ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৩:১৬:০৯ PM

শোকের মহাকাব্য-৩

মান্নান মারুফ
01-01-2026 12:52:25 PM
শোকের মহাকাব্য-৩

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

একটি মানুষের শেকড় জানার আগে তার কণ্ঠ বোঝা যায় না।
তার দৃঢ়তা কোথা থেকে এলো, তার নীরবতা কেন এত শক্তএসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে থাকে জন্মের ভেতর, পরিবারে, শৈশবের ছোট ছোট অভ্যাসে।

এই গল্পের শুরু কোনো রাজপথে নয়।
শুরু একটি সাধারণ ঘরে, একটি সাধারণ পরিবারের ভেতর।

১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট।
বাংলার উত্তর প্রান্তের দিনাজপুর জেলা তখনও খুব শান্ত। বড় কোনো রাজনীতির গর্জন সেখানে পৌঁছায়নি। চারপাশে ছিল খোলা মাঠ, কাঁচা রাস্তা, বিকেলের নরম বাতাস। সেই দিন একটি কন্যাশিশুর জন্ম হলোযে তখন জানত না, একদিন এই দেশ তার নাম জানবে।

তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন সংযত স্বভাবের মানুষ। কথা কম বলতেন, কিন্তু যা বলতেন, তাতে দৃঢ়তা থাকত। তিনি বিশ্বাস করতেনমানুষের আসল পরিচয় তার আচরণে, তার নৈতিকতায়। মেয়েকে তিনি বড় কোনো স্বপ্ন শেখাননি, শুধু শিখিয়েছিলেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে।

তার মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন নীরব শক্তির প্রতীক। সংসার সামলাতেন নিখুঁতভাবে, কিন্তু সেই নিখুঁততার ভেতর ছিল শাসন নয়, ছিল শৃঙ্খলা। মেয়েকে কখনো জোরে কথা বলতে শোনা যেত না, কিন্তু চোখের ভাষায় বোঝা যেততিনি মেয়েকে দেখছেন, বুঝছেন, গড়ে তুলছেন।

এই ঘরেই গড়ে উঠছিল এক চরিত্র।

শৈশবের দিনগুলো খুব সাধারণ ছিল। কোনো বিলাসিতা ছিল না, আবার অভাবের ভারও ছিল না। সকালে স্কুলে যাওয়া, বিকেলে বইয়ের পাশে বসে থাকা, মায়ের পাশে চুপচাপ বসে গল্প শোনাএই ছিল তার জগৎ।

তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না।
কিন্তু খুব মন দিয়ে শুনতেন।

পাড়ার বড়রা যখন দেশ নিয়ে কথা বলত, তিনি দূরে বসে থাকতেন। তখনো রাজনীতির ভাষা বোঝার বয়স হয়নি, কিন্তু কণ্ঠের ওঠানামা, মুখের কঠোরতাএসব তার মনে দাগ কাটত। তিনি বুঝতে শিখেছিলেন, দেশ মানে শুধু মানচিত্র নয়মানুষের জীবনও।

দেশভাগের সময় তার বয়স খুব কম। তবু সেই সময়ের অস্থিরতা পরিবারকে স্পর্শ করেছিল। মানুষ আসছিল, যাচ্ছিল। কেউ নিজের ভিটা ছেড়ে চলে যাচ্ছে, কেউ নতুন জায়গায় শেকড় গড়তে চেষ্টা করছে। এই দৃশ্যগুলো তার মনে অজান্তেই স্থায়ী হয়ে বসে।

পরিবারের আদি শেকড় ছিল ফেনীতে। পরে জীবনের প্রয়োজনে জায়গা বদলাতে হয়েছে। কিন্তু শেকড়ের গল্প কখনো বদলায়নি। ঘরের ভেতর বারবার শোনা যেত—“আমাদের মানুষ হতে হবে, যেখানেই থাকি।

এই কথাটাই হয়তো তার ভেতরে সবচেয়ে গভীরভাবে বসে গিয়েছিল।

স্কুলে তিনি খুব চঞ্চল ছিলেন না। শিক্ষকরা বলতেন, “মেয়েটা শান্ত, কিন্তু চোখে বুদ্ধি আছে।তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করতেন। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাকে কেউ আলাদা করে চিনত না। তিনি ছিলেন অনেকের একজন।

কিন্তু অনেকের একজন হয়েও তিনি আলাদা ছিলেন।

কোনো ঝগড়ায় জড়াতেন না। আবার অন্যায় দেখলেও চোখ ফিরিয়ে নিতেন না। ছোটখাটো ঘটনায় তিনি মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেতেনশান্তভাবে। এই শান্ত মধ্যস্থতাই ছিল তার স্বভাব।

পরিবার তাকে কখনো রাজনীতির কথা শেখায়নি। বরং শেখিয়েছেসংযম, ধৈর্য, আত্মসম্মান। তার মা বলতেন,
মেয়েমানুষের শক্তি চিৎকারে নয়, স্থিরতায়।

এই কথাগুলো তার ভেতরে গেঁথে গিয়েছিল।

ঢাকায় এসে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়ার সময় তার জীবন একটু বদলাতে শুরু করে। বড় শহর, নতুন মানুষ, নতুন চিন্তা। এখানে তিনি দেখলেননারীরা শুধু ঘরের ভেতর নয়, বাইরেও নিজেদের জায়গা তৈরি করছে। কিন্তু তিনি তখনো নিজেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়াননি।

তিনি তখনো নিজের ভেতরের পথ খুঁজছিলেন।

এই সময়েই তার জীবনে এলেন একজন মানুষযার সঙ্গে তার জীবন চিরতরে জড়িয়ে যাবে। সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান। তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠল খুব সাধারণভাবে। কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল বোঝাপড়া।

বিয়ের পর তার জীবন আবারও ঘরের ভেতরে ফিরে গেল। সেনা পরিবারের স্ত্রী হিসেবে তাকে শিখতে হলো নতুন নিয়ম, নতুন শৃঙ্খলা। স্বামীর বদলি, এক শহর থেকে আরেক শহরএই ছিল বাস্তবতা।

এই সময়টায় তিনি শিখলেন অপেক্ষা করতে।
শিখলেন নীরবে শক্ত থাকতে।
শিখলেন নিজের কষ্ট নিজে সামলাতে।

এই শিক্ষাগুলো পরে তার জীবনে অমূল্য হয়ে উঠবেতখন তিনি জানতেন না।

তিনি কখনো ভাবেননি, তিনি নেতা হবেন। কখনো স্বপ্ন দেখেননি, একদিন লাখো মানুষ তার নাম বলবে। তিনি শুধু একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন সাধারণ নারী ছিলেন।

কিন্তু সময় তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।

তার পরিবার তাকে দিয়েছিল যে ভিত্তিসংযম, আত্মমর্যাদা, ধৈর্যসেই ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে তিনি পরে রাজনীতির কঠিন মাটিতে পা রাখবেন। রাজপথে নামার আগে তার ভেতরে তৈরি হয়ে গিয়েছিল এক দৃঢ় মানুষ।

কারণ একজন আপোষহীন নেত্রীর জন্ম হঠাৎ করে হয় না।
তার জন্ম হয় এক শান্ত ঘরে,
এক সংযত পরিবারে,
এক মেয়ের নীরব বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে।

 

চলবে………………….