দেশভাগ ও পারিবারিক শেকড়:-
একটি দেশের ভাগ হয় মানচিত্রে,
কিন্তু তার দাগ পড়ে মানুষের জীবনে।
খালেদা জিয়া যখন ছোট, তখন “দেশভাগ” শব্দটির মানে বুঝতেন না। বড়দের মুখে শুধু শুনতেন—চলা, ফেরা, হারানো, নতুন করে শুরু। তখন দেশভাগ ছিল তার কাছে কোনো ইতিহাসের অধ্যায় নয়, ছিল ঘরের ভেতরের চাপা উদ্বেগ, অজানা আশঙ্কা আর নীরব প্রস্তুতি।
তার পরিবারও সেই সময়ের স্রোতের ভেতর দিয়ে গেছে।
ভারতের জলপাইগুড়িতে তখন তাদের বসবাস। জায়গাটা খুব বড় কিছু ছিল না, কিন্তু পরিচিত ছিল। মানুষ চেনা, গাছ চেনা, রাস্তা চেনা—সবকিছুতেই ছিল অভ্যাসের টান। হঠাৎ করে সেই পরিচিত পৃথিবীটাই বদলে যেতে লাগল।
লোকজন বলাবলি করত—
“এই দেশ আর আগের মতো থাকবে না।”
“কে কোথায় যাবে, কেউ জানে না।”
এই কথাগুলো ছোট্ট মেয়েটির কানে ঢুকত, কিন্তু সে প্রশ্ন করত না। সে শুধু বড়দের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। তাদের চোখে যে অস্থিরতা দেখত, সেটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাত।
একদিন সিদ্ধান্ত এলো—চলে যেতে হবে।
কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে—সব প্রশ্নের উত্তর তখন স্পষ্ট ছিল না। শুধু জানা ছিল, পুরোনো জায়গা আর আগের মতো থাকবে না। পরিবার জিনিসপত্র গুছাতে শুরু করল। কাপড়, বই, কিছু প্রয়োজনীয় কাগজ—সবকিছুতেই ছিল তাড়াহুড়া।
সেই তাড়াহুড়ার ভেতর মেয়েটি দেখেছিল মায়ের চোখের জল।
চুপচাপ, শব্দহীন।
দেশভাগের সময় মানুষ শুধু জায়গা বদলায়নি, বদলেছে বিশ্বাস, সম্পর্ক, নিরাপত্তা। এই পরিবর্তনের ভার সবচেয়ে বেশি পড়েছিল নারীদের ওপর। তারা প্রশ্ন করেনি, শুধু মানিয়ে নিয়েছে।
খালেদা জিয়ার পরিবারও মানিয়ে নিয়েছিল।
নতুন করে যাত্রা শুরু হলো পূর্ব পাকিস্তানের দিকে। সেই যাত্রা সহজ ছিল না। ট্রেন, ভিড়, অজানা মুখ—সবকিছু মিলিয়ে ছোট্ট মেয়েটির মনে এক অদ্ভুত ভয় জন্ম নিয়েছিল। সে তখনো জানত না, এই ভয়ই একদিন তাকে শক্ত হতে শেখাবে।
নতুন জায়গায় এসে শুরু হলো নতুন জীবন।
পরিবারের আদি শেকড় ছিল ফেনীতে। সেখানে এসে তারা আবার ঘর বাঁধল। চারপাশের মানুষ নতুন, পরিবেশ নতুন, কিন্তু শেকড়ের টানটা ছিল পুরোনো। ফেনীর মাটি, মানুষের ভাষা, আচার—এসব ধীরে ধীরে আপন হয়ে উঠল।
এই জায়গাটাই পরে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
ফেনীতে তাদের জীবন ছিল সাধারণ। কোনো প্রাচুর্য ছিল না, আবার অভাবের হাহাকারও ছিল না। পরিবার তাকে শিখিয়েছিল—নিজের পরিচয় নিয়ে গর্ব করতে, কিন্তু অন্যকে ছোট না করতে।
বাবা তাকে বলতেন,
“মাটির সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে মানুষ শক্ত হয়।”
এই কথাটার মানে তখন পুরোপুরি বুঝতেন না, কিন্তু কথাটা মনে থাকত।
