ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১০:১২:৫৯ PM

উপন্যাস: অসমাপ্ত পর্ব –১০

মান্নান মারুফ
03-02-2026 08:21:17 PM
উপন্যাস: অসমাপ্ত পর্ব –১০

,পর্ব – ১০              সমাপ্তির জীবন এখন ব্যস্ততায় ঠাসা। পড়াশোনা আর পার্টটাইম কাজ—দুটোর মাঝখানে সে যেন প্রতিদিন নিজেকে ভাগ করে দিচ্ছে। সকালে ক্লাস, দুপুরে কাজ, সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে। সে দায়িত্বশীল হয়েছে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, সময়কে কাজে লাগাচ্ছে। কিন্তু ভেতরের মানুষটি—সে ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। নীরব, প্রশ্নে ভরা, আর মাঝে মাঝে অদ্ভুত রকম অস্থির।

কখনো ক্লাসের বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনটা কেমন যেন ছুটে যায় বহু দূরে। কলম হাতে থাকলেও চোখ দুটো শূন্যতায় আটকে থাকে। সহপাঠীরা হাসে, কথা বলে, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন আঁকে—আর সমাপ্তি তখন নিজের ভেতর ডুবে থাকে। কেন যেন সব ঠিক থাকার পরও কিছু একটা অপূর্ণ লাগে। ঠিক কী—সে নিজেও জানে না।

অস্থিরতা আসে বিশেষ করে রাতের বেলায়। কাজ শেষে ঘরে ফিরে যখন সব চুপচাপ হয়ে যায়, তখন তার ভেতরের শব্দগুলো জেগে ওঠে। জানালার বাইরে শহরের আলো ঝলমল করে, কিন্তু তার মনে তখন অন্ধকার জমে। সেই অন্ধকারের ভেতরেই বারবার ফিরে আসে একটি নাম—কুদ্দুছ।

কুদ্দুছের কথা সে ইচ্ছে করে মনে আনে না। তবু স্মৃতিরা নিজের মতো করেই আসে। কখনো কোনো গান শুনে, কখনো পুরোনো কোনো বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে, আবার কখনো হঠাৎ কোনো অপ্রাসঙ্গিক মুহূর্তে। সময় অনেক কিছু বদলায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে—অটল, অনড়।

অন্যদিকে কুদ্দুছ। সেও তার নিজের মতো করেই জীবনটাকে টেনে নিয়ে চলেছে। কাজের চাপ, পরিবারের দায়িত্ব, চারপাশের বাস্তবতা—সব মিলিয়ে তার জীবনটাও সহজ নয়। তবু মাঝেমধ্যে সে থেমে যায়। থামে মানে কাজ থামে না, সময় থামে না—থামে শুধু মনটা।

এক সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে মোবাইলটা হাতে নেয় কুদ্দুছ। অভ্যাসের বশেই ফেসবুক খুলে ফেলে। নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ চোখ আটকে যায় একটি পোস্টে। সমাপ্তির জন্মদিন উপলক্ষে আগাম শুভেচ্ছা জানিয়েছে তাদের এক পুরোনো বন্ধু।

কয়েক সেকেন্ড সে কিছুই করে না। শুধু তাকিয়ে থাকে। নামটা দেখেই বুকের ভেতর হালকা একটা ধাক্কা লাগে। কতদিন সে সমাপ্তির প্রোফাইলে ঢোকে না—হিসাব নেই। ইচ্ছা করেই দূরে ছিল। দূরে থাকা নাকি সহজ হবে—এই ভেবে।

কিন্তু সেই একটি পোস্টই সব এলোমেলো করে দেয়।

কুদ্দুছ মনে মনে ভাবে, “আমি কি শুভেচ্ছা জানাব?”
এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ, খুব ছোট—কিন্তু তার ভেতরে এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে যেন বহু পুরোনো এক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।

