নীরবতার ভার
নীরবতা অনেক সময় শব্দের চেয়েও বেশি উচ্চস্বরে কথা বলে। সমাপ্তি সেটা বুঝতে শিখেছিল ইদানীং। ঘরের ভেতর নীলের উপস্থিতি থাকলেও তার অনুপস্থিতি আরও প্রকট হয়ে উঠছিল।
আগে সন্ধ্যা নামলেই নীলের ফিরে আসার একটা নির্দিষ্ট সময় ছিল। এখন সময়টা অনির্দিষ্ট। কখনো রাত ন’টা, কখনো তারও পরে। সমাপ্তি দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত না আর। শুধু রান্না শেষ করে খাবার ঢেকে রাখত। তার ভেতরে কোথাও যেন এক ধরনের প্রস্তুতি তৈরি হয়ে গেছে—অপেক্ষার প্রস্তুতি, অবহেলার প্রস্তুতি।
নীল ফিরলে কথা খুব কম হতো।
—“খেয়েছ?”
—“হ্যাঁ।”
এই সংক্ষিপ্ত সংলাপেই যেন সংসার সেরে যেত।
একদিন সমাপ্তি আর নিজেকে থামাতে পারেনি।
—“তুমি কি আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসো না?”
নীল চমকে তাকিয়েছিল। যেন প্রশ্নটা সে আশা করেনি। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলেছিল,
—“এসব কথা এখন কেন?”
এই ‘এখন’ শব্দটার ভেতরেই ছিল সব উত্তর। সমাপ্তি আর কিছু বলেনি। সে বুঝে গিয়েছিল—ভালোবাসা প্রশ্ন করলে টিকে থাকে না।
অন্যদিকে রিচির জীবন ছিল ঠিক উল্টো। তার সঙ্গে নীলের দেখা হলেই চারপাশ যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠত। রিচি হাসত, গল্প করত, ছোট ছোট আবদার করত। নীল নিজের অজান্তেই সেই আবদারগুলো পূরণ করত। সে অনুভব করত—কেউ একজন তাকে আবার প্রয়োজনীয় মনে করছে।
রিচি একদিন বলেছিল,
—“তুমি খুব চুপচাপ মানুষ, জানো?”
নীল হেসেছিল।
—“হয়তো।”
সে বলেনি—এই চুপচাপ মানুষটার ভেতরে কত শব্দ জমে আছে।
রিচি নীলকে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করত।
—“তুমি কী হতে চাও?”
—“তুমি কেমন জীবন চাও?”
এই প্রশ্নগুলো নীলকে ভাবাত। সমাপ্তি তাকে এসব প্রশ্ন অনেক আগেই করেছিল। কিন্তু তখন নীল গুরুত্ব দেয়নি। এখন সেই একই প্রশ্ন অন্য কণ্ঠে শুনে তার ভেতরে অদ্ভুত আলোড়ন উঠত।
সমাপ্তি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। সে আর আগের মতো হাসতে পারত না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের মুখের দিকে তাকাত—এই মুখ কি নীল ভালোবেসেছিল? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মুখের আকর্ষণ ফুরিয়ে গেছে?
সে নিজের ভুল খুঁজতে শুরু করল।
সে কি বেশি নির্ভরশীল ছিল?
সে কি নীলকে খুব বেশি প্রশ্ন করত?
সে কি নিজের জীবনটা পুরোপুরি নীলের হাতে তুলে দিয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর সে পেত না। শুধু বুকের ভেতর ভারী একটা চাপ অনুভব করত।
এক রাতে নীল দেরিতে ফিরেছিল। ঘরে ঢুকেই সে দেখল—সমাপ্তি জানালার পাশে বসে আছে। আলো নিভানো। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
—“লাইট জ্বালাওনি কেন?” নীল বলেছিল।
সমাপ্তি শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল,
—“অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।”
নীল কিছু বলেনি। সে বাথরুমে ঢুকে পড়েছিল। সেই রাতে দুজনের মাঝখানে শুধু দেয়াল নয়—একটা অদৃশ্য দূরত্বও দাঁড়িয়ে ছিল।
রিচির সঙ্গে নীলের সম্পর্ক তখন আরও গভীর। ফোনকল, মেসেজ, গোপন হাসি—সব মিলিয়ে এক নতুন জগৎ। নীল জানত, সে ভুল করছে। কিন্তু ভুলের স্বীকারোক্তি দেওয়ার মতো সাহস তার ছিল না।
সে নিজেকে বোঝাত—
“এটা তো শুধু কথা।”
“এটা তো শুধু একটু ভালো লাগা।”
কিন্তু ভালো লাগা কখন যে প্রয়োজন হয়ে যায়, সে খেয়াল রাখেনি।
সমাপ্তি একদিন হঠাৎ নীলের ফোনটা হাতে পেয়েছিল। ইচ্ছে করে দেখেনি। কিন্তু স্ক্রিনে ভেসে ওঠা একটি নাম তার চোখে পড়ে যায়—রিচি।
সে কিছু বলেনি। ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিয়েছিল। কিন্তু তার ভেতরে তখন আর সন্দেহ ছিল না—ছিল নিশ্চিত ভাঙন।
সেই রাতে সমাপ্তি ঘুমাতে পারেনি। তার মনে পড়ছিল শুরুর দিনগুলোর কথা—যখন নীল একদিন দেখা না হলে পাগল হয়ে যেত। আজ সেই মানুষটাই দিনের পর দিন তার দিকে না তাকিয়েও থাকতে পারে।
ভোরের আলো ফুটলে সে বুঝেছিল—ভুল শুধু নীলের নয়। ভুল ছিল তার নিজেরও। অন্ধ বিশ্বাস, নিঃশর্ত অপেক্ষা—সবই হয়তো এক ধরনের ভুল।
বাইরে তখন নতুন দিনের শব্দ। কিন্তু সমাপ্তির ভেতরে তখন গভীর রাত।
এই সম্পর্ক কি টিকে থাকবে?
নাকি ভুলের ওপর দাঁড়ানো সবকিছু একদিন ভেঙে পড়বেই?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। কারণ প্রতিটি ভুলেরই একদিন মুখোমুখি হতে হয়।
চলবে…