শিক্ষা ও শৈশব জীবন:-
শৈশব কখনো খুব বড় হয় না,
কিন্তু মানুষের ভেতরে তার ছায়া থাকে সবচেয়ে গভীর।
তার শৈশবও তেমনই—চুপচাপ, নিয়মে বাঁধা, কিন্তু ভিতরে ভিতরে শক্ত হয়ে ওঠার সময়। দেশভাগের পর নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়ার যে পাঠ তিনি ছোটবেলা থেকেই শিখেছিলেন, তারই পরের অধ্যায় ছিল শিক্ষা। বই, খাতা, স্কুলের বেঞ্চ—এইসবের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠছিল তার মনন।
দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ছিল তার শিক্ষাজীবনের প্রথম বড় ঠিকানা। স্কুলের লালচে দেয়াল, বড় জানালা, আর সারিবদ্ধ বেঞ্চ—সবকিছুই ছিল পরিমিত। এখানে কেউ খুব আলাদা করে নজরে পড়ত না। তবু কিছু ছাত্রীর চোখে আলাদা একটা শান্ত দৃঢ়তা থাকত—তিনি ছিলেন তাদের একজন।
তিনি খুব মেধাবী ছিলেন—এমন দাবি কেউ করত না। আবার পিছিয়েও ছিলেন না। নিয়মিত পড়তেন, মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। শিক্ষকরা জানতেন—এই মেয়েটি প্রশ্ন কম করে, কিন্তু বুঝে নেয় গভীরভাবে।
স্কুলে তিনি ছিলেন শান্ত। খেলাধুলায় খুব বেশি উৎসাহী ছিলেন না, আবার দূরে সরেও থাকেননি। অন্যরা যখন হৈচৈ করত, তিনি পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মাঝে মাঝে হাসতেন, কিন্তু সেই হাসিও ছিল সংযত।
তার সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল পড়ার সময়।
বই খুলে বসলে চারপাশের শব্দ যেন তার কাছে কমে যেত। ইতিহাসের বইয়ে যখন দেশ, মানুষ আর সংগ্রামের কথা পড়তেন, তখন তিনি ভাবতেন—এত মানুষ কেন লড়াই করে? কেন কেউ ক্ষমতা চায়, কেউ আবার প্রতিবাদ করে?
এই প্রশ্নগুলো মনের ভিতরে গুরপাক খেত। ক্তিু তিনি কাউকে প্রশ্ন করতেন না। নিজের ভেতরেই রেখে দিতেন।
তার মা চাইতেন, মেয়ে ভালো মানুষ হোক। শুধু ভালো ফল করলেই চলবে না—ভালো আচরণ, ভালো মন—এই শিক্ষা ছিল ঘরের ভেতরের সবচেয়ে বড় পাঠ। বাবা চাইতেন, মেয়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে বড় হোক। কখনো কারও সামনে মাথা নিচু না করে, আবার অহংকারও না করে।
এই দুই শিক্ষার মাঝখানেই গড়ে উঠছিল তার চরিত্র।
স্কুল থেকে ফিরে তিনি প্রায়ই মায়ের পাশে বসতেন। মা রান্না করতেন, আর তিনি চুপচাপ দেখতেন। এই চুপচাপ দেখার অভ্যাসটাই তাকে পরে অনেক কিছু বুঝতে সাহায্য করেছে। মানুষ কী বলে তার চেয়েও মানুষ কী করে—এই পার্থক্য তিনি তখনই শিখছিলেন।
স্কুলজীবনে কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। কোনো নাটকীয় সাফল্য, কোনো বড় পুরস্কার—এসব তার ঝুলিতে ছিল না। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল নিয়ম। সময়মতো ওঠা, সময়মতো পড়া, দায়িত্ব পালন—এই নিয়মের ভেতরেই তিনি নিজেকে তৈরি করছিলেন।