তাদের মধ্যে যে অভিমান জমে ছিল, তা একদিনে তৈরি হয়নি। কথার ভুল বোঝাবুঝি, না বলা কথা, সময়ের দূরত্ব—সব মিলিয়ে একটা দেয়াল উঠেছিল। সেই দেয়াল ভাঙার মতো শক্তি বা সাহস—কোনোটাই তখন ছিল না।

কুদ্দুছ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শেষে সিদ্ধান্ত নেয়—শুভেচ্ছা জানাবে। খুব সাধারণ করে। কোনো বাড়তি কথা নয়, কোনো আবেগ নয়।

সমাপ্তির জন্মদিনের দিনে, রাত ঠিক বারোটার কিছু পরেই সে মেসেজ পাঠায়—
“শুভ জন্মদিন। ভালো থেকো।”

এই কয়েকটি শব্দ পাঠিয়ে কুদ্দুছ মোবাইলটা নামিয়ে রাখে। মনে হয়, অনেক বড় কিছু করে ফেলেছে। আবার মনে হয়—এটা তো কিছুই না।

অন্যদিকে সমাপ্তি। কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে সে যখন মেসেজগুলো দেখে, তখন রাত অনেক। বন্ধুবান্ধবের শুভেচ্ছা, পরিচিতদের লেখা—সবই আছে। কিন্তু একটি নাম আলাদা করে চোখে পড়ে।

কুদ্দুছ।

এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস আটকে যায়। এতদিন পর। কোনো ভূমিকা নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই—শুধু একটি শুভেচ্ছা।

অদ্ভুতভাবে তার ভেতরে একটু উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, কেউ যেন খুব সাবধানে, খুব দূর থেকে তার দিকে হাত বাড়িয়েছে। সেই অনুভূতিটা সে অস্বীকার করতে পারে না।

সে সঙ্গে সঙ্গে কোনো বড় উত্তর দেয় না। শুধু ফেসবুকেই ধন্যবাদ জানায়।
“ধন্যবাদ।”

এর বেশি কিছু নয়।

ফোন নম্বর নেই, সরাসরি যোগাযোগের সুযোগও নেই। হয়তো ইচ্ছে করেই কেউ আর সেই পথ খোলা রাখেনি। তবু এই ছোট্ট বিনিময়টুকু—দুজনের ভেতরের জমে থাকা বরফে হালকা ফাটল ধরায়।

এরপর দিনগুলো ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।

হঠাৎ করে সব ঠিক হয়ে যায় না। তারা কেউই অতীতের কথা তোলে না। কিন্তু মাঝে মাঝে লাইক, কখনো কোনো পোস্টে ছোট্ট কমেন্ট—এইটুকুতেই যেন বোঝা যায়, সম্পর্কটা এখনো পুরোপুরি মৃত নয়।

অভিমান পুরোপুরি যায় না, কিন্তু তার ধার কিছুটা কমে। কথাবার্তা আস্তে আস্তে স্বাভাবিকতার পথে হাঁটে। আগের মতো গভীর নয়, তবু অচেনাও নয়।

সমাপ্তি এখনো ব্যস্ত। পড়াশোনা, কাজ—সবই চলছে। কিন্তু তার অস্থিরতা কিছুটা কমেছে। হয়তো সে বুঝেছে, সব সম্পর্কেরই একটা অসমাপ্ত অধ্যায় থাকে। সবকিছু শেষ মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়।

আর কুদ্দুছ—সে এখনো দূরত্ব বজায় রাখে। খুব কাছে আসে না, আবার পুরোপুরি সরে যায়ও না। হয়তো সে জানে, কিছু সম্পর্ক জোড়া লাগানোর জন্য নয়—শুধু টিকে থাকার জন্যই যথেষ্ট।

এইভাবেই তারা দুজন দাঁড়িয়ে থাকে—অসমাপ্ত এক গল্পের দুই প্রান্তে।
শেষ হয়নি, আবার নতুন করে শুরু হয়ওনি।

অসমাপ্ত—ঠিক যেমন জীবন নিজেই। চলবে...................