ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৯:৪২:১৬ PM

সবই ভুল -পর্ব-১

মান্নান মারুফ
23-01-2026 07:33:58 PM
সবই ভুল  -পর্ব-১

প্রথম পর্ব : শুরুর রোদ,শেষের ছায়া

সমাপ্তির শৈশবটা কেটেছে সরু গলির এক প্রান্তে, যেখানে দুপুরে রোদের তাপে টিনের চাল গরম হয়ে উঠত আর সন্ধ্যায় বাতাসে ভেসে আসত ভাত আর ডালের গন্ধ। ঠিক পাশের বাড়িটাতেই নীলের বেড়ে ওঠা। একই মহল্লা, একই উঠোনে খেলাধুলা, একই পুকুরে সাঁতার—দুজনের জীবন যেন অজান্তেই এক সুতোয় বাঁধা পড়েছিল।

সমাপ্তি ছিল শান্ত, একটু লাজুক। চোখে ছিল গভীর প্রশ্নের ছায়া, যেন পৃথিবীকে বুঝে নিতে তার তাড়া নেই—সে শুধু দেখত, অনুভব করত। আর নীল ছিল তার ঠিক বিপরীত—চঞ্চল, আত্মবিশ্বাসী, চোখে অদ্ভুত এক জেদ। সে জানত, জীবনে সে অনেক দূর যাবে। আর সেই দূরে যাওয়ার পথে সমাপ্তিকে সে নিজের অজান্তেই পাশে টেনে নিয়েছিল।

তারা পড়ত একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সমাপ্তি তখন ক্লাস এইটে, নীল দশম শ্রেণিতে। ক্লাস শেষে নীল প্রায়ই অপেক্ষা করত স্কুলের গেটের পাশে—হাতের বইগুলো বুকের সঙ্গে চেপে ধরে। সমাপ্তি বেরোলে সে বলত,
—“আজ অংকটা বুঝেছ?”
সমাপ্তি মাথা নেড়ে বলত,
—“না, ওই অঙ্কটা আবার আটকে গেছে।”

তখন নীল হাঁটতে হাঁটতে বুঝিয়ে দিত। কখনো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, কখনো পুকুরপাড়ে বসে। সংখ্যার হিসাবের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ত অদ্ভুত সব কথা—স্বপ্নের কথা, ভবিষ্যতের কথা, দুজনের একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার গল্প।

কখন যে সেই পড়াশোনার সাহায্য থেকে ভালো লাগা জন্ম নিল, কেউ টের পায়নি। প্রথমে ছিল অভ্যাস—একদিন দেখা না হলে অস্বস্তি। তারপর উদ্বেগ—খোঁজ নেওয়া। আর একসময় সেই উদ্বেগ রূপ নিল গভীর নির্ভরতায়।

তারা কেউ কাউকে ছাড়া কিছুই খেত না। নীল খেতে বসলে সমাপ্তির কথা মনে পড়ত, আর সমাপ্তি জানত—নীল না খেলে তার নিজের গলায় খাবার নামবে না। একদিন দেখা না হলে নীল অস্থির হয়ে পড়ত। আর সমাপ্তি? সে তখন চুপচাপ জানালার পাশে বসে থাকত—চোখে জল জমে থাকত, কিন্তু মুখে কিছু বলত না।

নীল প্রথম ভালোবাসার কথা বলেছিল এক বর্ষার বিকেলে। স্কুল ছুটির পর হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল। দুজন আশ্রয় নিয়েছিল পুরোনো লাইব্রেরির বারান্দায়। বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ঢেকে গিয়েছিল। নীল হঠাৎ বলেছিল,
—“সমাপ্তি, আমি তোমাকে খুব দরকার মনে করি।”

সমাপ্তি চমকে তাকিয়েছিল।
—“মানে?”

