ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৩:১৭:৩৩ PM

শোকের মহাকাব্য-১

মান্নান মারুফ
01-01-2026 12:15:00 PM
শোকের  মহাকাব্য-১

 শোকস্তব্ধ বাংলাদেশ

দিনটি ছিল মঙ্গলবার। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। ঢাকা শহর হঠাৎ চুপ।  ঢাকা শহর সাধারণত কখনোই চুপ থাকে না। ভোর হলেই বাসের হর্ন, রিকশার ঘণ্টা, মানুষের ব্যস্ত পায়ের শব্দ—সব মিলিয়ে শহর জেগে ওঠে। কিন্তু সেই দিন ভোরে ঢাকাকে যেন কেউ থামিয়ে দিয়েছিল। বাতাসে ছিল এক ধরনের ভারী বিষণ্নতা। মানুষ কথা বলছিল কম, চোখে চোখে তাকাচ্ছিল বেশি।
রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন—সবখানেই একটাই সংবাদ।
বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে।
বেগম খালেদা জিয়া আর নেই।
খবরটা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি কেউ। অনেকেই ভেবেছিল, হয়তো গুজব। কেউ কেউ বলছিল, “না, উনি শক্ত মানুষ। এত সহজে হার মানার মানুষ নন।” কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন নিশ্চিত খবর আসতে লাগল, তখন আর সন্দেহের জায়গা রইল না।
দেশ ধীরে ধীরে শোকে ঢেকে গেল।
সরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হলো। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়—সবখানে একই দৃশ্য। রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হলো। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বড় বড় কালো শিরোনাম, টেলিভিশনের পর্দায় স্থির ছবি—এক দৃঢ় মুখ, ক্লান্ত চোখ, তবু অদ্ভুত এক আত্মমর্যাদা।
সেই মুখটা বাংলাদেশের মানুষ চেনে বহু বছর ধরে।
কেউ তাকে ভালোবেসেছে, কেউ বিরোধিতা করেছে, কেউ রাগ করেছে—কিন্তু অস্বীকার করতে পারেনি।
রাস্তায় মানুষ থেমে যাচ্ছিল পোস্টারের সামনে। কোথাও কোথাও নিজ উদ্যোগে ব্যানার টাঙানো হয়েছে—
“চিরবিদায় আপোষহীন নেত্রী।”
দুপুরের দিকে খবর এলো—রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন হবে।
এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই যেন মানুষের ঢল নামল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করল ঢাকার দিকে। কেউ বাসে, কেউ ট্রেনে, কেউ ট্রাকে। অনেকেই শুধু বলছিল, “শেষবার একটু দেখতে চাই ম্যাডামকে।”
ঢাকার আকাশ সেদিন অদ্ভুতভাবে মেঘলা ছিল। সূর্য থাকলেও আলো যেন ঠিকভাবে নামছিল না। শহরের ওপর নেমে এসেছিল এক ধরনের নীরব শোক।
জানাজার দিন সকাল থেকেই মানুষের স্রোত।
বয়স্ক মানুষ, যাদের চুল সাদা হয়ে গেছে—তারা বলছিল, “আমরা তাকে প্রথম দেখেছি এরশাদের সময়।”
মাঝবয়সীরা বলছিল, “১৯৯১ সালে ভোট দিতে গিয়ে তার নাম শুনেছিলাম।”
আর তরুণরা বলছিল, “আমরা রাজনীতিতে তাকে দেখেছি সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে।”
জানাজার মাঠ ধীরে ধীরে মানুষের সমুদ্রে রূপ নিল।
লাখো মানুষের মাথার ওপর দিয়ে ভেসে আসছিল কোরআন তিলাওয়াতের শব্দ। কারও চোখে জল, কারও মুখে নীরবতা, কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অতীতের কথা বলছিল।
এক বৃদ্ধা নারী তার ছেলের হাত ধরে বললেন,
“এই মানুষটার জন্য কত রাত আমরা রাস্তায় ছিলাম, জানিস?”
ছেলেটা কিছু বলল না। শুধু মায়ের হাত শক্ত করে ধরল।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আনুষ্ঠানিকতা ছিল নিখুঁত। গার্ড অব অনার, সামরিক সালাম, রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতি—সবকিছুতেই ছিল সম্মান আর সংযম। কিন্তু এসবের বাইরে ছিল আরেক দৃশ্য—সাধারণ মানুষের আবেগ, যা কোনো নিয়মে বাঁধা যায় না।
একজন রিকশাচালক ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
একজন তরুণী মাথায় ওড়না টেনে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।
একজন বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা চুপচাপ স্যালুট করছিল।
কেউ জোরে স্লোগান দেয়নি। কেউ হৈচৈ করেনি। শোকটা ছিল গভীর, শান্ত।
দাফনের সময় যখন মাটি নামতে শুরু করল, তখন বাতাসটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। অনেকেই চোখ মুছছিল। কেউ কেউ মাটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে দোয়া পড়ছিল।
“আল্লাহ, উনাকে শান্তি দিও।”
এই মানুষটি একদিন রাজনীতিতে এসেছিলেন নীরবে। কেউ ভাবেনি, তিনি এতদূর যাবেন। স্বামী হারানোর শোক নিয়ে যিনি প্রথমে রাজনীতির ময়দানে নামেন, তিনিই একদিন হয়ে উঠলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মুখ।
সেই দিন কবরস্থানে দাঁড়িয়ে মানুষ শুধু একজন রাজনীতিককে নয়, নিজের জীবনের অনেক স্মৃতিকেও বিদায় জানাচ্ছিল।
কারও কাছে তিনি ছিলেন আশার নাম,
কারও কাছে প্রতিবাদের,
কারও কাছে শক্তির।
দাফন শেষে মানুষ ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করল। কিন্তু শোকটা থেকে গেল। ঢাকার সন্ধ্যা সেদিন ছিল অস্বাভাবিক শান্ত। চায়ের দোকানে রাজনীতি নিয়ে তর্ক হয়নি। বাসে হইচই হয়নি।
টেলিভিশনে বারবার ভেসে উঠছিল তার জীবনের ছবি—মিছিলে দাঁড়িয়ে থাকা, সংসদে বক্তৃতা, কারাগারের লোহার গেটের সামনে দৃঢ় মুখ।
রাতে যখন শহরের আলো জ্বলে উঠল, তখন মনে হচ্ছিল—একটা আলো নিভে গেছে, যার উজ্জ্বলতা বহু বছর মানুষ দেখেছে।
বাংলাদেশ সেদিন বুঝেছিল, ইতিহাস শুধু বইয়ে লেখা হয় না—কখনো কখনো মানুষের চোখের জল দিয়েও লেখা হয়।
আর সেই ইতিহাসের এক বড় অধ্যায় সেদিন চুপচাপ বন্ধ হয়ে গেল।
নীরবে।
গভীর মর্যাদায়।
চলবে……………