ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১০:২০:০৩ PM

‘বেনজীরের ক্যাশিয়ারের হলফনামায় সম্পদের পাহাড়

স্টাফ রিপোট।। দৈনিক সমবাংলা
01-01-2026 08:05:20 PM
‘বেনজীরের ক্যাশিয়ারের হলফনামায় সম্পদের পাহাড়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে উঠে আসছে চমকপ্রদ তথ্য। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. জসীম উদ্দীন আহমেদের সম্পদ বিবরণ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ‘বেনজীরের ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত জসীম উদ্দীন ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদ গত দেড় বছরে বেড়েছে প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা। বর্তমানে তাঁদের নামে রয়েছে ৪৪টি ফ্ল্যাট, দুটি বাড়ি, একটি পুরোনো সাততলা ভবন এবং দুটি অভিজাত হোটেলের মালিকানা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন জমার সময় ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা এবং এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

নগদ অর্থেই ১৫ কোটি টাকা

সর্বশেষ হলফনামা অনুযায়ী, মো. জসীম উদ্দীন আহমেদের মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪০ কোটি ৪১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১৩ টাকা। এর মধ্যে শুধু নগদ অর্থ রয়েছে ১৫ কোটি ১ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৯ টাকা। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী তানজিনা সুলতানা জুহির মোট সম্পদ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৯৫ হাজার ৩০০ টাকা, যার মধ্যে নগদ অর্থ ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ টাকা।

এক বছর আট মাসের ব্যবধানে জসীম দম্পতির মোট সম্পদ বেড়েছে ৮ কোটি ৪৫ লাখ ১৭ হাজার ৬৬ টাকা। তবে এই সময়ে জসীমের সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১৬ কোটি টাকা, বিপরীতে তাঁর স্ত্রীর সম্পদ কমেছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল জসীম উদ্দীনের সম্পদের পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ২৫ লাখ ৮৬ হাজার ২০০ টাকা এবং তাঁর স্ত্রীর সম্পদ ছিল ১০ কোটি ৭৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৭ টাকা।

হোটেল ব্যবসায়ী জসীম

হলফনামা অনুযায়ী পেশাগতভাবে মো. জসীম উদ্দীন একজন অভিজাত হোটেল ব্যবসায়ী। তাঁর মালিকানায় রয়েছে কক্সবাজারের রামাদা হোটেল, যা অফিসিয়ালি ‘আইবিআইএস লিমিটেড’ নামে নিবন্ধিত। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি এলাকায় ‘জেসিকা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামে আরেকটি হোটেলের মালিক তিনি।

২০২৪ সালের হলফনামায় তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছিল ১ কোটি ৭১ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৫ টাকা। এর মধ্যে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান ভাড়া ও ব্যবসা থেকে আয় ছিল ১ কোটি ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৩ টাকা। পাশাপাশি বৈদেশিক আয় ছিল ৬৩ লাখ ৯ হাজার ৫৯২ টাকা, যদিও বৈদেশিক বিনিয়োগের দেশ উল্লেখ করা হয়নি।

বর্তমান হলফনামা অনুযায়ী, জসীম উদ্দীনের বার্ষিক আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫৫ লাখ ৪৭ হাজার ১৬৬ টাকা। অর্থাৎ এক বছর আট মাসে তাঁর আয় বেড়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে এবার তাঁর স্ত্রীর কোনো আয় দেখানো হয়নি।

আয় ও কর বিবরণ

বর্তমানে জসীমের আয়ের খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিখাত থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও দোকান ভাড়া থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩৬ টাকা এবং ব্যবসা থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ৬২ হাজার ১০০ টাকা। বিদেশি উৎস থেকে তাঁর আয় দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ ১ হাজার ৪৩০ টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মো. জসীম উদ্দীন আহমেদ ব্যক্তিগত আয়কর হিসেবে পরিশোধ করেছেন ১ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৫১ টাকা, যা তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ করদাতা রাজনীতিকদের কাতারে নিয়ে গেছে।

ফ্ল্যাট, বাড়ি ও জমির বিশাল তালিকা

হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জসীম উদ্দীনের মালিকানায় রয়েছে মোট ৪৪টি ফ্ল্যাট। এর মধ্যে কক্সবাজারে ৩০টি ফ্ল্যাটের মূল্য দেখানো হয়েছে ৬ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত এলাকা খুলশীতে পাঁচটি ফ্ল্যাটের দাম ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং পাঁচলাইশে তিনটি ফ্ল্যাটের মূল্য ১ কোটি ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ২৫০ টাকা। এছাড়া কক্সবাজারে তাঁর মালিকানায় রয়েছে আরও ছয়টি মিনি ফ্ল্যাট, যার মূল্য ১ কোটি ৫৪ লাখ ২২ হাজার টাকা।

স্থাবর সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে চন্দনাইশে অবস্থিত দুটি বাড়ি, যার মোট মূল্য ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৯৩ হাজার ৯০০ টাকা। এছাড়া তাঁর নামে রয়েছে ১ দশমিক ৩৩ একর নাল জমি এবং ১৫ লাখ টাকা মূল্যের সেলামি দোকান। চট্টগ্রামে তাঁর মালিকানাধীন একটি পুরোনো সাততলা ভবনের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ টাকা।

তাঁর স্ত্রী তানজিনা সুলতানা জুহির নামে খুলশীতে একটি ১০ হাজার ৩০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য ২ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।

মামলার তথ্য

হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জসীম উদ্দীনের বিরুদ্ধে দুটি এনআই অ্যাক্ট মামলা ও দুটি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় আটটি মামলা হয়।

সর্বশেষ হলফনামা অনুযায়ী, ঢাকার দুটি মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। বাকি কয়েকটি মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন জসীম উদ্দীন আহমেদ। ২০২৪ সালে চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। যদিও আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারান, তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের প্রত্যক্ষ সমর্থন তাঁর পক্ষে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওই নির্বাচনে তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে ২৮ ডিসেম্বর বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, জসীম উদ্দীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর এসব ছবি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে এবং দলের ভেতর ও বাইরে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মো. জসীম উদ্দীন আহমেদের বিপুল সম্পদ, দ্রুত সম্পদ বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এবং মামলার তথ্য এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার বিষয়। তাঁর দেওয়া হলফনামার তথ্য নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে চলে এসেছে।