পর্ব–৪ : কাছে থেকেও দূরের অনুভব
ইদানীং কুদ্দুছের মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে।
এই অনুভূতিটা হঠাৎ করে আসেনি, আবার খুব স্পষ্টভাবেও ধরা দেয় না। যেন নীরবে এসে তার ভেতরে জায়গা করে নিয়েছে। কখনো মনে হয়, সমাপ্তি যেন সব সময়ই তার খুব কাছে থাকে। পাশে না থাকলেও তার উপস্থিতির একটা নরম ছায়া সারাক্ষণ কুদ্দুছকে ঘিরে রাখে। এই অনুভূতির কোনো নির্দিষ্ট নাম সে খুঁজে পায় না—ভালবাসা বলতেও সাহস হয় না, আবার সাধারণ মায়া বলে উড়িয়ে দিতেও মন সায় দেয় না।
সমাপ্তিকে ভাবতে বসলে কুদ্দুছের ভেতরে একধরনের অস্থির শান্তি কাজ করে।
এই শান্তি তাকে ভয়ও দেখায়। কারণ সে জানে, কিছু অনুভূতি আছে—যেগুলো মানুষকে শক্তিশালী করে না, বরং দুর্বল করে তোলে।
সেদিন সমাপ্তি কুদ্দুছের জন্য কয়েকটা চকলেট এনে দিয়েছিল।
খুব সাধারণ এক উপহার। দোকানের তাকেই এমন চকলেট সারি সারি সাজানো থাকে। কিন্তু সেদিন কুদ্দুছের হাতে চকলেটগুলো নেওয়ার সময় তার মনে হয়েছিল, এই সামান্য উপহারটার ভেতরে অন্যরকম কিছু লুকিয়ে আছে। দাম বা স্বাদের কোনো গুরুত্ব নেই—বরং সমাপ্তির সেই নিঃশব্দ যত্ন, চোখের ভেতরের আন্তরিকতা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল।
কুদ্দুছ প্রথমে নিজেকে বোঝাতে চেয়েছিল—এটা কিছুই না।
কিন্তু পরে আর নিজেকে ফাঁকি দিতে পারেনি। বুঝে গিয়েছিল, সে আর আগের মতো উদাসীন নেই।
ইদানীং সমাপ্তিকে সে বেশি ভাবছে—এই সত্যটা কুদ্দুছ নিজেই টের পাচ্ছে।
কখনো কাজের ফাঁকে, কখনো গভীর রাতে, কখনো একা বসে চুপচাপ—অকারণেই সমাপ্তির কথা মনে পড়ে। সমাপ্তি কাছে থাকলে তার মন ভালো থাকে। কথা না বললেও অদ্ভুত একটা স্বস্তি কাজ করে। অকারণেই মুখে হাসি চলে আসে, আবার কখনো হঠাৎ করে মন ভারী হয়ে ওঠে।
কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসাব নেই, কোনো প্রত্যাশার চাপও নেই—তবুও কেন যেন সমাপ্তি ধীরে ধীরে তার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা দখল করে নিচ্ছে।
এই জায়গাটা কুদ্দুছ আগে কাউকেই দেয়নি।
সমাপ্তি পাশে না থাকলেও কুদ্দুছের চোখের সামনে তার মুখ ভেসে ওঠে।
কথা বলার সময় মাথা একটু কাত করে তাকানো, হালকা হাসি, নিরীহ অথচ গভীর দৃষ্টির সেই শান্ত উপস্থিতি—সবকিছু যেন অজান্তেই তার মনে গেঁথে যাচ্ছে। কখন যে এই মানুষটা তার ভাবনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, কুদ্দুছ নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।
কখনো কখনো সে নিজেকে ধমক দেয়—
এভাবে ভাবা কি ঠিক?
এই ভাবনাগুলোর কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি?
তাদের সম্পর্কটা বাইরে থেকে দেখলে একেবারেই স্বাভাবিক।
কোনো দাবি নেই, নেই প্রকাশ্য আবেগের ভাষা। সমাপ্তি যেন কুদ্দুছের জীবনে একজন অতিথির মতো—সম্মানিত, নির্ভার, নীরব। কেউ দেখলে বুঝবেও না, এই নীরবতার ভেতরে কত কথা জমে আছে।
তবুও মাঝে মাঝে কুদ্দুছের মনে হালকা একটা অভিমান জন্ম নেয়।
সমাপ্তি এত কাছের হয়েও কেন যেন পুরোপুরি কাছে আসে না। আবার সেই অভিমান সে কাউকে বোঝাতে পারে না, এমনকি নিজেকেও না। অভিমানটা নিঃশব্দে থেকেই যায়—নিজের মধ্যেই।
কুদ্দুছ জানে, মানুষ সামাজিক জীব।
একসাথে চলাফেরা করলে, কথা বললে, সময় কাটালে—মানুষের প্রতি মানুষের মায়া জন্মায়। সে নিজেকে এই যুক্তিতেই বোঝাতে চায়। হয়তো এটাও তেমনই একটা অনুভূতি। হয়তো এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু কোথাও যেন একটা অস্বীকার করা যায় না এমন সত্য লুকিয়ে থাকে।
এই অনুভূতিটা সাধারণ মায়ার চেয়েও একটু বেশি।
আর এই “বেশি” হয়ে যাওয়াটাই কুদ্দুছকে ভীত করে তোলে।
কারণ সে জানে, অনুভূতি যত গভীর হয়, আঘাতটাও তত বড় হয়।
কখনো কখনো কুদ্দুছ ইচ্ছে করেই সমাপ্তির সঙ্গে একটু দূরত্ব রাখে।
কথা কম বলে, নিজেকে ব্যস্ত দেখায়। ভাবে—হয়তো এতে অনুভূতিটা কমে যাবে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, দূরে থাকলে সমাপ্তিকে আরও বেশি মনে পড়ে। এই দ্বন্দ্ব তাকে আরও অস্থির করে তোলে।
সমাপ্তি এসব কিছু টের পায় কি না, কুদ্দুছ জানে না।
সমাপ্তি আগের মতোই থাকে—স্বাভাবিক, শান্ত, অপ্রকাশ্য। তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, আবার কোনো দাবি-দাওয়াও নেই। এই নির্লিপ্ত শান্তভাবটাই কুদ্দুছের অভিমানকে আরও গভীর করে তোলে।
একদিন কুদ্দুছ নিজের কাছেই স্বীকার করে নেয়—
এই অনুভূতিটা আর সাধারণ নয়।
কিন্তু তবুও সে এটাকে নাম দিতে ভয় পায়।
কারণ, কিছু অনুভূতি আছে—
যেগুলো শুরু হয় খুব নিঃশব্দে,
যেগুলো মুখ ফুটে বলা যায় না,
আর যেগুলোর শেষটা বেশিরভাগ সময়ই থেকে যায় অসমাপ্ত।
কুদ্দুছ জানে না, এই গল্প কোথায় গিয়ে থামবে।
সে শুধু জানে—সমাপ্তি তার জীবনে এমন এক অনুভূতি হয়ে উঠছে, যাকে সে চাইলেও অস্বীকার করতে পারছে না, আবার গ্রহণ করতেও সাহস পাচ্ছে না।
এই দ্বন্দ্ব, এই নীরব ভালবাসা, এই না বলা অভিমান—
সব মিলিয়ে কুদ্দুছের জীবনে জন্ম নিচ্ছে এক অসমাপ্ত অধ্যায়।
আর সেই অধ্যায়ের নাম—সমাপ্তি।
চলবে...........