পর্ব–২ : নীরবতার ভিক্ষা
পারভেজ খুব অসহায়—তবু সে একেবারে নিঃস্ব ছিল না।
তার ছিল চোখের ভাষা, হাতের ইশারা, আর মুখভরা নীরবতা। কথা বলতে না পারলেও সে বোঝাতে পারত—সে ক্ষুধার্ত, সে ভয় পেয়েছে, সে হাসতে চায়। ইশারায় সে মায়ের কাছে পানি চেয়েছে, বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হয়েছে, আকাশের দিকে আঙুল তুলে বৃষ্টি নামার আগাম খবর দিয়েছে।
পাশের বাড়ির ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সে খেলত। দৌড়াত, হাসত—হাসিটা শব্দহীন হলেও ছিল নিখাদ। কিন্তু বেশিদিন সে খেলাটা টিকত না। একটু পরেই কেউ না কেউ বলত,
“বোবা ছেলেটাকে দূরে সরাও।”
“ও ঠিক মতো খেলতে পারে না।”
ধীরে ধীরে সবাই তাকে দূরে ঠেলে দিত। খেলাটা চলত, কিন্তু পারভেজ থাকত না।
একজনই ছিল ব্যতিক্রম—নাজু।
নাজু পাশের বাড়ির মেয়ে। বয়সে পারভেজের চেয়ে বছর দুয়েক ছোট। সে কখনো পারভেজকে বোবা বলে ডাকেনি। কখনো তাকে আলাদা করে দেখেনি। সবাই যখন দূরে সরে যেত, নাজু তখন তার পাশে বসত। ইশারায় কথা বলত, চোখে চোখ রেখে হাসত।
নাজুর বাড়িতে খুব ভালো খাবার হতো না। মাঝেমধ্যে ভাত জুটত, মাঝেমধ্যে জুটত না। তবু যেদিন কিছু ভালো রান্না হতো—একটু ডাল, একটা ডিম, বা কোনো উৎসবে পাওয়া পিঠা—নাজু গোপনে পারভেজকে দিত।
হাত বাড়িয়ে বলত,
“নাও।”
পারভেজ প্রথমে নিতে চাইত না। চোখ নামিয়ে রাখত। নাজু জোর করে তার হাতে গুঁজে দিত। তখন পারভেজ হাসত—চোখ দুটো ভিজে উঠত।
এই ছোট্ট মেয়েটাই তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল—সব মানুষ অমানুষ নয়।
কিন্তু ঘরের ভেতরের বাস্তবতা ছিল আরও ভয়ংকর।
পারভেজের বাবা অন্ধ। পুরোপুরি অন্ধ। দিনের আলো আর রাতের অন্ধকার—দুটোর মধ্যে কোনো পার্থক্য তিনি জানতেন না। চোখে দেখতে না পাওয়ার যন্ত্রণাটা তিনি বুকের ভেতর বয়ে বেড়াতেন। একসময় কাজ করতেন, তারপর চোখের আলো নিভে যায়। কাজ যায়, সম্মান যায়, মানুষটাও যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
এখন তিনি ভিক্ষা করেন।
আর সেই ভিক্ষার ভার পড়ে পারভেজের কাঁধে।
ভোর হলেই পারভেজ বাবার হাত ধরে বের হয়। বাবার এক হাত তার কাঁধে, আরেক হাত ভিক্ষার থালায়। পারভেজ সামনে হাঁটে, রাস্তা চিনে নেয়, গর্ত এড়ায়, লোকের ভিড় পেরোয়। বাবা বারবার জিজ্ঞেস করেন,
“কেউ আছে নাকি?”
পারভেজ মাথা নেড়ে বোঝায়—আছে, নেই, দাঁড়াও।
দিনের পর দিন এভাবেই চলে। ছেলে অসহায়, বাবা তার চেয়েও অসহায়। পারভেজ জানে—সে না থাকলে তার বাবা পথে পড়ে যাবেন। তাই সে কখনো ক্লান্তির কথা ভাবে না।
মানুষ ভিক্ষা দেয়। কেউ দয়া করে দেয়, কেউ বিরক্ত হয়ে। কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়। কেউ বলে,
“যাও, কাজ করো।”
কাজ?
