চাপে
সমাপ্তি বুঝতে পারছিল—নীল আর আগের নীল নেই। মানুষ বদলায়, এটা সে জানত। কিন্তু এভাবে বদলায়—এতটা নীরবে, এতটা নিষ্ঠুরভাবে—তা সে কখনো ভাবেনি।
আগে নীলের চোখে ছিল একধরনের নিশ্চয়তা। এখন সেই চোখে শুধু ক্লান্তি আর অন্যমনস্কতা। সে কথা বললেও যেন মনটা থাকে অন্য কোথাও। সমাপ্তি যখন কথা শুরু করে, নীল তখন শেষ করার পথ খোঁজে। এই বদলটা খুব ধীরে এসেছে, তাই প্রথমে বোঝা যায়নি। কিন্তু এখন তা স্পষ্ট—অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
ঘরের ভেতর নীরবতা জমে উঠছে প্রতিদিন। আগে যে ঘর হাসি আর কথায় ভরে থাকত, এখন সেখানে শুধু শব্দহীন দীর্ঘশ্বাস। সমাপ্তি রান্নাঘরে কাজ করতে করতে ভাবে—কবে থেকে নীল আর তার পছন্দের খাবারের কথা জিজ্ঞেস করে না? কবে থেকে একসঙ্গে খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে?
একদিন সে খেয়াল করল—নীল তার দিকে তাকায় না। কথা বলার সময়ও নয়। যেন চোখাচোখি হলে কোনো অস্বস্তি তৈরি হবে—এই ভয়ে নীল চোখ সরিয়ে রাখে।
সমাপ্তি ধীরে ধীরে নিজের ভেতর গুটিয়ে নিতে শুরু করে। সে আর অভিযোগ করে না। কারণ অভিযোগ করলে উত্তর পাওয়া যায় না। শুধু একপাশ থেকে কথা ছুড়ে দেওয়া হয়—যার কোনো প্রতিধ্বনি নেই।
এক সন্ধ্যায় সে সাহস করে বলেছিল,
—“তুমি কি আমার সঙ্গে আর থাকতে চাও না?”
নীল কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল,
—“তুমি এসব ভেবে ভেবে নিজেকেই কষ্ট দিচ্ছ।”
এই কথাটার ভেতর কোনো আশ্বাস ছিল না। ছিল না কোনো অস্বীকারও। শুধু এড়িয়ে যাওয়া।
সমাপ্তি সেদিন বুঝেছিল—কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়াটাই আসল উত্তর।
অন্যদিকে রিচির সঙ্গে নীলের সম্পর্ক যেন প্রতিদিন নতুন রঙ পাচ্ছে। রিচি প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল। তার কথায় ক্লান্তির ভার নেই। সে নীলকে হাসাতে পারে। সে নীলের চোখে নিজের জন্য কৌতূহল দেখতে পায়।
রিচির কাছে নীল নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছে। সে আর সংসারের দায়িত্বে বাঁধা মানুষ নয়—সে একজন পুরুষ, যার প্রতি একজন তরুণী আকৃষ্ট। এই অনুভূতি নীলকে দুর্বল করে দিচ্ছে, অথচ সে সেটা শক্তি ভেবে নিচ্ছে।
রিচি একদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
—“তোমার চোখে এত দুঃখ কেন?”
নীল চমকে উঠেছিল। সমাপ্তি কোনোদিন এমন প্রশ্ন করেনি। অথবা করলেও সে শোনেনি।
নীল হেসে বলেছিল,
—“তুমি এসব ভাবছ কেন?”
রিচি মৃদু কণ্ঠে বলেছিল,
—“কারণ আমি তোমাকে দেখতে চাই ঠিক যেমন তুমি।”
এই কথাটাই নীলের ভেতর কিছু একটা ভেঙে দিয়েছিল। সে তখন ভুলে গিয়েছিল—বাড়িতে কেউ একজন তাকে এমনই দেখতে চেয়েছিল একসময়।
সমাপ্তি রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকায়। মুখটা কি সত্যিই বদলে গেছে? নাকি বদলে গেছে নীলের দৃষ্টি?
সে নিজের স্মৃতির ভেতর ঢুকে পড়ে। বিয়ের পরের দিনগুলো, নীলের হাসি, একসঙ্গে দেখা স্বপ্ন—সব যেন অন্য জীবনের গল্প। আজকের বাস্তবতা সেই গল্পের সম্পূর্ণ বিপরীত।
তর্ক এখন প্রায় নিয়মিত। তর্কের বিষয় খুবই তুচ্ছ।
—“তুমি দেরি করছ কেন?”
—“আমি কি তোমাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য?”
এই ধরনের কথোপকথন সমাপ্তির আত্মসম্মানকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে। সে কাঁদে, কিন্তু শব্দ করে না। নীলের সামনে সে দুর্বল হতে চায় না।
এক রাতে নীল দেরিতে ফিরল। সমাপ্তি ঘুমায়নি। সে শুধু চুপচাপ বসে ছিল। নীল ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“ঘুমাওনি?”
সমাপ্তি শান্তভাবে বলেছিল,
—“ঘুম আসেনি।”
নীল আর কিছু বলেনি। সে পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছিল। সেই রাতে দুজনের মাঝখানে শুধু বিছানার ফাঁকা জায়গা নয়—একটা দীর্ঘ দূরত্ব ছিল।
সমাপ্তি বুঝতে পারছিল—নীল আর তার নয়। সে হয়তো এখনও ঘরে থাকে, কিন্তু মনে মনে অনেক দূরে চলে গেছে। এই উপলব্ধিটাই সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেয়।
একদিন সে হঠাৎ নীলের ফোনের স্ক্রিনে রিচির নাম দেখে ফেলে। কোনো বার্তা পড়েনি। পড়ার প্রয়োজনও হয়নি। নামটাই যথেষ্ট ছিল।
সে সেদিন কিছু বলেনি। কিন্তু তার ভেতরে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। সন্দেহের জায়গায় নিশ্চিত বিশ্বাস এসে দাঁড়িয়েছে।
রিচির সঙ্গে নীলের সম্পর্ক এখন আর শুধু ভালো লাগায় সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে অধিকারবোধ জন্ম নিচ্ছে। রিচি জানতে চায়—নীল কোথায় থাকে, কী করে, কার সঙ্গে থাকে। নীল এড়িয়ে যায়। সে জানে—সত্য বললে সব ভেঙে যাবে।
এই ভাঙন সে এখনো চায় না। সে চায়—দুটো জগৎ পাশাপাশি চলুক। কিন্তু সে বোঝে না—এটা অসম্ভব।
সমাপ্তি একদিন মনে মনে বলে—
“সবই কি ভুল?”
ভুল মানুষকে বিশ্বাস করা?
ভুল মানুষকে নিজের সবটা দিয়ে দেওয়া?
নাকি ভুল নিজের অস্তিত্ব ভুলে যাওয়া?
বাইরে তখন ভোরের আলো। নতুন দিন শুরু হচ্ছে। কিন্তু সমাপ্তির জীবনে নতুন কিছু শুরু হওয়ার আগেই পুরোনো সবকিছু ভেঙে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
এই গল্প এখানেই থামে না। কারণ ভুলের পথ যত গভীরে যায়, ফিরে আসার রাস্তা তত কঠিন হয়।
চলবে…