পর্ব–৩ : বিদায়ের আগের নীরবতা
সমাপ্তির পরীক্ষা সামনে।
কথার ফাঁকে একদিন বলেছিল সে—আর মাত্র তিন দিন বাকি। কথাটা খুব সাধারণভাবেই বলেছিল, কিন্তু কুদ্দুছের মনে অকারণ একটা চাপ পড়ে গেল। পরীক্ষা মানেই দৌড়ঝাঁপ, উৎকণ্ঠা, আর দায়িত্ব। সমাপ্তিকে নিয়ে যেতে হবে। সঙ্গে মুক্তাকেও। কথাটা যেন ঠিক সিদ্ধান্তের মতো হয়ে গেল—কেউ উচ্চস্বরে কিছু বলেনি, তবু অস্বীকার করার সুযোগও ছিল না।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়ায়নি। কুদ্দুছ গাড়ি চালাচ্ছিল, পাশে মুক্তা, আর পেছনের সিটে সমাপ্তি। গাড়ির ভেতর অদ্ভুত এক নীরবতা। মুক্তা মাঝেমধ্যে কথা বলছিল, ক্যাম্পাসের কথা, পরীক্ষা নিয়ে হালকা দুশ্চিন্তা। সমাপ্তি খুব কমই কথা বলছিল। জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল বেশিরভাগ সময়।
কুদ্দুছ বারবার আয়নায় চোখ রাখছিল।
সমাপ্তির মুখটা আজ আরও চুপচাপ লাগছিল।
জাহাঙ্গীরনগর পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল গড়িয়ে গেল। ক্যাম্পাস তখন পরীক্ষার্থীদের ভিড়ে মুখর। কোথাও উৎকণ্ঠা, কোথাও প্রার্থনা, কোথাও নিঃশব্দ প্রস্তুতি। সমাপ্তি নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। কুদ্দুছ লক্ষ্য করল—তার চোখে আজ এক ধরনের দৃঢ়তা, আবার কোথাও চাপা ভয়।
“ভালো করে দেবে,” কুদ্দুছ বলল।
সমাপ্তি তাকিয়ে হালকা করে মাথা নাড়ল।
“দোয়া করবেন,” শুধু এটুকুই বলল।
এই ছোট্ট বাক্যটা কুদ্দুছের বুকের ভেতরে অদ্ভুতভাবে আটকে রইল।
পরীক্ষা চলাকালীন কুদ্দুছ আর মুক্তা ক্যাম্পাসে ঘুরছিল। জাহাঙ্গীরনগরের শান্ত পরিবেশ, লাল-সবুজের মিশেল—সব মিলিয়ে সময়টা বেশ কাটছিল। মুক্তা হাসছিল, গল্প করছিল। কুদ্দুছও চেষ্টা করছিল স্বাভাবিক থাকতে।
কিন্তু তার মনটা বারবার পরীক্ষার হলের দিকে চলে যাচ্ছিল।
পরীক্ষা শেষে সমাপ্তি বেরিয়ে এলো। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে একধরনের স্বস্তি। কুদ্দুছ প্রথমবারের মতো খেয়াল করল—এই মেয়েটার ক্লান্তিটাও কেমন সুন্দর।
“কেমন হলো?”—মুক্তা জিজ্ঞেস করল।
“মোটামুটি,” সমাপ্তি বলল, আগের মতোই সংক্ষিপ্ত।
তিনজন মিলে কাছের এক দোকানে খেতে বসল। বিভিন্ন ধরনের ভর্তা, ভাত, ডাল—খুব সাধারণ খাবার, কিন্তু অদ্ভুতভাবে আনন্দময়। মুক্তা হাসছিল, সমাপ্তি কম কথা বলছিল, কুদ্দুছ সব দেখছিল।
বিলটা সে নিজেই দিল। কেউ বলেনি, তবু মনে হলো—এই দায়িত্বটা তারই।
মনের ভেতর হালকা একটা উৎফুল্লতা কাজ করছিল। অনেকদিন পর এমন এক স্বস্তির সময়। মনে হচ্ছিল, সব কিছু ঠিক আছে। অন্তত এই মুহূর্তে।
বিকেলের দিকে কুদ্দুছের শরীরটা একটু ক্লান্ত লাগতে শুরু করল। মাথার ভেতর ভারী ভাব। সে বুঝল—এখন বাসায় ফেরার সময়। সময়ের হিসাব না করলেও মনটা যেন তাড়া দিচ্ছিল।
বিদায়ের সময়টা খুব সাধারণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো না।
সমাপ্তি ধীরে হাঁটছিল। আগের মতোই চুপচাপ। কথা কম বলছিল। হঠাৎ হঠাৎ কিছু বলছিল—কোনো স্মৃতি, কোনো ভাবনা। যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে।
“জায়গাটা সুন্দর,” হঠাৎ বলল সে।
“হ্যাঁ,” কুদ্দুছ বলল।
“কিছু জায়গা মানুষকে ভাবুক করে দেয়,” সমাপ্তি আবার বলল।
এই কথাগুলো কুদ্দুছের মাথায় ঘুরতে লাগল।
বিদায়ের সময় সমাপ্তি তাকিয়ে ছিল। চোখে কোনো অভিযোগ নেই, তবু কোথাও যেন এক ধরনের অপেক্ষা। কুদ্দুছ কী বলবে বুঝতে পারল না। শুধু বলল,
“নিজের খেয়াল রেখো।”
সমাপ্তি মাথা নেড়ে হেঁটে চলে গেল।
কুদ্দুছ গাড়িতে উঠল। চলে এলো ঠিকই। কিন্তু মনটা যেন পেছনে পড়ে রইল। কেমন জানি উড়ো-উড়ো লাগছিল। অস্থির। অপ্রস্তুত।
সমাপ্তির চুপচাপ হাঁটা, কম কথা বলা, ভাবুকের মতো হঠাৎ কিছু বলা—সব বারবার মনে পড়ছিল। কেন এত মনে পড়ছে, সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।
বাসায় ফিরে এসেও শান্তি পেল না। ঘরে বসে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, এমনকি মুক্তার সঙ্গে কথা বলার মাঝেও—সমাপ্তির মুখটা ভেসে উঠছিল।
এই প্রথম কুদ্দুছ স্বীকার করল নিজের কাছে—
এটা আর শুধু দায়িত্ব নয়।
এটা আর কাকতাল নয়।
সমাপ্তি নামের এই মানুষটা তার মনের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে। ধীরে, কিন্তু গভীরভাবে।
রাতে ঘুম আসছিল না। ফোনটা হাতে নিল। সমাপ্তির নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠল। সে মেসেজ পাঠাবে কি না—এই দ্বন্দ্বে অনেকক্ষণ কাটল।
শেষ পর্যন্ত কিছুই পাঠাল না।
কারণ সে জানত—কিছু অনুভূতি প্রকাশ পেলে আর আগের মতো থাকে না। আর সে এখনো প্রস্তুত নয়।
কিন্তু প্রস্তুত না হলেও, অনুভূতি তো থেমে থাকে না।
এই অসমাপ্ত গল্প আরও গভীর হতে শুরু করেছে।
নীরবতায়।
ভাবনায়।
আর একটার পর একটা মনে পড়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে।
চলবে............