(ভ্রমণ, দায়িত্ব ও নীরব প্রস্তুতির বছর)
বিবাহ মানে শুধু দুটি মানুষের এক হওয়া নয়,
কখনো কখনো তা একটি জীবনের দিক বদলে দেওয়া অধ্যায়।
তার জীবনেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল।
জিয়াউর রহমান—একজন সেনা কর্মকর্তা, শৃঙ্খলাপরায়ণ, দায়িত্বশীল, কম কথা বলা মানুষ। আর তিনি—শান্ত, সংযত, পর্যবেক্ষণপ্রবণ। এই দুই ভিন্ন স্বভাবের মানুষের মিলন খুব বেশি শব্দে হয়নি। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ গল্প ছিল না। ছিল দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্মান আর ধীরে গড়ে ওঠা বিশ্বাস।
বিয়ের পরপরই তিনি বুঝতে পারলেন—এই সংসার সাধারণ কোনো সংসার নয়। সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হওয়া মানে শুধু স্বামীর পাশে থাকা নয়, মানে অপেক্ষা, মানে স্থানান্তর, মানে অনিশ্চয়তা মেনে নেওয়া।
আজ এখানে, কাল সেখানে—এই ছিল তাদের জীবন।
জিয়াউর রহমানের চাকরির সূত্রে তাদের যেতে হয়েছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। প্রতিটি দেশ ছিল নতুন, প্রতিটি শহর ছিল অচেনা। কিন্তু তিনি কখনো অভিযোগ করেননি। নিজের ভেতরেই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করতেন—নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন ভাষা।
প্রথম দিকে বিদেশযাত্রা তার কাছে ছিল ভয়ের মতো। বিমানবন্দরের বড় হলঘর, অচেনা মুখ, ভিন্ন ভাষার ঘোষণা—সবকিছুই তাকে একটু থমকে দিত। কিন্তু তিনি ভয় দেখাতেন না। বরং চুপচাপ সবকিছু লক্ষ্য করতেন।
বিদেশে থাকা মানে ছিল নিজের দেশকে দূর থেকে দেখা।
পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ—বিভিন্ন জায়গায় তাদের থাকতে হয়েছে। কোনো জায়গায় স্বল্প সময়, কোনো জায়গায় কিছুটা দীর্ঘ। প্রতিটি জায়গায় তিনি নতুন করে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন।
বিদেশে সেনা কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের একটা নির্দিষ্ট জীবন ছিল। সামাজিক অনুষ্ঠান, সীমিত পরিসরের বন্ধুত্ব, শিষ্টাচার—সবকিছুই নিয়মে বাঁধা। তিনি এই নিয়ম ভাঙেননি। বরং নিয়মের মধ্যেই নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন।
বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনধারা তাকে গভীরভাবে ভাবাত। কোথাও দেখতেন—নারীরা খুব স্বাধীনভাবে কথা বলে। কোথাও দেখতেন—নারীরা ঘরের বাইরে খুব কম আসে। তিনি তুলনা করতেন না প্রকাশ্যে, কিন্তু মনে মনে ভাবতেন—একটি সমাজ মানুষকে কতভাবে গড়ে তোলে।
স্বামীর সঙ্গে ভ্রমণের সময় তিনি খুব কম কথা বলতেন। জিয়া কথা বলতেন কাজ নিয়ে, দায়িত্ব নিয়ে। তিনি শুনতেন। মাঝে মাঝে ছোট্ট কোনো প্রশ্ন করতেন। সেই প্রশ্নগুলো খুব সাধারণ হলেও গভীর ছিল।
একবার ইউরোপের এক শহরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বলেছিলেন,
“এখানে মানুষ খুব নিয়ম মেনে চলে।”
জিয়া হেসে বলেছিলেন,
“নিয়ম না থাকলে রাষ্ট্র টিকে না।”
এই কথাটা তিনি মনে রেখে দিয়েছিলেন।
ভ্রমণের সময় তিনি শহর দেখতেন খুব মন দিয়ে। রাস্তা, মানুষ, দোকান, পার্ক—সবকিছু তার চোখে পড়ত। তিনি ভাবতেন—একটি শহর শুধু ইট-পাথরের নয়, শহর মানুষের আচরণে তৈরি হয়।
বিদেশে থাকার সময় তিনি রান্না করতেন নিজ হাতে। দেশি খাবারের স্বাদ ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। কারণ খাবার মানেই ছিল শেকড়। দূরে থাকলেও নিজের পরিচয় ধরে রাখার একমাত্র উপায়।
এই সময়েই তিনি শিখেছিলেন—নিজের অস্তিত্ব নীরবে রক্ষা করতে হয়।
স্বামীর পরিচয়ে তিনি পরিচিত ছিলেন, কিন্তু নিজেকে তিনি কখনো শুধু পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেননি। বই পড়তেন, খবর পড়তেন, রেডিও শুনতেন। বাংলাদেশের খবর পেলেই মনটা ভারী হয়ে উঠত।
দেশ তখন নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি, সামরিক শাসন, মানুষের আশা-হতাশা—সবকিছু তিনি দূর থেকে অনুভব করতেন। তিনি তখনো জানতেন না—একদিন এই সবকিছুর কেন্দ্রেই তাকে দাঁড়াতে হবে।
ভ্রমণের সময় এক দেশে তিনি দেখেছিলেন—রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী সামাজিক কাজে সরাসরি যুক্ত। কোথাও দেখেছিলেন—তাদের কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা নেই। তিনি তখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। শুধু দেখছিলেন, শিখছিলেন।
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধার। জিয়া খুব বেশি আবেগ প্রকাশ করতেন না। কিন্তু তার দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম—এসব তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
রাতের বেলায়, কখনো কখনো তারা দেশের কথা বলতেন। তিনি শুনতেন বেশি, বলতেন কম। কিন্তু এই শোনাটাই ছিল তার প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় অংশ।
একাধিক দেশে থাকার ফলে তিনি মানুষের মন বুঝতে শিখেছিলেন। ভাষা না জানলেও মানুষের মুখভঙ্গি, আচরণ—এসব তিনি বুঝতেন। এই বোঝাপড়ার ক্ষমতাই পরবর্তীতে তাকে রাজনৈতিক জনতার কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
এই ভ্রমণগুলো তাকে বিলাসী করেনি। বরং আরও সংযত করেছে। তিনি জানতেন—সবকিছু স্থায়ী নয়। আজকের আরাম, আগামী দিনের নিশ্চয়তা নয়।
স্বামীর সঙ্গে এই ঘুরে বেড়ানোর দিনগুলো ছিল তার জীবনের নীরব পাঠশালা। কোনো বক্তৃতা ছিল না, কোনো মঞ্চ ছিল না। ছিল পর্যবেক্ষণ, উপলব্ধি আর ধীরে তৈরি হওয়া দৃঢ়তা।
তিনি একজন স্ত্রী।
একজন সহযাত্রী।
একজন নীরব শিক্ষার্থী।
কিন্তু ইতিহাস জানে—
এই নীরব শিক্ষার সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কারণ যারা শব্দে নয়, অভিজ্ঞতায় শেখে—
তারা একদিন দায়িত্ব এলে পিছু হটে না।
এই ভ্রমণ, এই সংসার, এই অপেক্ষা—
সব মিলিয়েই তাকে তৈরি করছিল এক কঠিন ভবিষ্যতের জন্য।
আর সেই ভবিষ্যৎ খুব দূরে ছিল না তখন।
চলবে………………..