ঢাকা, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৯:০০:১১ PM

শোকের মহাকাব্য- পর্ব–৭

মান্নান মারুফ
03-01-2026 01:01:56 PM
শোকের মহাকাব্য- পর্ব–৭

 (একটি দেশের ক্ষত, একটি নারীর নীরব দৃঢ়তা)

১৯৭৫এই সংখ্যাটার ভেতরে শুধু একটি বছর নেই,
আছে একটি জাতির দীর্ঘশ্বাস।

সেই বছরের আগস্টের এক ভোরে বাংলাদেশের আকাশ হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছিল। ঢাকার রাস্তাগুলো তখনো ঘুমে ডুবে, মানুষ জানত নাইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়টি ঠিক তখনই লেখা হচ্ছে। রেডিওর কণ্ঠে ভেঙে পড়া খবর, স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শহর, আর মানুষের চোখে জমে ওঠা অবিশ্বাসসব মিলিয়ে দেশ যেন হঠাৎ থেমে গিয়েছিল।

তিনি তখন দেশের বাইরে। স্বামীর দায়িত্বের সূত্রে ভিন্ন এক ভূমিতে, ভিন্ন এক সময়সূচিতে জীবন চলছিল। দূরের সেই শহরে সকালটা শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু দুপুর গড়াতেই খবরের ভাষা বদলে গেল। প্রথমে অস্পষ্ট, তারপর ধীরে ধীরে পরিষ্কারদেশে বড় কিছু ঘটে গেছে।

খবরটা যখন পুরোপুরি কানে এল, তিনি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেননি।

একটি জাতির মহান নেতা, তার পরিবারসবকিছু মুহূর্তে নিভে গেছেএই সত্যটি মানতে তার সময় লেগেছিল। তিনি জানতেন, রাজনীতি কঠিন। কিন্তু এমন নিষ্ঠুরতাএত কাছ থেকে দেখার কথা তিনি ভাবেননি।

তিনি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাইরে মানুষ হাঁটছে, গাড়ি চলছেকিন্তু তার ভেতরে যেন সব থেমে গেছে। দেশের মাটি থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে তিনি অনুভব করছিলেনবাংলাদেশ কাঁদছে।

এই শোক শুধু রাষ্ট্রের ছিল না। এই শোক প্রতিটি ঘরের, প্রতিটি মানুষের।

কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল। ক্ষমতার পালাবদল, অনিশ্চয়তা, গুজবসব মিলিয়ে দেশ যেন দিশাহারা। তিনি খবর শুনতেন, পড়তেন, কিন্তু কিছুই পরিষ্কার ছিল না।

এই সময়টাতে তার জীবনে সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিলনীরব থাকা।

কারণ তিনি জানতেন, স্বামীর অবস্থান তখন অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে জিয়াউর রহমানের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রীয় সমীকরণের সঙ্গে জড়িত। ভুল কথা, ভুল মন্তব্যসবকিছু বিপদ ডেকে আনতে পারে।

তিনি তাই চুপ ছিলেন।

চুপ থাকা মানে কিন্তু অজ্ঞ থাকা নয়।
চুপ থাকা মানে সব সহ্য করা নয়।

তিনি ভেতরে ভেতরে দৃঢ় হচ্ছিলেন।

নভেম্বর এলো। নভেম্বর, নভেম্বরএই তারিখগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন করে রক্ত আর অনিশ্চয়তার ছাপ ফেলল। একের পর এক ঘটনা ঘটছে, আর তিনি দূর থেকে সব দেখছেনশুনছেনকিন্তু কিছু করতে পারছেন না।

নভেম্বরের পরে দৃশ্যপট আবার বদলাতে শুরু করল। জিয়াউর রহমান সামনে এলেন। দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বসবকিছু তার কাঁধে এসে পড়ল ধীরে ধীরে।

এই সময়টাতে তিনি বুঝতে পারলেনতাদের জীবন আর আগের মতো নেই।

একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী থেকে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছেনএকটি রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের নীরব সহযাত্রী।

স্বামীর চোখে তখন ঘুম কম। কথায় ছিল কম্পন নয়, বরং দৃঢ়তা। তিনি বুঝতেনএই মানুষটি সামনে কঠিন পথ বেছে নিয়েছে। আর সেই পথে হাঁটতে গেলে পাশে কাউকে দরকার, যে প্রশ্ন কম করবে, দায়িত্ব বেশি নেবে।

তিনি সেই মানুষটিই হলেন।

দেশে ফিরে এলে তিনি প্রথম দেখলেনবাংলাদেশ বদলে গেছে। মানুষের চোখে ভয়, সন্দেহ, আবার কোথাও কোথাও আশা। রাস্তায় সেনা টহল, অফিসে চাপা গুঞ্জনসবকিছুই নতুন বাস্তবতার জানান দিচ্ছিল।

তিনি রাজনীতির মঞ্চে ওঠেননি। কোনো বক্তব্য দেননি। কোনো সিদ্ধান্তে প্রকাশ্যে ছিলেন না। কিন্তু ঘরের ভেতরে, নীরবে তিনি ছিলেন একটি স্থির উপস্থিতি।

১৯৭৫ তার জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করে দিল
এর আগে: শান্ত, নিয়মতান্ত্রিক, ছায়ার মতো জীবন।
এর পরে: অনিশ্চয়তা, দায়িত্ব, আর ইতিহাসের ভার।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল তার মানসিক জগতে। তিনি বুঝেছিলেনক্ষমতা আসলে ক্ষণস্থায়ী। আজ যে শীর্ষে, কাল সে শূন্যে। এই উপলব্ধিই তাকে অহংকার থেকে দূরে রেখেছিল।

রাতে তিনি অনেক সময় ঘুমাতে পারতেন না। খবরের কাগজের পাতায় চোখ রাখতেন। নাম, তারিখ, ঘটনার ভিড়সবকিছু পড়তেন। কিন্তু কোনো মন্তব্য করতেন না। কারণ তিনি জানতেনসময়ই সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

এই সময়টাতে তিনি মানুষের চোখ পড়তে শিখেছিলেন। কে ভয় পাচ্ছে, কে সুযোগ খুঁজছে, কে সত্যিই দেশকে ভালোবাসেএসব তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছিলেন।

১৯৭৫ তাকে রাজনীতিবিদ বানায়নি।
১৯৭৫ তাকে বানিয়েছেসহনশীল।

এই সহনশীলতাই পরবর্তী সময়ে তাকে বড় দায়িত্ব নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করবে।

একটি দেশের ট্র্যাজেডি কীভাবে একটি মানুষের জীবন বদলে দেয়এই পর্ব তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

তিনি তখনো জানতেন নাএকদিন তার নিজের জীবনেও ভয়াবহ ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করছে। কিন্তু ১৯৭৫ তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলভেঙে পড়লে চলবে না।

কারণ ইতিহাস থামে না।
মানুষকেই এগিয়ে যেতে হয়।

তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন এক নতুন মোড়ে।
পেছনে শান্ত জীবন,
সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

আর ঠিক এই অনিশ্চয়তার মাঝখানেই
তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছিল এক অদৃশ্য শক্তি
যার নাম তখনো কেউ জানত না।

চলবে…………