ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১০:০৩:২৭ PM

উপন্যাস: অসমাপ্ত পর্ব–২

মান্নান মারুফ
29-01-2026 08:08:20 PM
উপন্যাস: অসমাপ্ত  পর্ব–২

কুদ্দুছ বিরক্ত ছিল।
খুব স্পষ্টভাবে বিরক্ত।

সমাপ্তিকে কলেজে নিয়ে যাওয়া, আবার কখনও কখনও স্টেশনে পৌঁছে দেওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়াটাই কুদ্দুছের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হতো। যেন কোনো অদৃশ্য দায় তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দায়টা কোথা থেকে এলো, কে দিল—সে প্রশ্ন সে আর করত না। শুধু জানত, তাকে যেতে হবে।

ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

গাড়িতে তুলে দেওয়া, ট্রেন ছাড়ার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা—সবই যেন এক ধরনের বাধ্যতা। সমাপ্তি সামনে থাকলে এক সময় কুদ্দুছের নিজের মনটাই কেমন অস্বস্তিতে পড়ে যেত। মুখে কিছু বলত না সে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিরক্তি জমে থাকত। এই বিরক্তি কখনো সমাপ্তির গাম্ভীর্য থেকে জন্ম নিত, কখনো তার হঠাৎ রেগে যাওয়া, গোমড়া করে রাখা মুখ থেকে।

চুপ করে যাওয়াটাই কুদ্দুছের সবচেয়ে অপছন্দের ছিল। কারণ এই নীরবতায় একধরনের অভিযোগ থাকত—না বলা, অথচ স্পষ্ট। সমাপ্তির চোখে তখন এমন এক কঠোরতা ভেসে উঠত, যা কুদ্দুছকে অপরাধী করে তুলত, অথচ সে জানত না—অপরাধটা কী।

তারপরেও তাকে ওর কথা শুনতে হতো।
শুনতে হতো মানেই মানতে হতো—তা নয়। কিন্তু উপেক্ষা করার শক্তিটুকু সে কোথাও হারিয়ে ফেলেছিল।

এভাবে বছর দুয়েক কেটে গেল।

সমাপ্তি কলেজে যায়, ফিরে আসে। কুদ্দুছ স্টেশনে পৌঁছে দেয়। ট্রেন ছাড়ে। সে দাঁড়িয়ে থাকে। আর একসময় বাড়ি ফিরে আসে—মাথার ভেতর অজানা এক ক্লান্তি নিয়ে।

এই সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না।
প্রেম নয়।
দায়িত্বও নয়।
তবু এক ধরনের বাঁধন।

একদিন স্টেশনে ভিড় একটু বেশি ছিল। বিকেলের আলো তখন ম্লান হতে শুরু করেছে। ট্রেন ছাড়ার ঘোষণা ভেসে আসছে মাইকে। সমাপ্তি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। সেদিন তার মুখটা আরও গম্ভীর লাগছিল। কুদ্দুছ কিছু বলতে চেয়েও বলল না। তার মনে হচ্ছিল, যে কোনো কথা বললেই হয়তো ঝামেলা হবে।

সমাপ্তি হঠাৎ কুদ্দুছের দিকে তাকাল।
“আপনি আজ কিছু বলছেন না কেন?”
কুদ্দুছ কাঁধ ঝাঁকাল।
“কী বলব?”

সমাপ্তি আর কিছু বলল না। মুখ ফিরিয়ে নিল। কুদ্দুছ তখনও বুঝতে পারেনি—এই নীরবতার ভেতর দিয়ে সমাপ্তি কীভাবে তার দিকে তাকিয়ে ছবি তুলে ফেলেছে।

কুদ্দুছ কিছুই টের পায়নি।

ট্রেন ছাড়ল। সমাপ্তি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হাত নেড়ে বিদায় জানাল না। শুধু তাকিয়ে রইল। ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

কুদ্দুছ ফিরছিল বাড়ির দিকে। মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা অন্যরকম ভারী। ঠিক তখনই ফোনটা ভাইব্রেট করল।

হোয়াটসঅ্যাপ।

সমাপ্তির নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই কুদ্দুছের বুকের ভেতর কেমন একটা কেঁপে উঠল। সে জানত না কেন।

মেসেজটা খুলতেই ছবিটা সামনে এলো।

একটা ছবি—
স্টেশনের আলো-ছায়ার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা সে নিজেই।

চুল এলোমেলো, চোখে ক্লান্তি, মুখে চাপা বিরক্তি—সবকিছু একসাথে ধরা পড়েছে। ছবিটা নিখুঁত নয়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে জীবন্ত।

কুদ্দুছ থমকে গেল।

এই প্রথম সে নিজেকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখল। সমাপ্তির চোখ দিয়ে।

মনের ভেতর কোথা থেকে যেন আবেগের ঢেউ উঠে এলো। হালকা, কিন্তু স্পষ্ট। মনে হলো, এই ছবির ভেতরে এমন কিছু আছে, যা সে নিজেও কখনো খেয়াল করেনি।

মনটা একটু রসে হাবুডুবু করতে লাগল।

সে অবাক হয়ে ভাবল—এই মেয়েটা কবে, কীভাবে তার এমন একটা মুহূর্ত ধরে ফেলল? আর কেন এই ছবিটা তাকে পাঠাল?

সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই নিজের অজান্তে হাসল।
বেশ অনেকদিন পর।

বাড়ি ফেরার পথে তার পা যেন হালকা হয়ে গেল। স্টেশন থেকে বাসায় আসার পুরো পথটা সে অদ্ভুত আনন্দ নিয়ে পার করল। মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিন পর ভেতরের কোনো বন্ধ জানালা একটু খুলে গেছে।

সেই রাতে সে ছবিটা বারবার দেখল।
ডিলিট করল না।
সংরক্ষণও করল না।
শুধু দেখল।

মুক্তা ফোন করেছিল। কুদ্দুছ স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু মুক্তা টের পেল—আজ কুদ্দুছের কণ্ঠে অন্যরকম কিছু আছে।

“তুমি হাসছো?”—মুক্তা জিজ্ঞেস করল।
“না,” কুদ্দুছ তাড়াতাড়ি বলল।
“তাহলে কণ্ঠটা এত হালকা কেন?”

কুদ্দুছ উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে নিজেও জানত না, কেন হালকা লাগছে।

রাত গভীর হলে সমাপ্তির আরেকটা মেসেজ এলো।
লেখা মাত্র দুটো শব্দ—
“ভালো লেগেছে।”

কুদ্দুছ বুঝতে পারল না—ছবিটা? নাকি মুহূর্তটা? নাকি সে নিজেই?

এই প্রশ্নটাই তাকে অস্থির করে তুলল।

সে রিপ্লাই করল না।
করতে সাহস পেল না।

কারণ সে জানত—একবার উত্তর দিলে এই সম্পর্ক আর আগের মতো থাকবে না। তখন এই ছবি শুধু ছবি থাকবে না, হয়ে উঠবে একটি দরজা।

কুদ্দুছ বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু চোখের সামনে বারবার ছবিটা ভেসে উঠছিল। সমাপ্তির গাম্ভীর্য, তার নীরব রাগ, তার হঠাৎ তোলা ছবি—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করছিল।

সে বুঝতে পারছিল—এই অনুভূতিকে আর অস্বীকার করা যাবে না।

সমাপ্তি নামের এই মানুষটা ধীরে ধীরে তার জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। খুব নিঃশব্দে। ঠিক যেমন ছবিটা তোলা হয়েছিল—অজান্তেই।

এই গল্প এখন আর শুধু দায়িত্বের নয়।
এই গল্প এখন অনুভবের।

আর অনুভব শুরু হলে, সমাপ্তি আর শেষ থাকে না—সে হয়ে ওঠে শুরু।

চলবে.............