বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা নির্বাচনী হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাদের অর্জিত সম্পদের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট বৈপরীত্য। পাঁচটি প্রধান রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০ জন নেতার মধ্যে সাতজনই মাসিক আয় হিসেবে এক লাখ টাকার কম দেখিয়েছেন।এই ১০ জনের মধ্যে সর্বনিম্ন বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং সর্বোচ্চ আয় দেখিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তবে আয়ের পার্থক্য থাকলেও সম্পদের মূল্য বিবেচনায় প্রায় সবাই উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত—এ তথ্য উঠে এসেছে তাদের নিজস্ব ঘোষণাতেই।
আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক এসব হলফনামা অনুযায়ী, ১০ জনের মধ্যে আটজনেরই রয়েছে উচ্চমূল্যের গাড়ি ও ঢাকায় অথবা জেলা শহরে আবাসিক সম্পত্তি। পাঁচজন নিজেদের পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। অন্যরা আইনজীবী, চিকিৎসক, পরামর্শক ও পূর্ণকালীন রাজনীতিবিদ। দুজন ছাড়া সবাই অন্তত স্নাতক ডিগ্রিধারী।
শীর্ষে থেকেও কম আয়ের ঘোষণা
ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা—যা এই তালিকায় সর্বনিম্ন। অথচ তার ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ দেড় কোটি টাকা, যার মধ্যে রয়েছে কৃষিজমি, একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি এবং ৬ কোটি টাকারও বেশি নগদ অর্থ। এমবিবিএস ডিগ্রিধারী এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে করা ৩৪টি মামলার মধ্যে দুটি ছাড়া বাকি সবগুলোতে তিনি খালাস পেয়েছেন।
রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪ লাখ টাকা। তবে স্ত্রীসহ যৌথভাবে তার সম্পদের মূল্য প্রায় ৩৯ কোটি টাকা। তিনি ৬ কোটি টাকা নগদ অর্থ দেখিয়েছেন এবং তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ৮ কোটি টাকা মূল্যের একটি গাড়ি। ঢাকা ও লালমনিরহাটে তাদের আবাসিক সম্পত্তির মূল্য ২০ কোটির বেশি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হয়ে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এই আয় মূলত শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত থেকে আসে। তিনি নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, শেয়ারে বিনিয়োগ ৬৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং জমির মূল্য দেখিয়েছেন অধিগ্রহণমূল্য অনুযায়ী। তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের নামেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য নগদ অর্থ ও স্থায়ী আমানত। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৭৭টি মামলার মধ্যে ৫৪টিতে তিনি খালাস পেয়েছেন।
আয়ের তুলনায় সম্পদ অনেক বেশি
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের প্রার্থী বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, অথচ তার ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ৪০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। তার রয়েছে কৃষি ও অকৃষিজমি, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং পূর্বাচলে পাঁচ কাঠার প্লট। ব্যাংকে জমা অর্থ ৪ লাখ টাকার কম হলেও নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ১ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি। তার বিরুদ্ধে থাকা প্রায় ৫০টি মামলার বেশিরভাগই প্রত্যাহার, স্থগিত বা নিষ্পত্তি হয়েছে।
এই তালিকায় সর্বোচ্চ আয় ও সম্পদের মালিক জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৩৩ লাখ টাকা এবং সম্পদের পরিমাণ ৪৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। পেশায় আইনজীবী এই নেতা কৃষি, ব্যবসা, ভাড়া ও চাকরি থেকেও আয় করেন। তিনি ১৫ কোটি টাকা নগদ অর্থ দেখালেও তার ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৪৩ কোটির বেশি।
নতুন দল, উত্থানশীল মুখ
ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৬ লাখ টাকা এবং সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। তার ও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে উল্লেখযোগ্য নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার। গত অর্থবছরে তিনি আয়কর দিয়েছেন এক লাখ ১৩ হাজার টাকার বেশি।
রংপুর-৪ আসনের প্রার্থী এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন কোনো গাড়ি বা বাড়ির মালিক না হলেও নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। কৃষি, ব্যবসা ও চাকরি থেকে তার বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা। স্ত্রীসহ তাদের মোট অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যার মধ্যে রয়েছে স্বর্ণালংকার।
সময়ের সঙ্গে সম্পদের বড় উল্লম্ফন
বরিশাল-৫ আসনের প্রার্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেশি, যা ২০০৮ সালে ঘোষিত ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকার তুলনায় অনেক বেশি। তার আয়ের উৎস শিক্ষকতা, ভাড়া ও ধর্মীয় অনুদান। তিনি ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা নগদ অর্থ দেখিয়েছেন। তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ১৯০ ভরি স্বর্ণ, যার বড় অংশ উপহার হিসেবে প্রাপ্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী ব্যবসায়ী ইউনুস আহমেদ বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৯২ টাকা, অথচ তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তিনি নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি এবং গত অর্থবছরে আয়কর দিয়েছেন মাত্র ৫ হাজার টাকা।
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
এই হলফনামাগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের শীর্ষ ব্যক্তিদের আর্থিক অবস্থার একটি বিরল চিত্র তুলে ধরলেও, ঘোষিত কম আয় ও বিপুল নগদ সম্পদের বৈপরীত্য নতুন করে প্রশ্ন তুলছে সম্পদ অর্জনের প্রক্রিয়া, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হলফনামায় সম্পদের মূল্য বাজারদরের পরিবর্তে অধিগ্রহণমূল্য অনুযায়ী দেখানো হয়, যা এই বৈষম্যের একটি কারণ। তবুও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনআস্থা যখন নাজুক অবস্থায়, তখন এসব তথ্য রাজনৈতিক জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণা জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব হলফনামা কেবল আর্থিক নথি হিসেবেই নয়, বরং রাজনৈতিক জীবনে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার মানদণ্ড হিসেবেও জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে।