ঢাকা, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৫:৪৬:১৩ PM

উপন্যাস : প্রতিবন্ধী,পর্ব–৫

মান্নান মারুফ
04-02-2026 04:20:53 PM
উপন্যাস : প্রতিবন্ধী,পর্ব–৫

পর্ব–৫ : ভ্যানের দামে জীবন

অনেকের প্রশ্ন ছিল—শুধু ওই ভ্যানটার জন্যই কি পারভেজকে মরতে হলো? এই প্রশ্নটাই যেন ধীরে ধীরে কীর্তিপুর গ্রামের আকাশে ঝুলে রইল। কেউ জোরে বলল না, কেউ প্রতিবাদ করল না—তবু সবার ভেতরে প্রশ্নটা কাঁটার মতো বিঁধে থাকল। একটা সামান্য ব্যাটারি চালিত ভ্যানের লোভে একজন নিরীহ, বাকপ্রতিবন্ধী তরুণকে এভাবে শেষ করে দিতে পারে—এই বাস্তবতা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।

কোনো শত্রুতা ছিল না।
কোনো অপরাধ ছিল না।
কোনো দোষ ছিল না।

ছিল শুধু বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটা।

পারভেজ কারও জায়গা দখল করেনি। কারও ক্ষতি করেনি। সে শুধু ভিক্ষার থালা ফেলে হাতে ধরেছিল কাজের হাতল। সমাজের চোখে সেটাই বোধহয় ছিল সবচেয়ে বড় অপরাধ।

আজ পারভেজ নেই।
ভ্যান নেই।

কিন্তু শূন্যতা আছে—অসীম শূন্যতা।

অন্ধ বাবা এখন আবার ভোরে বের হন। ছেলের হাতের বদলে এখন তার নিজের কাঁপা হাতই পথ খোঁজে। ভিক্ষার থালাটা আগের চেয়ে ভারী লাগে। কারণ, এই থালার ওজন শুধু অভাবের না—এই থালায় জমে আছে ছেলের রক্তের স্মৃতি।

কেউ যখন ভিক্ষা দেয়, বাবা বলে না—“আমার ছেলে কাজ করত।”
বললে কী হবে?
কার কাছে বলবে?

কেউ শোনে না।

রাতে ঘরে ফিরলে তিনি দেয়ালের পাশে বসে থাকেন। হাত বাড়িয়ে ছেলের জায়গাটা খোঁজেন। ভুলে যান—পারভেজ আর নেই। কিছুক্ষণ পর মনে পড়ে। তখন বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। চোখে জল আসে না—চোখ তো আলো হারিয়েছে আগেই। কান্নাটাও যেন পথ হারিয়ে ফেলে।

তিনি শুধু বলেন,
“ও তো কিছু বলেনি… ওকে কেন মারল?”

এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয় না।

পারভেজের মা আগের মতো কথা বলেন না। হাঁড়িতে ভাত কম ফুটে। ঘরের ভেতর শব্দ কমে গেছে। একসময় যে ভ্যানের চাকার শব্দে ঘর ভরে উঠত, এখন সেখানে শুধু নীরবতা।

নাজু সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে।

সে আর আগের মতো হাসে না। নামাজ শেষে সে আর পারভেজের ভালো থাকার দোয়া করে না। এখন সে দোয়া করে—
“আল্লাহ, ওর হত্যার বিচার দাও।”

তার চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে—ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে পারভেজের হাসি, ইশারায় কথা বলা, নীরব আনন্দ। সেই হাসিটা এখন কেবল স্মৃতি।

গ্রামে কিছুদিন আলোচনা চলেছিল।
“কে মারল?”
“কেন মারল?”

কেউ বলেছিল—ভ্যানের জন্য।
কেউ বলেছিল—ঈর্ষা।
কেউ আবার বলেছিল—ভাগ্যের লিখন।

তারপর ধীরে ধীরে সব চুপ হয়ে গেল।

কারণ পারভেজ বোবা ছিল।
কারণ সে প্রতিবন্ধী ছিল।
কারণ সে গরিব ছিল।

এই তিনটা কারণ একসাথে হলে বিচার অনেক সময় দরকার পড়ে না—ভুলে যাওয়াই সহজ হয়।

ভ্যানটা আর পাওয়া যায়নি। যেন সেটাই ছিল আসল লক্ষ্য। মানুষটা মরল, কিন্তু যন্ত্রটা চুরি হলো—এই সমাজে যন্ত্রের দাম অনেক সময় মানুষের চেয়েও বেশি।

কেউ একজন বলেছিল,
“ভ্যানটা থাকলে আজও পারভেজ বেঁচে থাকত।”

এই কথাটা শুনে নাজু কেঁপে উঠেছিল। তার মনে হয়েছিল—এই সমাজ আসলে মানুষ মারে না, মানুষের স্বপ্ন মারে। পারভেজের স্বপ্ন ছিল খুব ছোট—কাজ করে বাঁচা। সেই ছোট স্বপ্নটাই সহ্য হয়নি।

অন্ধ বাবা একদিন বলেছিলেন,
“ও যদি কথা বলতে পারত, হয়তো বাঁচত।”

এই কথাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

তাহলে কি কথা বলতে না পারা মানেই মৃত্যুদণ্ড?

পারভেজের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এই যে—সে নিজের কষ্ট বলতে পারেনি। আর মৃত্যুর পর তার পক্ষেও কেউ জোরে কথা বলেনি।

সময় এগিয়ে গেছে। কীর্তিপুর গ্রামের মানুষ আবার নিজেদের কাজে ব্যস্ত। বাজার বসে, ভ্যান চলে—নতুন ভ্যান, নতুন চালক।

শুধু পারভেজ নেই।

তার জায়গায় আছে এক অন্ধ মানুষ, এক ভাঙা পরিবার, আর এক আকাশভরা প্রশ্ন।

একটা ভ্যানের লোভে যদি একজন নিরীহ, প্রতিবন্ধী তরুণকে হত্যা করা যায়—তাহলে এই সমাজে নিরাপদ কে?

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।

শুধু একটা সত্য আছে—

আজ পারভেজ নেই।
ভ্যান নেই।
কিন্তু মানুষের অমানবিকতা রয়ে গেছে।

আর সেই অমানবিকতার ভার সবচেয়ে বেশি পড়ে অসহায়দের কাঁধে।

 চলবে.........