মাত্র চার দিন আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেশে ফিরেছিলেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। দেশে ফেরার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার দাদু বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থাকতে চান এবং বাবার—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের—সহযোগী হতে চান। প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা, শৈশবের স্মৃতি এবং দেশের সেবায় নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনার কথাও তুলে ধরেছিলেন ওই পোস্টে।
তবে এত অল্প সময়ের মধ্যেই যে সেই সহযোগিতার দায়িত্ব বাস্তব রূপ নেবে, তা হয়তো ভাবেননি জিয়া পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের এই জ্যেষ্ঠ সদস্য। দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
মঙ্গলবার (৩১ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকরা বেগম খালেদা জিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবার অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে। বাবাকে হারানোর ৪১ বছর পর মা–কে হারালেন তারেক রহমান। আর দাদুকে কাছ থেকে না দেখলেও অসংখ্য স্মৃতি ও গল্পের মধ্য দিয়ে যাঁর সঙ্গে বেড়ে ওঠা—জাইমা রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সন্তানরা হারালেন তাদের প্রিয় ‘দাদু’কে।
শোকের ভারে তারেক রহমান
দেশে ফিরে নেতাকর্মীদের বিপুল সংবর্ধনা ও পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তারেক রহমান। কিন্তু এর মধ্যেই মাকে হারানোর গভীর শোক তাঁকে যেন বাকরুদ্ধ করে দেয়। একদিকে ব্যক্তিগত শোক, অন্যদিকে পরিবার ও দল—সবকিছু সামাল দিতে গিয়ে নিজের আবেগ প্রকাশের সুযোগও যেন পাননি তিনি।
১৯ বছর পর বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের পানি ফেললেও, মায়ের মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়নি দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা তারেক রহমানকে। দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, শোকের এই ভার তিনি নীরবেই বহন করছেন।
বাবার পাশে জাইমা রহমান
এই বাস্তবতায় জিয়া পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হিসেবে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের কাঁধেও পরিবারের দেখভাল ও বাবাকে সহযোগিতার দায়িত্ব এসে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। দেশে ফেরার পর খুব একটা প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিন শোকাহত পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে দেখা গেছে।
বুধবার সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন অ্যাম্বুলেন্সে করে গুলশানের বাসভবনে নেওয়া হলে সেখানে তারেক রহমানের পুরো পরিবার উপস্থিত ছিলেন। শেষ বিদায়ের সময় ক্যামেরায় দেখা যায়, তারেক রহমান বসে কোরআন তিলাওয়াত করছেন। আর তাঁর পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন জাইমা রহমান—চোখেমুখে গভীর বিষণ্নতার ছাপ।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ‘আমরা বিএনপি পরিবারের’ আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথা বলছেন জাইমা। দাদুকে হারানোর শোক স্পষ্ট ফুটে ওঠে তাঁর চোখেমুখে।
জানাজা ও দাফনে পরিবারের উপস্থিতি
গুলশান থেকে কফিন সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার দিকে নেওয়া হলে তারেক রহমান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ বাসে জানাজাস্থলে যান। জাইমা রহমানসহ পরিবারের নারী সদস্যরা তাঁদের জন্য নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে জানাজার নামাজ আদায় করেন।
জানাজা ও দাফনে জিয়া পরিবার থেকে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি, কোকোর দুই কন্যা জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তাঁর স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, জুবাইদার বোন শাহিনা জামানসহ অন্যান্য স্বজনরা। দাফন শেষে তাঁরা দোয়া করে বিদায় নেন।
বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিদেশি অতিথিরাও তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানান। পুরো সময় বাবার পাশেই ছিলেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
একই সময়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজ নিজ দেশের পক্ষ থেকে সমবেদনা বার্তা পৌঁছে দেন।
এ সময় কখনো বাবার পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো বসে জাইমা রহমান অতিথিদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় ও আলোচনায় অংশ নেন।
দায়িত্বের পথে নতুন অধ্যায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় বেগম খালেদা জিয়া আর রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন না—এমন ধারণা আগেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর পুরো দায়িত্ব এখন তারেক রহমানের কাঁধে এসে পড়েছে। আর সেই দায়িত্ব পালনে বাবার পাশে ধীরে ধীরে আরও সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যেতে পারে জাইমা রহমানকে।
দাদি’কে নিয়ে জাইমা রহমানের আবেগঘন পোস্ট
দেশে ফেরার আগের দিন, মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) নিজের ফেসবুক পোস্টে জাইমা রহমান লিখেছিলেন,
“অনেকগুলো বছর পর দেশে ফিরছি। দেশে ফেরা মানে আবেগ আর অনুভূতির এক অনন্য সংমিশ্রণ। দেশে ফিরে ইনশাআল্লাহ, আমি ‘দাদু’র পাশে থাকতে চাই। এই সময়টাতে আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই।”
তিনি আরও লিখেছিলেন, দাদুকে তিনি কখনো দেখেননি, কিন্তু তাঁর সততা ও দেশপ্রেমের গল্প শুনেই বড় হয়েছেন। দাদুর সঙ্গে শৈশবের স্মৃতিচারণায় তিনি তুলে ধরেন, কীভাবে একজন রাষ্ট্রনায়ক হয়েও পরিবারকে আগলে রাখা মমতাময়ী অভিভাবক ছিলেন খালেদা জিয়া।
এই স্মৃতির কথাই আজ নতুন করে ফিরে আসছে শোকের আবহে—যেখানে ব্যক্তিগত বেদনা আর রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলেমিশে জিয়া পরিবারের সামনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।