ফেনীর মানুষ ছিল সোজাসাপটা। তারা বেশি ঘুরিয়ে কথা বলত না। এই পরিবেশেই তিনি শিখেছিলেন সরলতা। এখানকার নারীরা সংসার সামলাত, আবার প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিত। এই দৃশ্যগুলো তার ভেতরে অজান্তেই প্রভাব ফেলছিল।
দেশভাগের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল—কিছুই চিরস্থায়ী নয়।
ঘর, জায়গা, নিরাপত্তা—সবই একদিন বদলে যেতে পারে।
এই উপলব্ধিটাই হয়তো তাকে পরবর্তী জীবনে আপস না করতে শিখিয়েছিল। কারণ যিনি জানেন, সবকিছু হারানো সম্ভব, তিনি হারানোর ভয় কম পান।
স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুরা যখন নিজেদের শেকড় নিয়ে গল্প করত, তিনি মন দিয়ে শুনতেন। কেউ বলত, “আমাদের বাড়ি অমুক জায়গায়।” কেউ বলত, “আমরা এখানে বহু পুরোনো।” তিনি তখন বুঝতে শিখেছিলেন—শেকড় মানে শুধু জায়গা নয়, স্মৃতি।
তার শেকড় ছিল বহু জায়গায় ছড়িয়ে—দিনাজপুরে জন্ম, জলপাইগুড়ির স্মৃতি, ফেনীর টান, ঢাকার বাস্তবতা। এই বহুমাত্রিক শেকড়ই তাকে সংকীর্ণ হতে দেয়নি।
পরিবারের ভেতরে দেশভাগ নিয়ে খুব বেশি কথা হতো না। বাবা চাইতেন না, সন্তানরা অতীতের কষ্টে আটকে থাকুক। কিন্তু নীরবতার মধ্যেও ইতিহাস কথা বলত।
একদিন সে মাকে প্রশ্ন করেছিল,
“আমরা কেন এখানে?”
মা একটু চুপ করে থেকে বলেছিলেন,
“কারণ সময় আমাদের এখানে এনেছে।”
এই উত্তরটা তার মনে গভীরভাবে বসে গিয়েছিল।
সময়—এই শব্দটাই পরে তার জীবনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
দেশভাগ তাকে শিখিয়েছিল মানিয়ে নিতে। নতুন পরিবেশে নিজের জায়গা তৈরি করতে। এই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই পরে তাকে রাজনীতির কঠিন মাঠে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।
তিনি দেখেছিলেন, মানুষ কিভাবে এক রাতের মধ্যে উদ্বাস্তু হয়ে যায়। কিভাবে পরিচয় বদলায়। এই অভিজ্ঞতা তাকে মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছিল।
তিনি কখনো এই গল্পগুলো প্রকাশ্যে বলেননি। নিজের শৈশবের কষ্টকে রাজনৈতিক পুঁজি বানাননি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা তার সিদ্ধান্তের গভীরে প্রভাব ফেলেছিল।
যখন তিনি ক্ষমতায় গিয়েছিলেন, তখনও তিনি জানতেন—মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় অনিশ্চয়তা। দেশভাগ সেই ভয় তাকে খুব কাছ থেকে দেখিয়েছিল।
খালেদা জিয়া একজন শিশু,
একটি পরিবারের অংশ,
একটি ভাঙা সময়ের নীরব সাক্ষী।
কিন্তু এই সাক্ষ্যই তাকে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত করেছিল।
কারণ যিনি একবার ভাঙন দেখেছেন,
তিনি জানেন—সবকিছু হারিয়েও আবার দাঁড়ানো যায়।
এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি জীবনের পরের অধ্যায়ে পা রাখবেন।
চলবে………………….