ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অভ্যন্তরীণভাবে বড় ধরনের চাপে পড়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত ও কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে সারা দেশের বিভিন্ন আসনে বিএনপির শতাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এসব নেতা দল ঘোষিত প্রার্থী কিংবা জোট প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা বিএনপির নীতিনির্ধারকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়াকে শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।
রুমিন ফারহানাসহ ৯ নেতা বহিষ্কার
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ ৯ জন নেতাকে দলের প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহ আলম, হাসান মামুন ও আব্দুল খালেক। এছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব, সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
নজরদারিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা
বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে যারা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, তাদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হবে। নির্দেশ অমান্য করলে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, “দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচনে থাকলে তা দলীয় ঐক্যকে দুর্বল করবে।”
তারেক রহমানের সতর্কবার্তা উপেক্ষিত
এর আগে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগ মুহূর্তে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের সবাইকে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য না করার ব্যাপারে সতর্ক করেন।
তবে তারেক রহমানের এই নির্দেশনার পরও বিপুলসংখ্যক নেতা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে বিএনপির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন।
দলীয় নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “অনেকে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন—এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের হাতে আসেনি। ধীরে ধীরে জানা যাবে কতগুলো আসনে কতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।”
সারা দেশে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ছড়াছড়ি
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে দেশের প্রায় সব বিভাগেই বিএনপির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামের একাধিক আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
কিছু আসনে একই দলের একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় এসব প্রার্থীরা ইতোমধ্যে জোরালো প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন, যা দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকে আরও জটিল করে তুলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এত বড় পরিসরে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থিতা বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে কার্যকর করতে না পারলে নির্বাচনী কৌশলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
একজন বিশ্লেষক বলেন, “বিএনপি যদি দ্রুত শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারে, তাহলে দলীয় ঐক্য প্রশ্নের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে এটি দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।”
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে—এমন বার্তাই স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কতজন প্রার্থী নির্দেশ মানবেন আর কতজন দলীয় শাস্তির মুখে পড়বেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ এই সংকট ততই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।