢাকা-১১ আসনে নির্বাচনী বাস্তবতা
নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ (রামপুরা, বাড্ডা ও ভাটারা) আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এলাকাটিতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি, যারা মূলত বাস্তব কাজ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগকে গুরুত্ব দেন।
নাহিদ ইসলামের নির্বাচনী প্রচারণার একটি বিশেষ দিক হলো—তিনি ঢাকঢোল ছাড়াই মাঠে রয়েছেন। বড় মিছিল, ব্যানার বা পোস্টারের পরিবর্তে তিনি মানুষের বাড়িতে যাচ্ছেন, কথা বলছেন সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে। এই সরল প্রচার কৌশল ইতোমধ্যেই সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সম্ভাবনা
এই আসনে নাহিদ ইসলামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুমকে। স্থানীয় ভোটার নুরউদ্দিন জানান, “এই আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে নাহিদ ইসলামের জনপ্রিয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশি।”
বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ, তরুণ ভোটার ও প্রথমবার ভোট দেওয়া নাগরিকদের মধ্যে নাহিদ ইসলামের প্রতি আলাদা এক আস্থা তৈরি হয়েছে। তারা তাঁকে দেখে একজন ‘নিজেদের মানুষ’ হিসেবে—যিনি ক্ষমতার ভাষা নয়, জীবনের ভাষায় কথা বলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদ ইসলাম একদিকে ২০২৪ সালের আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক, অন্যদিকে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান। এই দ্বৈত পরিচয় তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তিনি শুধু অতীত আন্দোলনের স্মৃতি নন, বরং ভবিষ্যতের নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি।
তাঁর বয়স, শিক্ষা, আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং অহংকারহীন ব্যক্তিত্ব—সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা প্রতিনিধিত্ব করছেন। যদি এই ধারা বজায় থাকে, তাহলে ঢাকা-১১ আসনে তাঁর বিজয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের এক নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি মানেই কেবল ক্ষমতা নয়—রাজনীতি হতে পারে সেবা, দায়িত্ব ও মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম। ঢাকা-১১ আসনের নির্বাচন শুধু একটি আসনের লড়াই নয়; এটি মূলত পুরোনো রাজনীতির সঙ্গে নতুন রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটি দেশের তরুণ নেতৃত্বের সম্ভাবনাও নির্ধারণ করবে।