কিছু সহপাঠী তাকে নিয়ে বলত,
“ও খুব চুপচাপ।”
কেউ বলত,
“ও বেশি কথা বলে না।”
কিন্তু কেউ বলত না—তিনি দুর্বল।
কারণ তার চোখে ছিল স্থিরতা।
মাধ্যমিকের পর তার শিক্ষাজীবন তাকে নিয়ে গেল ঢাকায়—সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। গ্রাম বা মফস্বলের গণ্ডি পেরিয়ে শহরের এই বড় পরিবেশ তার সামনে নতুন দুনিয়া খুলে দিল। এখানে মানুষ বেশি, মত বেশি, কথাও বেশি।
ঢাকায় এসে তিনি প্রথম বুঝলেন—শহর আর গ্রামের জীবনের পার্থক্য কত গভীর।
এখানে মেয়েরা বেশি স্বাধীনভাবে কথা বলে, হাঁটে, ভাবনা প্রকাশ করে। কেউ কেউ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে, কেউ সমাজ নিয়ে। তিনি প্রথমে এসব আলোচনা শুধু শুনতেন। অংশ নিতেন না।
কারণ তিনি তখনো নিজের জায়গা খুঁজছিলেন।
কলেজের করিডোরে হাঁটার সময় তিনি চারপাশে তাকাতেন। দেয়ালে পোস্টার, নোটিশ বোর্ডে ঘোষণা—সবকিছুই তার চোখে পড়ত। কিন্তু তিনি ভেতরে ভেতরে পর্যবেক্ষক ছিলেন। কে কী বলছে, কীভাবে বলছে—এসব তিনি মনে রাখতেন।
এই সময়েই তিনি বুঝতে শুরু করলেন—নারী হওয়া মানে শুধু ঘরের ভেতর থাকা নয়। নারী চাইলে নিজের চিন্তাও রাখতে পারে। কিন্তু তিনি তখনো রাজনীতিতে জড়াননি। তার আগ্রহ ছিল মানুষের আচরণে, সম্পর্কের জটিলতায়।
কলেজজীবনে তার বন্ধুবৃত্ত খুব বড় ছিল না। দু-একজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, তাদের সঙ্গেই সময় কাটাতেন। তারা জানত—তিনি আবেগী নন, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য।
এক বান্ধবী একদিন বলেছিল,
“তুই খুব শক্ত মনে হয়।”
তিনি হেসে বলেছিলেন,
“আমি শক্ত না, চুপচাপ।”
এই চুপচাপ থাকার মধ্যেই তার শক্তি জমছিল।
এই সময়েই তার জীবনে আসে বিবাহ। সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শিক্ষাজীবনের এই অধ্যায় এখানেই শেষের পথে আসে। সংসার, দায়িত্ব—এসব তখন তার জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
কিন্তু শিক্ষা তার ভেতর থেকে হারিয়ে যায়নি।
তিনি বই পড়া ছাড়েননি। খবরের কাগজ পড়তেন নিয়মিত। স্বামীর কাজের সূত্রে দেশ, রাজনীতি, রাষ্ট্র—এসব নিয়ে আলোচনা শুনতেন। কিন্তু তিনি তখনো নিজেকে সামনে আনেননি।
এই শৈশব ও শিক্ষাজীবনই তাকে তৈরি করেছিল পরবর্তী কঠিন জীবনের জন্য।
তিনি শিখেছিলেন—
নীরবে শোনা,
সময় বুঝে কথা বলা,
দায়িত্ব এড়িয়ে না যাওয়া।
এই শিক্ষাগুলো কোনো পাঠ্যবইয়ে ছিল না। ছিল জীবনের পাঠে।
তিনি একজন ছাত্রী।
একটি পরিবারের মেয়ে।
একটি ভবিষ্যতের প্রস্তুতি।
এই প্রস্তুতিই একদিন তাকে ইতিহাসের পাতায় নিয়ে যায়—
নীরবে,
ধীরে,
কিন্তু দৃঢ়ভাবে।
চলবে…………..