সম্প্রতি এক বক্তব্যে নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী মন্তব্য করেছেন, বিএনপির সিনিয়র নেতা মির্জা আব্বাসের নাকি জয়ের চেয়ে পরাজয়ের রেকর্ড বেশি। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—মির্জা আব্বাস কোনো ক্ষণস্থায়ী বা হঠাৎ উঠে আসা রাজনীতিবিদ নন; বরং তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, ত্যাগী ও লড়াকু এক নেতার নাম।
রাজপথের রাজনীতিতে গড়ে ওঠা নেতৃত্ব
মির্জা আব্বাসের রাজনীতি শুরু হয়েছিল রাজপথ থেকেই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ১৯৭৭ সালে তিনি কমিশনার নির্বাচিত হন। সেই সময় থেকেই তিনি ঢাকার নগর রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। জনসংযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মির্জা আব্বাস ছিলেন সামনের সারির একজন সংগঠক ও যোদ্ধা। সেই সময়ের রাজপথের সংগ্রামে তার সক্রিয় উপস্থিতি তাকে রাজধানীর রাজনীতিতে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যায়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন এবং সফলভাবে রাজধানী পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদে অভিষেক ও নির্বাচনী সাফল্য
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা আব্বাস। এটি ছিল জাতীয় সংসদে তার প্রথম প্রবেশ। ওই নির্বাচনে তিনি মোট প্রাপ্ত ভোটের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ অর্জন করেন, যা একটি শক্তিশালী গণভিত্তির প্রমাণ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওই নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর আমির আব্বাস আলী। বিপুল ভোটে তাকে পরাজিত করে মির্জা আব্বাস প্রমাণ করেন—তিনি শুধু দলীয় নেতা নন, বরং জনগণের আস্থাভাজন একজন রাজনীতিবিদ।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব ও অবদান
২০০১ সালে আবারও জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে মির্জা আব্বাস গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়ে নগর উন্নয়ন, আবাসন খাত এবং ভবন নীতিমালায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবে তিনি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধন, জলাশয় রক্ষা আইন কার্যকর করা এবং নগর পরিকল্পনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো আজও আলোচনায় আসে।
এর আগে ১৯৯১ সালে স্বল্প সময়ের জন্য তিনি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে অল্প সময়ের জন্য ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনিক দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তার পরিচয় দেন মির্জা আব্বাস।
ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনীতিতে সক্রিয়
২০০৮ ও ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেননি। সে সময় ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক পরিবেশ এবং দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও রাজনীতি থেকে কখনো সরে যাননি। বরং মাঠের আন্দোলন, দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
২০১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র নির্বাচনে তিনি জনগণের পক্ষে দাঁড়ান। যদিও সেই নির্বাচন ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত ছিল, তবুও তিনি নির্বাচন বর্জন না করে ভোটারদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এটি তার রাজনৈতিক সাহস ও গণতান্ত্রিক অবস্থানের প্রতিফলন।
ঢাকা-৮ এবং রাজধানীর রাজনীতিতে প্রভাব
ঢাকা-৮ আসনের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন নির্বাচনে মির্জা আব্বাসের বিজয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন অনেকেই। ৫ আগস্টের পর থেকে শুধু ঢাকা-৮ নয়, বরং পুরো ঢাকা শহরেই তিনি একজন প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আলোচিত।
তার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার, হেয় করার চেষ্টা এবং রাজনৈতিক আক্রমণ থাকলেও বাস্তবতা হলো—তার দ্বারা বহু মানুষের উপকার হয়েছে, অনেক মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। মাঠপর্যায়ে তার সাংগঠনিক শক্তি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক তাকে এখনও শক্ত অবস্থানে রেখেছে।
দলের সংকটে দৃঢ় কণ্ঠস্বর
বর্তমানে মির্জা আব্বাস বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। দলের সংকটময় সময়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় কথা বলেন, আপসহীন অবস্থান নেন এবং রাজপথে থাকতে ভয় পান না। মামলা, হামলা ও রাজনৈতিক চাপ তাকে দমাতে পারেনি—এটাই তার রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।
তিনি বিশ্বাস করেন, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়; রাজনীতি মানে জনগণের অধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে সক্রিয়।
মির্জা আব্বাসের রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়—তিনি জয়-পরাজয়ের হিসাবের রাজনীতিবিদ নন। বরং তিনি সংগ্রাম, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের রাজনীতির প্রতিনিধি। তার মতো ত্যাগী ও লড়াকু নেতা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সত্যিই বিরল।
রাজপথ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—এই দীর্ঘ পথচলায় মির্জা আব্বাস নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন পরীক্ষিত, সাহসী ও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনীতিবিদ হিসেবে। রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবেই, সমালোচনা হবেই; তবে ইতিহাস, বাস্তবতা ও মাঠের অভিজ্ঞতা তাকে একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।