নীল একটু থেমে বলেছিল,
—“মানে, তুমি না থাকলে আমার সব কিছু এলোমেলো লাগে।”

সমাপ্তি সেদিন কিছু বলেনি। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেই নীরবতাই ছিল তার সম্মতি।

সেই দিন থেকে তাদের প্রেম আর লুকানো থাকেনি নিজেদের কাছেই। তারা ভবিষ্যৎ আঁকত—একসঙ্গে পড়াশোনা শেষ করবে, একসঙ্গে সংসার করবে। নীল বলত,
—“আমি বড় কিছু হবো, আর তুমি থাকবে আমার পাশে।”

সমাপ্তি হাসত। সে বড় কিছু চায়নি কখনো। সে শুধু চেয়েছিল নীল যেন কখনো তার হাত না ছাড়ে।

কিছু বছর ভালোই কাটল। সমাজের চোখ এড়িয়ে, পরিবারের অজান্তে তারা বুনে ফেলেছিল স্বপ্নের সংসার। একসময় নীলের পরিবার বিয়ের কথা তোলে। অনেক বাধা, অনেক টানাপোড়েনের পর শেষমেশ বিয়ে হয়। সমাপ্তির মনে হয়েছিল—সব কষ্ট বুঝি শেষ।

বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস ছিল স্বপ্নের মতো। ছোট্ট সংসার, সীমিত আয়—কিন্তু ভালোবাসায় কোনো অভাব ছিল না। নীল আগের মতোই যত্নশীল, সমাপ্তি আগের মতোই নিবেদিত। রাতে খেতে বসে নীল বলত,
—“দেখো, আমরা একসঙ্গে সব পারবো।”

সমাপ্তি বিশ্বাস করত।

কিন্তু সুখ বড় নাজুক। খুব ধীরে ধীরে নীল বদলাতে শুরু করল। দেরিতে ফেরা, অল্প কথা বলা, চোখে আগের উষ্ণতা কমে আসা—সমাপ্তি টের পেত, কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস পেত না। সে ভেবেছিল, হয়তো জীবনের চাপ, দায়িত্ব।

ঠিক তখনই সমাপ্তি জানতে পারে—সে গর্ভবতী।

খবরটা সে নীলকে দিতে চেয়েছিল খুব আনন্দ নিয়ে। মনে করেছিল, এই সন্তানের আগমনে সব দূরত্ব ঘুচে যাবে। কিন্তু সেদিন নীলের চোখে সে আনন্দ দেখেনি। বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা ছিল।

আর তারপরই নেমে আসে বজ্রপাত।

এক সন্ধ্যায় নীল শান্ত গলায় বলে বসে,
—“আমি আরেকটা বিয়ে করেছি।”

সমাপ্তির কানে কথাগুলো ঢুকলেও অর্থ ঢুকতে সময় লেগেছিল। সে শুধু বলেছিল,
—“তুমি কী বলছ?”

নীল চোখ নামিয়ে বলেছিল,
—“আমি পারিনি একা সব সামলাতে।”

সেই মুহূর্তে সমাপ্তির মনে হয়েছিল—তার ভেতরের সবকিছু ভেঙে পড়ছে। যে মানুষটাকে সে শৈশব থেকে বিশ্বাস করে এসেছে, যে মানুষটার হাত ধরে সে ভবিষ্যৎ দেখেছিল—সেই মানুষটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে গর্ভবতী। বুকের ভেতর আরেকটা প্রাণ বেড়ে উঠছে। অথচ তার নিজের অস্তিত্বই এখন প্রশ্নের মুখে।

সমাপ্তি সেদিন কাঁদেনি। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল। শুধু মনে হচ্ছিল—ছোট কালের সেই প্রীতির কি এমনই পরিণতি হওয়ার কথা ছিল?

বাইরে তখন রাত নেমেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে। সমাপ্তি ধীরে ধীরে পেটের ওপর হাত রাখে। ফিসফিস করে বলে,
—“তুমি শক্ত হবে, আমার সন্তানের মতো শক্ত।”

এই ভাঙনের ভেতর দিয়েই শুরু হয় তার নতুন লড়াই—ভালোবাসার স্মৃতি আর বাস্তবতার নিষ্ঠুরতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

চলবে…