অন্ধ বাবা আর বোবা ছেলে—তারা কী কাজ করবে?
একদিন এই দৃশ্যটা এক দয়ালু মানুষের চোখে পড়ে।
লোকটা বাজার থেকে ফিরছিল। দূর থেকেই দেখে—একজন অন্ধ মানুষ, তার ঘাড়ে হাত রাখা এক তরুণ। তরুণটা কথা বলছে না, শুধু ইশারায় পথ দেখাচ্ছে। লোকটার বুকটা কেঁপে ওঠে।
সে কাছে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ চুপ করে দেখে। তারপর জিজ্ঞেস করে,
“ছেলেটা কথা বলতে পারে না?”
বাবা মাথা নাড়েন।
“জন্ম থেকেই না।”
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অনেক কথা বলতে চেয়েও বলে না। সে কিছু টাকা দেয়—কিন্তু তার মনে হয়, এই টাকা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
সেদিন রাতে সে ঘুমোতে পারে না।
কয়েক দিন পর সে আবার আসে। এবার শুধু টাকা নয়, সঙ্গে সিদ্ধান্ত।
সে বলে,
“ভিক্ষা করে জীবন চলে না। কাজ করতে হবে। আমি চেষ্টা করব।”
পারভেজ কিছু বোঝে না। শুধু লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কয়েক সপ্তাহ পর লোকটা সত্যিই ফিরে আসে। সঙ্গে একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যান।
গ্রামের মানুষ অবাক হয়। কেউ বিশ্বাস করতে পারে না—একজন বোবা ছেলেকে কেউ কাজের সুযোগ দিতে পারে!
লোকটা বলে,
“এই ভ্যান চালাবে। বাজারে মাল নেবে, মানুষ বসাবে। ভিক্ষা নয়—কাজ।”
পারভেজ প্রথমে ভয় পায়। চোখে আতঙ্ক। হাত কাঁপে। সে পারে না—এই ভাবনা তার চোখে লেখা।
লোকটা তার কাঁধে হাত রাখে।
“চেষ্টা করলেই পারবে।”
সেই দিনটা পারভেজের জীবনে নতুন অধ্যায়ের শুরু। সে ভ্যান চালানো শেখে। ধীরে, খুব ধীরে। প্রথম দিন কয়েকবার ধাক্কা খায়। লোকজন হাসে। কেউ বলে,
“বোবা ছেলে আবার ভ্যান চালাবে!”
পারভেজ শুনতে পায় না—তবু বোঝে।
তবু সে থামে না।
কয়েক মাস পর সে নিয়মিত ভ্যান চালায়। বাবাকে ভিক্ষায় বসাতে হয় না। বাবার চোখে প্রথমবারের মতো স্বস্তি নামে। তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। কিছু বলতে চান—কিন্তু গলা ধরে আসে।
পারভেজ বুঝে যায়। সে বাবার হাত চেপে ধরে।
কিন্তু সুখ এই সমাজে দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
ভ্যান আসার পর থেকেই কিছু লোকের চোখে কাঁটা হয়ে ওঠে পারভেজ। কারও কারও ভ্যান ব্যবসায় ক্ষতি হয়। কারও অহংকারে লাগে—একজন বোবা ছেলে কীভাবে দাঁড়িয়ে যায়!
ফিসফিস শুরু হয়।
“ও ঠিক না।”
“ওকে দিয়ে কিছু করানো ঠিক হয়নি।”
পারভেজ জানে না—এই ফিসফিসই একদিন তার জীবনে ঝড় ডেকে আনবে। এটা শুধু শান্তির আগের নীরবতা।
কারণ, পারভেজের জীবনে সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়গুলো তখনও সামনে দাঁড়িয়ে।
আর নীরবতা তখনও তার একমাত্র ভাষা।
চলবে.............