ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৩:১৯:৩৪ PM

শোকের মহাকাব্য-২

মান্নান মারুফ
01-01-2026 12:33:18 PM
শোকের মহাকাব্য-২

চিরবিদায় আপোষহীন নেত্রী

সময় খুব অদ্ভুত জিনিস। সে কাউকে থামিয়ে রাখে না, আবার কাউকে হঠাৎ করে বড় করে তোলে। কেউ কেউ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়, আর কেউ কেউ সময়কে নিজের সাক্ষী বানিয়ে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় এমন একজন মানুষ ছিলেন যার জীবন যেন সময়ের প্রতিটি বাঁক নিজ চোখে দেখে এসেছে।

তিনি শুধু রাজনীতির অংশ ছিলেন না,
তিনি ছিলেন সময়ের সাক্ষী।

যখন দেশ নতুন করে দাঁড়াতে শিখছিল, তিনি তখন একজন গৃহবধূ।
যখন সামরিক শাসনের ছায়া নেমে এসেছিল, তিনি তখন নীরব শক্তি।
আর যখন গণতন্ত্রের জন্য রাজপথ কাঁপছিল, তখন তিনি ছিলেন আন্দোলনের মুখ।

এই সময়কে তিনি দেখেছেন কাছ থেকে, খুব কাছ থেকে।

তার জীবন শুরু হয়েছিল সাধারণ নিয়মে। রাজনীতি তখন তার জগৎ ছিল না। স্বামী একজন সেনা কর্মকর্তা, সংসার, সন্তানএই নিয়েই তার দিন কেটে যাচ্ছিল। তিনি জানতেন, দেশ বদলাচ্ছে। রেডিওতে খবর শুনতেন, পত্রিকার শিরোনাম পড়তেন। কিন্তু তখনো তিনি ভাবেননিএকদিন এই খবরের শিরোনামেই তার নাম লেখা হবে।

সময় ধীরে ধীরে তাকে প্রস্তুত করছিল।

১৯৭১-এর যুদ্ধ, স্বাধীনতার উল্লাস, আবার হতাশাসবকিছু তিনি দেখেছেন দূর থেকে। একজন সাধারণ নাগরিকের চোখে। দেশের রাজনীতি তখন ছিল পুরুষশাসিত, কঠিন আর রূঢ়। সেখানে নারীর জায়গা ছিল খুব সীমিত।

কিন্তু সময় জানত, কাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

একদিন হঠাৎ করেই তার জীবনে নেমে এলো অন্ধকার। স্বামীকে হারানোর শোক শুধু ব্যক্তিগত ছিল না, তা ছিল রাষ্ট্রীয় ট্র্যাজেডিও। সেই শোক তাকে ভেঙে দেয়নি, বরং ধীরে ধীরে শক্ত করে তুলেছিল। মানুষ দেখলতিনি কাঁদছেন, কিন্তু ভেঙে পড়ছেন না।

এই দৃশ্যটা দেশ ভুলতে পারেনি।

সময় তখন দ্রুত বদলাচ্ছিল। সামরিক শাসনের ভারে মানুষ ক্লান্ত। রাজপথে ক্ষোভ জমছিল। রাজনৈতিক দলগুলো নেতৃত্ব খুঁজছিলএমন একজন মানুষ, যিনি ভয় পাবেন না, যিনি আপস করবেন না।

ঠিক তখনই তিনি সামনে এলেন।

তিনি রাজনীতিতে এলেন কোনো জোরে নয়, কোনো উচ্চকণ্ঠে নয়। এলেন নীরবে। কিন্তু তার নীরবতার ভেতরে ছিল দৃঢ়তা। দলের সাধারণ কর্মীরা অবাক হয়ে দেখলএই নারী কম কথা বলেন, কিন্তু সিদ্ধান্তে অটল।

সময় তাকে পরীক্ষা করতে শুরু করল।

গ্রেপ্তার, হুমকি, অবরোধকিছুই বাদ গেল না। অনেকেই ভেবেছিল, তিনি হয়তো একসময় সরে দাঁড়াবেন। কিন্তু প্রতিবারই সময় দেখলতিনি পিছু হটছেন না। বরং প্রতিটি আঘাত তাকে আরও শক্ত করছে।

রাজপথে যখন লাঠিচার্জ হয়, তিনি তখন ঘরে বসে থাকেননি।
যখন কারাগারের দরজা বন্ধ হয়েছে, তিনি মাথা নিচু করেননি।
যখন আপসের প্রস্তাব এসেছে, তিনি নীরবে না বলে দিয়েছেন।

