পর্ব – ১১ দূরত্বের ওপারে ফিরে আসা মন
দীর্ঘদিন পর আবার ফেসবুকের নীল আলো জ্বলে উঠল কুদ্দুছের জীবনে।
একটা সময় ছিল—এই নীল আলোই তাকে কষ্ট দিত। নামের পাশে সবুজ বিন্দু দেখলেই বুকের ভেতর মোচড় দিত। সে সময় নিজেকে লুকিয়ে রাখাই ছিল তার একমাত্র উপায়। কিন্তু সময় বদলায়। মানুষও বদলায়। অথবা বলা যায়—ভাঙা মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে জোড়া লাগাতে শেখে।
নিউইয়র্কের ব্যস্ত শহরে বসে কুদ্দুছ এখনো রাত জাগে। জানালার বাইরে উঁচু উঁচু দালান, ব্যস্ত রাস্তা, হর্নের শব্দ—সবই আছে। তবু ভেতরে কোথাও এক অদ্ভুত শূন্যতা ছিল এতদিন। সেই শূন্যতায় আজ হালকা আলো পড়েছে।
সে আবার ফেসবুকে একটিভ হয়েছে।
আর ঠিক একই সময়ে, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে—অস্ট্রেলিয়ার নীরব বিকেলে—সমাপ্তিও ফিরে এসেছে সেই চেনা নীল দুনিয়ায়।
প্রথমে কেউ কাউকে খুঁজছিল না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে দুজনেই একে অপরের নাম দেখতে পেল অনলাইন তালিকায়।
একটা নাম।
একটা সবুজ বিন্দু।
আর সাথে হাজারো না বলা কথা।
কুদ্দুছ অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। আঙুল এগোয়, থেমে যায়। সাহস পায় না। মনে হয়—এতদিন পর আবার কথা বলা কি ঠিক হবে?
ওদিকে সমাপ্তিও ঠিক একই দ্বিধায়।
শেষমেশ, কে আগে শুরু করেছিল—তা কেউ জানে না।
শুধু জানা যায়, সেই রাতে দুজনের মাঝখানের নীরবতা ভেঙে গিয়েছিল।
—“ভালো আছ?”
এই দুই শব্দ দিয়েই শুরু।
সমাপ্তির চোখ ভিজে উঠেছিল। এতদিন পর এই সাধারণ প্রশ্নটাই যেন তার ভেতরের জমে থাকা সব অনুভূতি নাড়িয়ে দিল।
—“ভালো আছি… তুমি?”
কথা এগোতে লাগল।
কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো পুরনো হিসাব নেই।
শুধু মানুষ হিসেবে খোঁজ নেওয়া।
দিন গড়াতে লাগল।
মেসেজ থেকে কল।
কল থেকে দীর্ঘ নীরবতা—যেখানে দুজনেই লাইন ধরে রেখে কিছু না বলেও একে অপরকে অনুভব করে।
ইদানীং দুজনের মন ভালো থাকে।
হারানো আনন্দ যেন ধীরে ধীরে ফিরে এসেছে।
হাসি ফিরে এসেছে কথার ফাঁকে ফাঁকে।
পুরনো স্মৃতিগুলো আর ব্যথা দেয় না—বরং মৃদু ভালো লাগা হয়ে আসে।
এই সম্পর্কটা নতুন নয়।
আবার পুরনোও নয়।
এটা যেন সময়ের আঁচড়ে আরও গভীর হয়ে ওঠা এক অনুভূতি।
আগের চেয়েও মধুর।
আরও আবেগী।
সমাপ্তি এখন আগের মতো চুপচাপ থাকে না। কুদ্দুছের ছোট ছোট কথা, নিউইয়র্কের দিনের গল্প শুনতে তার ভালো লাগে। আর কুদ্দুছ—অস্ট্রেলিয়ার আকাশ, সমুদ্রের রং, সমাপ্তির কণ্ঠ—সবকিছু মন দিয়ে শোনে।
ইদানীং দুজনেই দেখা করতে চায়।
কুদ্দুছ বলে,
—“ইচ্ছে করে হঠাৎ তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াই।”
সমাপ্তি হাসে। কিন্তু সেই হাসির ভেতর লুকানো দীর্ঘশ্বাস থাকে।
—“পৃথিবীটা কেন এত বড়, কুদ্দুছ?”
দুজন দুই প্রান্তে।
একজন নিউইয়র্ক।
একজন অস্ট্রেলিয়া।
দূরত্বটা কেবল মানচিত্রে নয়—সময়ের পার্থক্যেও।
তবু তারা আর কারো সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারছে না।
দিনের ভালো-মন্দ, ছোট রাগ, অভিমান—সবকিছু এখন একে অপরের সঙ্গে ভাগ হয়।
কখনো সমাপ্তি হঠাৎ রেগে যায়।
—“তুমি হঠাৎ উধাও হয়ে যাও কেন?”
কুদ্দুছ নরম গলায় বলে,
—“ভয় পাই… আবার যদি হারাই।”
এই ভয়টা দুজনেরই।
হারানোর ভয়।
আবার আলাদা হয়ে যাওয়ার ভয়।
রাতে কুদ্দুছ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। দূরের আলো দেখে মনে হয়—কোথাও হয়তো সমাপ্তিও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
সমাপ্তি কখনো সমুদ্রের ধারে বসে ভাবে—এই ঢেউ কি নিউইয়র্ক পর্যন্ত পৌঁছায়?
দূরত্ব সত্ত্বেও তারা একে অপরের ভেতর বাস করতে শুরু করেছে আবার।
এই সম্পর্ক কোনো ঘোষণা নয়।
কোনো প্রতিশ্রুতির বাঁধনও নয়।
এটা শুধু ফিরে পাওয়া মন।
অসমাপ্ত গল্পের আরেকটি নতুন অধ্যায়।
তারা জানে না—শেষ কোথায়।
শুধু জানে—এই মুহূর্তটা সত্যি।
এই ভালোবাসাটা জীবিত।
আর অসমাপ্ত থাকলেও, এই গল্প আবার বাঁচতে শিখেছে।
চলবে......