পর্ব–৭ : ভুলে থাকার অভিনয়
তবে সমাপ্তি প্রথম প্রথম কষ্ট কম পায়নি।
কুদ্দুছকে মনে পড়লেই সে কেমন জানি হয়ে যেত। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে আসত, শ্বাস নিতে কষ্ট হতো। কোনো এক অদৃশ্য ভার যেন হঠাৎ চেপে বসত তার বুকে। সে নিজেও বুঝে উঠতে পারত না—এই কষ্ট ঠিক কীসের। অভিমান, না ভালোবাসা, না অপূর্ণতার বেদনা—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করত।
শুরুর দিনগুলোতে সমাপ্তি খুব চুপচাপ থাকত। আগের মতো কথা বলত না। হাসিও যেন হারিয়ে গিয়েছিল তার মুখ থেকে। রাত হলেই কুদ্দুছের কথা মনে পড়ে যেত। ছোট ছোট স্মৃতি—একসাথে বসে থাকা, নীরব সময় কাটানো, অকারণ হাসি—সবকিছুই হঠাৎ করে খুব জীবন্ত হয়ে উঠত। তখন সে নিজেকে শক্ত করে ধরত। মনে মনে বলত, “এগুলো ভেবে লাভ নেই।”
কিন্তু মন তো আর মানে না।
সময় গড়ানোর সাথে সাথে সমাপ্তি নিজের ভেতরেই পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করল। সে বুঝে গিয়েছিল—এক জায়গায় থেমে থাকলে কষ্ট আরও বাড়বে। তাই সে নিজেকে ব্যস্ত করে তুলল। ইদানিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার, সাংস্কৃতিক আয়োজন আর পড়াশোনা—সবকিছু নিয়েই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ক্লাস শেষে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা, ক্যাম্পাসের হৈচৈ, হাসি-ঠাট্টা—এসবেই যেন দিন কেটে যাচ্ছিল।
দেখতে দেখতে কুদ্দুছকে যেন একেবারে ভুলেই গেছে—এমনটাই মনে হয় বাইরের চোখে। নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ, নতুন অভ্যাস—সব মিলিয়ে সমাপ্তির জীবনটা নতুন রঙে ভরে উঠেছে। সে আগের মতো চুপচাপ থাকে না। যে মেয়েটা নীরবতা ভালোবাসত, সে এখন হৈহুল্লোর করে সময় পার করে। জোরে হেসে ওঠে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মেতে থাকে।
কিন্তু এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা কথা।
সমাপ্তি কুদ্দুছের কথা একদম মনে করে না—তা ঠিক নয়। অনেক সময় হঠাৎ করেই কোনো পরিচিত গান শুনে, কোনো পুরনো জায়গা দেখে, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট শব্দে থমকে যায় সে। মুহূর্তের মধ্যেই কুদ্দুছের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন সে থেমে যায়। কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে যায়।
এই থমকে যাওয়াটাই প্রমাণ করে—কুদ্দুছ এখনও তার ভেতরে কোথাও আছে।
সমাপ্তি ইচ্ছা করেই ভুলে থাকতে চাইছে—তা-ও ঠিক নয়। আবার এমনও নয় যে সে জোর করে কুদ্দুছকে ভুলে ফেলছে। যেন আপনিতেই ভুলতে বসেছে সে। এই ভুলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা এত ধীরে, এত নিঃশব্দে হচ্ছে যে সমাপ্তি নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না—সে আসলে কী করছে।
কখনো মনে হয়, কুদ্দুছকে ভুলে যাওয়াই বোধহয় সহজ পথ। আবার কখনো মনে হয়, এই ভুলে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। নিজের অনুভূতির সাথেই যেন সে প্রতারণা করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটা দিন একেক রকম। কখনো খুব আনন্দে কাটে, কখনো আবার হঠাৎ করেই মন খারাপ হয়ে যায়। বন্ধুদের ভিড়ের মাঝেও কখনো কখনো নিজেকে অসম্ভব একা মনে হয় সমাপ্তির। তখন সে চুপ করে বসে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে—কুদ্দুছ এখন কী করছে?
কিন্তু এই প্রশ্নটার উত্তর সে আর খুঁজতে চায় না।
সমাপ্তি জানে না—তাদের এই অসমাপ্ত ভালোবাসা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে। মিলনে, না চিরস্থায়ী দূরত্বে। শুধু এটুকুই জানে, এই ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। শেষ হয়তো হচ্ছে না—শুধু রূপ বদলাচ্ছে।
সে মাঝে মাঝে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে—মানুষ বদলায়, সময় বদলায়, সম্পর্কও বদলায়। কিন্তু সব বদলালেও কিছু অনুভূতি রয়ে যায়, যেগুলো কখনো মুছে যায় না।
রাতের বেলা হোস্টেলের ঘরে শুয়ে শুয়ে সমাপ্তি জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। দূরের আলো দেখে। তার মনে হয়, ঠিক এই আলোয় হয়তো কুদ্দুছও কোনো এক রাতে তাকিয়ে থাকে। একই আকাশের নিচে থেকেও তারা কত দূরে চলে এসেছে!
সমাপ্তি চোখ বন্ধ করে। নিজেকে শক্ত করে রাখার চেষ্টা করে। বলে—আর ভাববে না। সামনে এগোতে হবে। নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন।
কিন্তু মন আবার ফিসফিস করে বলে—ভালোবাসা কি এত সহজে ভুলে থাকা যায়?
এই দ্বন্দ্ব নিয়েই সমাপ্তি বেঁচে আছে। একদিকে নতুন জীবনের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে পুরনো ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস। সে জানে না, শেষ পর্যন্ত কোনটা জিতবে।
শুধু এটুকুই নিশ্চিত—কুদ্দুছ আর সমাপ্তির ভালোবাসা এখনো অসমাপ্ত। আর এই অসমাপ্ততাই তাদের দু’জনকে আলাদা আলাদা পথে হেঁটে চলার শক্তি দিচ্ছে… কিংবা ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছে—তা সময়ই বলবে।