অসমাপ্ত
পর্ব–৫ : নীরব অভিমানের দিনলিপি
ইদানীং কুদ্দুছ কেমন যেন হয়ে উঠছে।
সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না—এই বদলে যাওয়ার শুরুটা কোথা থেকে। শুধু অনুভব করে, আগের মতো আর কিছুই স্বাভাবিক লাগছে না।
সমাপ্তি যখন চলে যায়, তখন কুদ্দুছের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে আসে।
চলে যাওয়ার মুহূর্তটা সে যতটা সম্ভব এড়িয়ে যেতে চায়, কিন্তু পারে না। সমাপ্তির পেছনে ফিরে তাকানো চোখদুটো, বিদায়ের সময়ের সেই হালকা হাসি—সবকিছু মিলিয়ে কুদ্দুছ যেন ভেঙে পড়ে ভেতরে ভেতরে। বাইরে থেকে সে চুপচাপ থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক শূন্যতা জমে ওঠে।
সমাপ্তি চলে গেলে কিছুই ভালো লাগে না তার।
ঘরের দেয়ালগুলো ভারী মনে হয়, সময়টা অকারণে দীর্ঘ হয়ে ওঠে। আগে যে কাজগুলো স্বস্তি দিত, সেগুলোও এখন আর মন টানে না। যেন সবকিছুই অর্থহীন হয়ে গেছে।
এক সপ্তাহও পার হয় না—কুদ্দুছ ফোন করে।
কণ্ঠটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু ভেতরের আকুতি লুকাতে পারে না।
—“বেড়াতে আসো না… একটু সময় পেলেই।”
সমাপ্তি চুপ করে থাকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর নরম গলায় বলে—
—“চেষ্টা করবো। কিন্তু পড়ার খুব চাপ চলছে এখন।”
আসলে সমাপ্তি চায়, কিন্তু পারে না।
পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছু মিলে তার সময়টা দম বন্ধ করা হয়ে উঠেছে। কুদ্দুছ সেটা জানে, বোঝেও। তবুও যখন সমাপ্তি আসতে পারে না, তখন কুদ্দুছের বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।
সে খুব কষ্ট পায়।
কিন্তু সেই কষ্টের কথা সে মুখে বলে না।
মুখে কিছু না বললেও অভিমানটা ঠিকই থেকে যায়।
এই অভিমানে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো তিরস্কার নেই—শুধু নিঃশব্দ আবেগে ভেজা এক ধরনের অপেক্ষা। কুদ্দুছ ভাবে, যদি সে কিছু না বলে, তাহলে হয়তো সমাপ্তি নিজে থেকেই বুঝবে।
এই অভিমানটা আসলে খুবই আবেগে জড়ানো।
কুদ্দুছ নিজেও জানে—এটা রাগ নয়, জেদ নয়। এটা সেই ধরনের অভিমান, যেটা জন্মায় ভালোবাসা থেকে।
প্রথম প্রথম সমাপ্তি বিষয়টা বুঝতে পারে না।
তার কাছে কুদ্দুছ আগের মতোই আছে—শান্ত, স্বাভাবিক, সহানুভূতিশীল। কুদ্দুছ নিজের ভাঙনটা এতটাই নিখুঁতভাবে লুকিয়ে রাখে যে সমাপ্তির চোখে কোনো পরিবর্তন ধরা পড়ে না।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সমাপ্তি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করে।
ফোনে কথা বলার সময় কুদ্দুছ আগের মতো হাসে না। কথার ফাঁকে ফাঁকে অদ্ভুত এক ধরনের নীরবতা জমে থাকে। সমাপ্তি বুঝতে পারে, কোথাও কিছু একটা জমে যাচ্ছে—যেটা সে স্পর্শ করতে পারছে না।
ইদানীং সমাপ্তির জীবনে অনেক বাধ্যবাধকতা এসে পড়েছে।
পড়াশোনার চাপ বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছু মিলিয়ে দিনগুলো দৌড়ের মতো কেটে যাচ্ছে।
তার ওপর আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডা।
বন্ধুদের সাথে বসা, আড্ডার আবদার, হাসি–ঠাট্টা—এই সময়গুলোও তার জীবনে জায়গা নিতে শুরু করেছে। সমাপ্তি বুঝতে পারে না, কখন কোন জিনিসটা অগ্রাধিকার পেয়ে যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে কুদ্দুছ যেন সেই তালিকার অনেক পেছনে চলে যাচ্ছে।
ইচ্ছাকৃত নয়—তবুও বাস্তব।
কুদ্দুছ এসব দেখে, বোঝে—কিন্তু চুপ করে থাকে।
সে জানে, সমাপ্তির নিজের একটা পৃথিবী আছে। সেখানে পড়াশোনা আছে, বন্ধু আছে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আছে। সে চায় না, নিজের অনুভূতি দিয়ে সেই পৃথিবীতে চাপ সৃষ্টি করতে।
তবুও অভিমান জমে।
কারণ কুদ্দুছ মানুষ—পাথর নয়।
কখনো কখনো সে ভাবে,
“আমি কি বেশি আশা করছি?”
পরক্ষণেই নিজেকেই দোষ দেয়—
“না, আমি তো কিছুই চাইনি।”
এই দ্বন্দ্ব তাকে আরও ক্লান্ত করে তোলে।
সমাপ্তিও মাঝে মাঝে অস্বস্তি অনুভব করে।
কুদ্দুছের নীরবতা তাকে ভাবায়। সে বোঝার চেষ্টা করে—কিন্তু সময়ের অভাব, ব্যস্ততা আর নিজের জীবন তাকে পুরোপুরি ভাবতে দেয় না।
একদিন সমাপ্তি হঠাৎ বুঝতে পারে—
কুদ্দুছ আসলে অভিমান করে আছে।
এই উপলব্ধিটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে।
সে জানে না, কীভাবে এই অভিমান ভাঙবে। কারণ কুদ্দুছ কখনো কিছু বলেনি। আর যে অভিমান বলা হয়নি, সেটাকে ভাঙাও সবচেয়ে কঠিন।
কুদ্দুছ meanwhile নিজের ভেতরে ভেঙে যেতে থাকে।
তার মনে হয়, সে যেন ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। এই ভাবনাটা তাকে ভয় দেখায়।
তবুও সে কিছু বলে না।
কারণ সে জানে—কিছু কথা বললে সম্পর্ক বদলে যায়।
এই নীরবতা, এই না বলা কষ্ট, এই জমে থাকা অভিমান—
সব মিলিয়ে কুদ্দুছ আর সমাপ্তির মাঝখানে জন্ম নিচ্ছে এক অদৃশ্য দূরত্ব।
ভালোবাসা সেখানে আছে,
আবেগও আছে,
কিন্তু সময় আর বাস্তবতার চাপে সেই ভালোবাসা চাপা পড়ে যাচ্ছে।
কুদ্দুছ জানে না, এই গল্প কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
সে শুধু জানে—এই অভিমান যদি কথা না পায়, তাহলে একদিন হয়তো এই সম্পর্কটাই নিঃশব্দে ফুরিয়ে যাবে।
আর সমাপ্তি—
সে এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি,
কারও নীরবতা কখনো কখনো সবচেয়ে জোরালো ডাক হয়ে ওঠে।
এইভাবেই দুজনের মাঝখানে
ভালোবাসা থাকে,
কিন্তু সময় থাকে না।
আর সেই সময়হীন ভালোবাসার নাম—অসমাপ্ত।
চলবে......