পর্ব–৫ : বেঁচে থেকেও মৃত্যু
ঘরের ভেতর আজ একজন নতুন মানুষ।এই কথাটা সমাপ্তি প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। নীল যখন তাকে না জানিয়ে কাউকে নিয়ে এসেছে—সে শুধু টের পেয়েছিল, ঘরের বাতাস হঠাৎ বদলে গেছে। যেন পরিচিত দেয়ালগুলোও আজ অপরিচিত।
নীলের মা–বাবা নতুন মানুষটিকে সাদরে গ্রহণ করলেন। মুখে হাসি, কণ্ঠে সৌজন্য। কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। কেউ কিছু বলল না। যেন এটাই স্বাভাবিক। যেন সমাপ্তির অস্তিত্বটাই সেখানে অপ্রয়োজনীয়।
সমাপ্তি দাঁড়িয়ে ছিল দরজার পাশে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখে পানি জমেছিল, কিন্তু পড়ছিল না। সে ভাবছিল—
আমি কি কিছু বলব?
আমার কি কিছু বলার অধিকার আছে?
কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না।
নতুন মানুষটি—একজন নারী—চুপচাপ বসে ছিল। চোখ নামানো। কিন্তু তার উপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে বড় ঘোষণা। সমাপ্তি বুঝে গিয়েছিল—সব শেষ।
সে ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। বুকের ভেতর যেন কেউ পাথর চাপা দিয়েছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল—নীরবে, শব্দহীন।
এই কাঁদা আর কান্না নয়।
এটা ছিল ভিতর থেকে ভেঙে পড়া।
কিছুক্ষণ পর শাশুড়ির ডাক—
—“সমাপ্তি, রান্না কর। সবাই খাবে।”
এই ডাকটা যেন তাকে বাস্তবতার মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল। সে উঠে বসেছিল। চোখ মুছেছিল। কিন্তু আয়নায় নিজের মুখ দেখে চমকে উঠেছিল। এই মুখটা কি তারই? এতটা ফ্যাকাশে, এতটা শূন্য?
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে তার হাত কাঁপছিল। আগুন জ্বলছিল চুলায়, কিন্তু তার ভেতরে যেন আরও বড় আগুন জ্বলছে। মাথার ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—
আমি এখানে কেন?
আমার দরকারটাই বা কী?
ঠিক তখনই প্রথমবারের মতো তার মাথায় আত্মহত্যার চিন্তা আসে।
ভাবনাটা ভয়ানক ছিল। তবু আশ্চর্যভাবে সহজ লাগছিল। সব শেষ করে দেওয়া। আর কিছুই ভাবতে হবে না। আর কাউকে বোঝাতে হবে না।
কিন্তু তারপরই পেটের ভেতর হালকা একটা নড়াচড়া অনুভব করল সে।
সন্তান।
এই শব্দটাই তাকে থামিয়ে দিল।
সে ফিসফিস করে বলল,
—“আমি একা নই।”
এই সন্তান তাকে বাঁচতে বাধ্য করছে। অথচ এই সন্তানই তাকে আটকে রেখেছে।
সমাজ কী বলবে—এই ভয় তাকে চুপ করিয়ে রেখেছে।
মা কী বলবেন—এই ভাবনায় সে মুখ খুলতে পারছে না।
শাশুড়ি–শ্বশুরের চোখে সে কেবল একজন মেয়ে—যার কাজ সংসার টিকিয়ে রাখা।
নীল?
আজ নীলই সবচেয়ে দূরের মানুষ।
সে বুঝে গেছে—তার পাশে কেউ নেই।
না শাশুড়ি।
না শ্বশুর।
না মা–বাবা।
না স্বামী।
এই নিঃসঙ্গতা এতটাই তীব্র যে সে যেন বেঁচে থেকেও মরে যাচ্ছে।
রাতে সবাই এক ঘরে। হাসি, কথা, নতুন মানুষটিকে ঘিরে ব্যস্ততা। আর সমাপ্তি নিজের ঘরে একা বসে আছে। দরজার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে। সে সেই আলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছে—
এই আলোটা কি আমার জন্য?
সে কাকে বলবে তার বিপদের কথা?
কাকে বলবে—সে আর পারছে না?
কার কাছে গিয়ে বলবে—তার বাঁচার অধিকার আছে?
সমাজ তাকে শিখিয়েছে—মেয়েরা সহ্য করে।
সংসার ভাঙে না।
নিজেকে ভাঙে।
আজ সে সেই শিক্ষার চরম মূল্য দিচ্ছে।
নীলের মায়ের চোখে সে কোনো প্রশ্ন দেখেনি। দেখেছে শুধু নিশ্চয়তা—সব ঠিকই আছে।
নীল তার দিকে তাকায়নি। তাকালে হয়তো নিজের অপরাধ দেখতে পেত।
সমাপ্তি বুঝে গেছে—এই ঘরে সে এখন অতিথি।
অপ্রয়োজনীয় অতিথি।
সে বিছানায় শুয়ে পেটের ওপর হাত রাখে। চোখ বন্ধ করে বলে,
—“আমি জানি না ভবিষ্যৎ কী। কিন্তু তুমি যদি বাঁচতে চাও, আমাকেও বাঁচতে হবে।”
এই কথাটাই এখন তার একমাত্র শক্তি।
আজ সমাপ্তি জীবনের সবচেয়ে দুঃখী মানুষ। কারণ সে কাঁদতেও পারছে না প্রকাশ্যে। তার দুঃখের কোনো সাক্ষী নেই।
বেঁচে থাকা আর বেঁচে থাকার অভিনয়ের পার্থক্য সে আজ বুঝেছে।
এই অধ্যায়ে সে এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি।
কিন্তু তার ভেতরে জমে উঠছে এক গভীর প্রশ্ন—
সে কি শুধু সহ্য করার জন্যই জন্মেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর একদিন আসবেই।
কারণ কেউ চিরকাল এভাবে বেঁচে থাকতে পারে না।
চলবে…