ঢাকা, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৪:১৯:৩৭ PM

উপন্যাস: অসমাপ্ত পর্ব – ১২

মান্নান মারুফ
04-02-2026 02:53:57 PM
উপন্যাস: অসমাপ্ত পর্ব – ১২

পর্ব – ১২,দূরত্বে থেকেও একসাথে

ওদের দিনগুলো এখন সত্যিই ভালো কাটছে। দুজন দুই প্রান্তে থেকেও যেন এক অদ্ভুত নিয়মে সময় কাটে। নিউইয়র্কের সকাল আর অস্ট্রেলিয়ার রাত—এই দুই আলাদা সময়ের মাঝখানে গড়ে উঠেছে একটাই অনুভূতি। ভালোবাসা।

হারানো সবকিছু ধীরে ধীরে ফিরে এসেছে।
হাসি, অপেক্ষা, খোঁজ নেওয়া, ছোট ছোট অভিমান—সবই আবার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

কুদ্দুছ এই ভালোবাসাটাকে খুব বড় করে দেখে না। সে বড় কোনো ঘোষণা দিতে চায় না, কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতিও না। তার চাওয়া খুব সাধারণ—এই অনুভূতিটা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। দূরে থেকে হোক কিংবা কাছে, তাতে কিছু আসে যায় না। ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, দূরত্ব তাকে ছোট করতে পারে না—এই বিশ্বাসটা কুদ্দুছের ভেতরে খুব শক্তভাবে গেঁথে গেছে।

সে প্রায়ই সমাপ্তিকে বলে,
—“আমাদের একসাথে থাকাটাই সব না। আমাদের ভালো থাকাটাই আসল।”

সমাপ্তি প্রথমে এই কথার মানে বুঝতে পারেনি। এখন বুঝে। বুঝে বলেই সে শান্ত থাকে। কুদ্দুছের এই স্থিরতা তাকে নিরাপদ অনুভব করায়।

দিনগুলো কাটে পড়াশোনা, কাজ আর কথার ভেতর দিয়ে।

সমাপ্তির পড়াশোনার চাপ আছে। সামনে পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন—সব মিলিয়ে সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে। কুদ্দুছ জানে, এই সময় তাকে বেশি চাপ দেওয়া ঠিক না। তাই সে অপেক্ষা করতে শিখেছে। কথা কম হলেও মনটা ধরে রাখে।

কখনো সমাপ্তি ক্লান্ত কণ্ঠে বলে,
—“আজ খুব চাপ গেছে।”

কুদ্দুছ তখন কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে না। শুধু বলে,
—“চুপ করে বসে থাকো। আমি আছি।”

এই ‘আমি আছি’—এই ছোট্ট বাক্যটাই সমাপ্তির জন্য অনেক বড় আশ্রয়।

এভাবে অনেক সময় কেটে যায়।

মাঝে মাঝে মনে হয়, দিনগুলো খুব দ্রুত পালাচ্ছে। আবার কখনো মনে হয়—এই অপেক্ষার সময়টাই যেন তাদের সম্পর্ককে আরও শক্ত করে তুলছে।

একদিন হঠাৎ কুদ্দুছ বলে বসে,
—“আগামী বছর তোমার জন্মদিনে আমি থাকতে চাই।”

সমাপ্তি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেনি।
—“সত্যি?”

কুদ্দুছ হেসে বলেছিল,
—“হ্যাঁ। জন্মদিন তো আর প্রতি বছর এমন হয় না।”

এই কথার ভেতরে কোনো বড় রোমান্টিক সংলাপ ছিল না। কিন্তু অনুভূতিটা ছিল গভীর। সমাপ্তির চোখ ভিজে গিয়েছিল।

সে জানে, নিউইয়র্ক থেকে অস্ট্রেলিয়া আসা সহজ নয়। সময়, টাকা, দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্তটা খুব বাস্তবধর্মী। তাই এই কথাটার মূল্য তার কাছে অনেক।

এরপর থেকেই সমাপ্তি নতুন করে দিন গুনতে শুরু করে।

তার পড়াশোনা জন্মদিনের আগেই শেষ হবে। এই ভেবে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়—এবার জন্মদিনটা বড় করে পালন করবে। কোনো তাড়াহুড়ো না, কোনো অসম্পূর্ণতা না। কুদ্দুছ থাকবে—এই ভাবনাটাই জন্মদিনকে আলাদা করে তুলেছে।

একদিন ভিডিও কলে সে বলে,
—“তুমি আসবে, আমি চাই জন্মদিনটা আমাদের মতো করে হোক।”

কুদ্দুছ মৃদু হেসে বলে,
—“আমাদের মতো মানে?”

সমাপ্তি একটু লজ্জা পায়।
—“শান্ত, সহজ… আর সত্যি।”

এই সত্যিটাই তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি।

কুদ্দুছ তখনই সিদ্ধান্ত নেয়—সে অস্ট্রেলিয়ায় যাবে। কোনো নাটক করবে না, কোনো চমকও না। শুধু উপস্থিত থাকবে। এটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দিন গড়ায়।
মাস বদলায়।

মাঝে মাঝে দূরত্ব আবার চোখে পড়ে। টাইম জোনের কারণে কথা বলা হয় না। কখনো একদিন পর কথা হয়। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, এই নীরবতাও এখন আর ভয় ধরায় না।

কারণ তারা জানে—এই নীরবতার ভেতরেও বিশ্বাস আছে।

সমাপ্তি কখনো কখনো অভিমান করে।
—“তুমি আগের মতো বেশি কথা বলো না।”

কুদ্দুছ শান্তভাবে বলে,
—“কম বললেও মনটা তো একই জায়গায় আছে।”

এই উত্তর সমাপ্তিকে থামিয়ে দেয়।

নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কুদ্দুছ অনেক সময় ভাবে—এই সম্পর্কটা যদি আগে এমন হতো! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজেকে থামায়। সময়কে দোষ দেয় না আর। যা আছে, সেটুকুই যথেষ্ট।

অস্ট্রেলিয়ার সন্ধ্যায় সমাপ্তি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। জন্মদিনের কথা ভাবলে তার মুখে অজান্তেই হাসি চলে আসে। এই জন্মদিনটা আর শুধু তার একার নয়—এটা তাদের।

এভাবে দিন চলে।

ভালোবাসা এখন আর কেবল আবেগ নয়—এটা দায়িত্ব, বোঝাপড়া আর ধৈর্যের নাম।

দূরে থেকেও তারা একসাথে আছে।
একসাথে থেকেও তারা কাউকে আটকায় না।

এই সম্পর্কটা হয়তো পরিপূর্ণ নয়।
তবু এটা সত্যি।

আর অসমাপ্ত গল্পের এই পর্বে—তারা দুজনেই জানে, সামনে কী আছে তা নিশ্চিত না।
কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—এই ভালোবাসা তারা হারাতে চায় না।

দূরে হোক, কাছে হোক—ভালোবাসাটা যেন থাকে।

এইভাবেই চলতে থাকে তাদের দিন।
শান্তভাবে।
নীরবে।
ভালোবেসে।

 চলবে.............