এই না-গুলোর মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠলেন সময়ের প্রতীক।

মানুষ তার মধ্যে নিজের গল্প দেখতে শুরু করল। একজন মা দেখলএই নারী সন্তান হারানোর শোক বোঝেন। একজন কর্মী দেখলএই নেত্রী ভয় না পেলে, আমরাও ভয় পাব না। একজন তরুণ দেখলএই নেতৃত্ব আমাদের ভবিষ্যৎ।

সময় এগোতে থাকল।

১৯৯০-এর দশকে দেশ দাঁড়িয়ে গেল এক নতুন মোড়ে। গণতন্ত্র ফিরল, নির্বাচন হলো। মানুষ ভোট দিতে গেল নতুন আশা নিয়ে। সেই নির্বাচনে ইতিহাস তৈরি হলো। তিনি হলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

এই মুহূর্তটা শুধু তার ব্যক্তিগত জয় ছিল না, ছিল সময়ের জয়।

তিনি জানতেন, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। তাই তিনি সময়কে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে স্থিতিশীল করাএসব ছিল তার লক্ষ্য। সময় তখন তাকে সুযোগ দিল, আর তিনি সেই সুযোগ নিলেন দায়িত্বের সঙ্গে।

তবু সময় সহজ ছিল না।

রাজনীতি মানেই দ্বন্দ্ব, সমালোচনা, অভিযোগ। তিনি প্রশংসা পেয়েছেন, আবার কঠোর সমালোচনাও শুনেছেন। কিন্তু সময় দেখলতিনি সবকিছু নীরবে সহ্য করছেন। প্রকাশ্যে কম প্রতিক্রিয়া, কিন্তু ভেতরে দৃঢ় অবস্থান।

একসময় ক্ষমতা ছাড়তে হলো। সময় আবার তার বিপরীতে দাঁড়াল। তিনি বিরোধী দলে বসলেন। সংসদের বেঞ্চ বদলাল, কিন্তু তার অবস্থান বদলায়নি। তিনি তখনো সময়ের সাক্ষীএইবার অন্য দিক থেকে।

বছর পেরোল। আবার ক্ষমতা এল, আবার গেল। রাজনীতির চাকা ঘুরতেই থাকল। তিনি দেখলেন, নতুন প্রজন্ম আসছে, নতুন ভাষা, নতুন দাবি। তিনি সবকিছু বুঝতে চেষ্টা করলেন। সবসময় সফল হননি, কিন্তু চেষ্টা থামাননি।

সময় তখন আরও কঠিন হলো।

কারাবাস, অসুস্থতা, একাকীত্বসব মিলিয়ে জীবনটা ভারী হয়ে উঠল। অনেকেই ভাবল, এবার বুঝি সব শেষ। কিন্তু সময় আবার দেখলতিনি ভেঙে পড়েননি। শরীর দুর্বল হয়েছে, কিন্তু মন নয়।

এই সময়েই মানুষ তাকে নতুনভাবে চিনল।

তিনি আর শুধু রাজনীতিবিদ নন, তিনি হয়ে উঠলেন সংগ্রামের প্রতীক। একজন মানুষ কতটা সময়ের সঙ্গে লড়াই করতে পারেতার জীবনে সেটার প্রমাণ পাওয়া গেল।

শেষদিকে তিনি খুব কম কথা বলতেন। শরীর কথা শুনত না। কিন্তু চোখে এখনো ছিল সেই পরিচিত দৃঢ়তা। মানুষ যখন তাকে দেখতে যেত, তখন বুঝতসময় তাকে ক্লান্ত করেছে, হার মানাতে পারেনি।

এখন, যখন সময় তার পথ থামিয়ে দিয়েছে, তখন পেছনে তাকালে দেখা যায়তিনি শুধু ঘটনাগুলো দেখেননি, ঘটনাগুলোকে বদলাতেও চেষ্টা করেছেন। তিনি সময়ের দর্শক ছিলেন না, ছিলেন অংশগ্রহণকারী।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক নাম থাকবে। অনেকেই আসবে, যাবে। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেযারা সময়ের পাতায় শুধু লেখা হয় না, সময়কে দিয়ে লিখিয়ে নেয় নিজেদের গল্প।

খালেদা জিয়া ছিলেন তেমনই একজন।

সময়ের সাক্ষী।
নীরব, দৃঢ়, অবিচল।

চলবে…………..