পর্ব–৪ : নিরুপায় আশ্রয়
সমাপ্তি বুঝতে পারছিল—তার সামনে আর কোনো স্পষ্ট পথ নেই। প্রতিটি দিকই যেন অন্ধকারে ঢাকা। কোন পথে গেলে আলো মিলবে, সে জানে না। শুধু জানে—তার পেটে নীলের সন্তান। এই সত্যটাই তাকে সবচেয়ে বেশি আটকে রাখছে।
সে চাইলে অনেক কিছু বলতে পারত। বাবার কাছে, মায়ের কাছে, ভাইবোনের কাছে। কিন্তু মুখ খুললেই যেন বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য ভয় চেপে বসে। সে ভাবে—সব বললে কি কিছু ঠিক হবে? নাকি সব আরও জটিল হয়ে যাবে?
মা-বাবার সামনে সে আজও সেই শান্ত, ভদ্র মেয়েটাই। তারা জানে না—এই শান্ত মুখের আড়ালে কতটা ভাঙন জমে আছে। সমাপ্তি জানে, একবার সব সত্য প্রকাশ হলে তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না। সমাজ প্রশ্ন করবে, মানুষ কথা বলবে। আর সে—সে কি সেসব সহ্য করতে পারবে?
তার একটাই পথ মনে হয়েছিল—নীলকে ফেরানো।
নীলকে বোঝানো।
নীলকে ভুল শুধরাতে বাধ্য করা।
সে প্রথমে নরমভাবে চেষ্টা করেছিল।
এক সন্ধ্যায় চা দিতে গিয়ে বলেছিল,
—“আমাদের আগের দিনগুলো কি তোমার মনে পড়ে?”
নীল তাকায়নি। শুধু বলেছিল,
—“এখন এসব কথা বলে কী হবে?”
সমাপ্তি থেমে যায়। তবু হাল ছাড়ে না।
আরেকদিন সাহস করে বলেছিল,
—“আমি গর্ভবতী। তোমার সন্তানের দায়িত্ব কি তোমার কিছুই মনে হয় না?”
নীলের চোখে বিরক্তি ফুটে উঠেছিল।
—“সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিও না। আমি এখন এসব নিতে পারছি না।”
এই কথাগুলো সমাপ্তির বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধে গিয়েছিল। সন্তানের কথাতেও যদি কোনো গুরুত্ব না থাকে, তাহলে আর কী দিয়ে সে নীলকে ফেরাবে?
কথা বললেই নীল আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তার কণ্ঠে রাগ, চোখে বিরক্তি। একসময় সমাপ্তি কথা বলাই বন্ধ করে দেয়। সে বুঝে যায়—কিছু মানুষকে ধরে রাখার চেষ্টাই তাদের আরও দূরে ঠেলে দেয়।
এই অবস্থায় একদিন সে মায়ের কাছে চলে যায়।
মায়ের কোলে মাথা রেখে সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। মা প্রথমে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। মায়েরা জানে—সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে নেই।
কিছুক্ষণ পর সমাপ্তি ধীরে ধীরে বলেছিল,
—“নীল আগের মতো নেই, মা।”
মা শান্ত গলায় বলেছিলেন,
—“সংসারে এমন হয়। সব স্বামী একরকম থাকে না।”
সমাপ্তি সব কথা বলেনি। বলেনি রিচির কথা, বলেনি অবহেলার গভীরতা। শুধু বলেছিল—নীল কথা বলে না, দায়িত্ব নেয় না।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।
—“মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মেছিস। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িই তো আসল বাড়ি। বাবার বাড়ি হলো আশ্রয়—অধিকার নয়।”
এই কথাটা সমাপ্তির কানে নতুন ছিল না। সমাজ তাকে ছোটবেলা থেকেই এই কথাই শিখিয়েছে। তবু আজ কথাটা তার বুকের ভেতর অন্যরকম করে বিঁধল।
মা আরও বলেছিলেন,
—“যেভাবেই হোক সংসার ধরে রাখতে হয়। মেয়েদের শক্ত হতে হয় সহ্য করে।”
সমাপ্তি কিছু বলেনি। সে জানে—মা খারাপ কিছু বলেননি। মা বলছেন সমাজ শেখানো সত্য। কিন্তু এই সত্যটাই কি সবচেয়ে বড় অন্যায় নয়?
মায়ের উপদেশ নিয়েই সে আবার স্বামীর বাড়ি ফিরে আসে।
সে ঠিক করে—আর অভিযোগ করবে না।
আর প্রশ্ন করবে না।
যেভাবেই হোক সংসারটা আঁকড়ে ধরবে।
সে আবার রান্না করে, ঘর গুছিয়ে রাখে, নীলের পছন্দের খাবার বানায়। নীল ফিরলে হাসার চেষ্টা করে। নিজের কষ্ট ঢেকে রাখে।
কিন্তু বিধি বাম।
নীল যেন আরও দূরে সরে যায়। সমাপ্তির এই নীরবতা তাকে নরম করে না—বরং আরও উদাসীন করে তোলে। সে ধরে নেয়—সব ঠিকই আছে। কেউ কিছু বলছে না মানে সমস্যা নেই।
সমাপ্তি বুঝতে পারে—নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া কোনো সমাধান নয়।
রাতে সে একা একা কাঁদে। পেটের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে বলে,
—“আমি তোমার জন্য লড়ছি।”
এই সন্তানটাই এখন তার একমাত্র শক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে এই সন্তানই তাকে সবচেয়ে বেশি আটকে রেখেছে।
সে ভাবে—যদি সে একা হতো, হয়তো চলে যেতে পারত। কিন্তু এখন? সে কি এই অনিশ্চিত জীবনের ভেতর একটা নতুন জীবনকে টেনে আনছে?
একদিন নীল তাকে ঠান্ডা গলায় বলেছিল,
—“তুমি খুব বেশি আশা করো।”
এই কথাটা শুনে সমাপ্তি হেসে ফেলেছিল। হাসিটা ছিল ভাঙা কাঁচের মতো।
সে বুঝে গেছে—ভুল শুধরানোর দায়িত্ব একা তার নয়। কিন্তু সমাজ সেই দায়িত্বটা কেবল তার কাঁধেই চাপিয়ে দিয়েছে।
মেয়েদের সংসার টিকিয়ে রাখতে হয়।
মেয়েদের সহ্য করতে হয়।
মেয়েদের নিজের দুঃখ চেপে রাখতে হয়।
এই সব ‘হয়’-এর ভেতর দিয়েই সমাপ্তি হাঁটছে।
কিন্তু এই হাঁটা কতদিন চলবে—সে জানে না।
সে এখনও ভাঙেনি পুরোপুরি। এখনও সে আঁকড়ে ধরে আছে। কিন্তু আঁকড়ে ধরার এই চেষ্টা যে একদিন তার নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে—সেই আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কারণ সব ভুলই একসময় চরম রূপ নেয়।
চলবে…