পর্ব–৬ : নীরব দূরত্বের প্রেম
সমাপ্তি নতুন জগত পেয়েছে—এমনটাই ভাবছে কুদ্দুছ।এই ভাবনাটা কুদ্দুছের ভেতরে ধীরে ধীরে জমে উঠেছে। প্রথমে সে নিজেই বিশ্বাস করতে চায়নি। ভেবেছিল, সময়ের ব্যস্ততা, পড়াশোনার চাপ—এসবই হয়তো কারণ। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, সমাপ্তির আচরণে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগের মতো আর খোঁজ নেয় না সমাপ্তি। ফোন আসে না। মেসেজের উত্তরে আর আগের সেই উচ্ছ্বাস নেই। সে কাছাকাছিও আসে না। অকারণেই যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছে দু’জনের মাঝে।
কুদ্দুছ বিষয়টি বুঝতে পারে। খুব ভালো করেই বোঝে। সে বরাবরই মানুষের মন পড়তে পারে—এটা তার স্বভাব। সমাপ্তির চোখের ভাষা, কথার ভঙ্গি, নীরবতার দৈর্ঘ্য—সবকিছুই কুদ্দুছকে বলে দিচ্ছে, কোথাও একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তবু সে কখনও সমাপ্তিকে কিছু বলতে চায়নি। চেয়েও বলেনি।
কারণ কুদ্দুছ জানে, ভালোবাসা মানে শুধু দাবি নয়। ভালোবাসা মানে অপেক্ষা, বোঝাপড়া, আর নীরব সহ্য। সে ভয় পায়—কথা বললে যদি সমাপ্তি আরও দূরে সরে যায়! তাই সে নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলো চেপে রাখে। নিজের অভিমানগুলোকে গিলে ফেলে। মুখে কিছু না বললেও, চোখে চোখে জমে ওঠে একরাশ কষ্ট।
সমাপ্তির জীবন যেন হঠাৎ করেই রঙিন হয়ে উঠেছে। নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন ব্যস্ততা। সেই নতুন জগতে কুদ্দুছ যেন ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে—এমনটাই মনে হয় তার। আগে যে সমাপ্তি দিনের শুরু আর শেষটা কুদ্দুছকে দিয়েই করত, সেই সমাপ্তিই এখন দিনের পর দিন কোনো খোঁজ রাখে না।
কুদ্দুছ রাতের বেলা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। শহরের আলো দেখে। আলো ঝলমল শহরের ভেতরে নিজের ভেতরের অন্ধকারটা আরও গাঢ় লাগে তার। সে ভাবে—ভালোবাসা কি এভাবেই ফুরিয়ে যায়? নাকি মানুষ বদলে গেলে ভালোবাসার ভাষাও বদলে যায়?
একদিন হঠাৎ করেই সবকিছু ভেঙে পড়ে। কুদ্দুছের ভেতরে জমে থাকা চাপ, কষ্ট, অভিমান—সব একসাথে বিস্ফোরিত হয়। সামান্য একটা বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির সময় হঠাৎ রেগে গিয়ে সে সমাপ্তিকে ‘শয়তান’ বলে ফেলে। কথাটা মুখ থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই কুদ্দুছ নিজেই থমকে যায়। সে জানে, কথাটা বলা উচিত হয়নি।
সমাপ্তি চুপ করে থাকে। সেই চুপ থাকাটাই কুদ্দুছকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে। কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো রাগ নেই—শুধু একরাশ নীরবতা। চোখ নামিয়ে নেয় সমাপ্তি। তারপর ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে যায়।
এই ঘটনার পর অভিমান যেন কুদ্দুছের আগের চেয়ে আরও বেড়ে যায়। সে বুঝতে পারে—এই একটিমাত্র কথায় দু’জনের মাঝের দূরত্ব আরও গভীর হয়ে গেছে। সমাপ্তি একদম কথা বন্ধ করেই দেয়। ফোন ধরছে না। মেসেজের উত্তর দিচ্ছে না। দেখা হলেও মুখ ফিরিয়ে নেয়।
এখন সমাপ্তির সাথে আর কোনো কথাই হচ্ছে না কুদ্দুছের। এই ‘কথা বন্ধ’ অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—সেটাই এখন কুদ্দুছের সবচেয়ে বড় ভয়।
সে নিজেকে প্রশ্ন করে—আমি কি খুব বেশি চেয়েছি? নাকি কম বুঝেছি? ভালোবাসার মানুষটাকে কি আমি হারিয়ে ফেলছি?
কুদ্দুছ চেষ্টা করে ব্যস্ত থাকতে। কাজে ডুবে থাকতে চায়। কিন্তু যতই নিজেকে ব্যস্ত রাখে, ততই সমাপ্তির স্মৃতি এসে ভিড় করে। ছোট ছোট মুহূর্ত—একসাথে হাঁটা, হাসি, নীরব বসে থাকা—সবকিছুই তাকে তাড়া করে ফেরে।
সে জানে, সমাপ্তিও হয়তো কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু সেই কষ্টের কথা বলার জায়গাটা এখন নেই। দু’জনের মাঝখানে যে নীরব দেয়ালটা দাঁড়িয়ে গেছে, সেটা ভাঙার সাহস কেউই পাচ্ছে না।
কুদ্দুছের অভিমান আসলে ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয়। সে চায় না সমাপ্তিকে দোষ দিতে। চায় না তাকে ছোট করতে। তাই নিজের কষ্টটা নিজের মধ্যেই রাখে। কিন্তু এই নীরবতা তাকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।
এক রাতে সে ডায়েরির পাতায় লিখে ফেলে— “ভালোবাসা কি শুধু কাছাকাছি থাকলেই বাঁচে? নাকি দূরত্বেও ভালোবাসা টিকে থাকে?”
কুদ্দুছ জানে না, এই নীরবতার শেষ কোথায়। জানে না, সমাপ্তি কি সত্যিই নতুন কোনো জগতে হারিয়ে গেছে, নাকি শুধু একটু সময় চাইছে।
তবু সে অপেক্ষা করে। কারণ কুদ্দুছের কাছে ভালোবাসা মানে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করা। অভিমান নিয়েও ভালোবাসা। নীরবতা নিয়েও ভালোবাসা।
এই নীরব পথের শেষে কী অপেক্ষা করছে—মিলন, না বিচ্ছেদ—তা কুদ্দুছ জানে না। শুধু এটুকুই জানে, সমাপ্তিকে সে এখনও আগের মতোই ভালোবাসে।
চলবে.........