পর্ব ৭: এক কাপ চা আর ধোঁয়া ওঠা ওম
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছিল। ঘরের ভেতর আলোটা একটু অন্যরকম হয়ে এসেছে—নরম, গম্ভীর। চায়ের কথা আবার মনে পড়ল। মনে হলো, এই সময়টায় চা না হলে দিনটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
চুলায় কেটলিটা বসালাম। জল গরম হতে হতে ঘরের ভেতর একধরনের অপেক্ষা তৈরি হলো। সেই অপেক্ষাটা কোনো কিছুর জন্য নয়, নিজের জন্য। চায়ের পাতা, আদা—সব মেপে দিলাম ধীরে, তাড়াহুড়া না করে।
চা ফুটতে শুরু করতেই ধোঁয়া উঠল। সেই ধোঁয়ার মধ্যে আমি চোখ বন্ধ করলাম। নিঃশ্বাসটা গভীর হলো। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা দীর্ঘ “ওম”। জোরে নয়, স্পষ্ট নয়—শুধু নিজের শোনার মতো।
এই শব্দটা কোথা থেকে এলো জানি না। ধর্মের থেকে নয়, অভ্যাসের থেকেও নয়। এটা যেন শরীরের ভেতরে জমে থাকা ক্লান্তির একটা নিঃসরণ।
চায়ের কাপ হাতে জানালার ধারে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে মানুষ চলছে, গাড়ি চলছে। আর আমার ভেতরে ধীরে ধীরে একটা নিঝুম নামছে। এই নিঝুম মানে শূন্যতা নয়—বরং ভার কমে যাওয়া।
অনেকদিন পর বুঝলাম, আমাকে সবসময় উত্তর খুঁজতে হবে না। কিছু প্রশ্ন থাকুক, কিছু অমীমাংসা থাকুক। সবকিছুর ব্যাখ্যা না থাকলেও জীবন থেমে থাকে না।
১৭ ডিগ্রির বিকেলটা তখন একটু গাঢ়। চায়ের উষ্ণতা আর হাওয়ার ঠান্ডা একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ঠিক যেমন আমার ভেতরের শক্ত আর নরম দিকগুলো।
কাপটা খালি হয়ে এলো। তবু আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছু সময় শুধু থাকা দরকার হয়। কিছু না করে, কিছু না ভেবে।
ওমটা আবার মনে মনে বললাম।
এই শহরের মাঝখানে, এই ঘরের ভেতরে—আমি ঠিক আছি।
পর্ব ৮: প্রেমের তাপমাত্রা
সকালের নিঝুমতার মতো বিকেলও শান্ত ছিল। চায়ের কাপ খালি হয়ে গেছে, তবু হৃদয়ে একটা অজানা গরম লেগে আছে। হঠাৎ দরজার ঘড়ির কাঁটা যেন একটু দ্রুত চলা শুরু করল—ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ রিং করে জানালার দরজা খুলল।
“হ্যালো… আমি আসতে পারি?” একটি পরিচিত, কিন্তু অনেক দিন বাদে শোনার মতো কণ্ঠ।
আমি চমকে তাকালাম। মুখটা আংশিক অজানা, তবু ভেতরে এক পরিচিত সৌন্দর্য। সেই পুরনো অনুভূতি, যা বহুদিন ধরে কুয়াশার ভেতরে লুকিয়ে ছিল, আবার ঘাড়ের পেছন দিয়ে গাঢ় হয়ে উঠল।
“হ্যাঁ… আসো,” আমি বললাম, অপ্রত্যাশিত হাসি দিয়ে।
সে চলে এলো। চায়ের কাপ আর চুলোর গরমের মতো নয়, বরং এই মানুষের উপস্থিতি ভেতরে এক অদ্ভুত তাপ ফেলে দিল। হৃদয়টা হঠাৎ করে দ্রুত ধুকধুক করছিল—কিন্তু ভয় নয়। এটি একধরনের প্রশান্ত উত্তেজনা।
আমরা বসে রোদে, জানালার ধারে। আলো আমাদের মাঝে পড়ছে। কোনো বড় কথা বলা হচ্ছে না। শুধু চোখে চোখ। কোনো অতীতের ভুল, কোনো দীর্ঘ সময়ের ফাঁকা—সব যেন মিলেমিশে এক রূপ নিল।
“আজ কত সুন্দর দিন,” সে হালকা বলল।
আমি মৃদু হেসে বললাম, “১৭ ডিগ্রি।”
হঠাৎ অবচেতন মনে হলো, প্রকৃত প্রেম শুধু আগুন নয়। কখনো কখনো এটি নিঝুম, নরম, কিন্তু গভীর। ঠিক যেমন এই তাপমাত্রা—না বেশি গরম, না বেশি ঠান্ডা।
আমাদের কথা চলল নীরবতায়। মাঝে মাঝে হেসে উঠলাম। মাঝে মাঝে চুপ হয়ে জানালার বাইরে তাকালাম। পৃথিবী চলছিল, আর আমরা শুধু সেই সময়ের মাঝখানে।
১৭ ডিগ্রিতে আজ বুঝলাম—প্রেম মানে শুধু হাত ধরানো নয়। প্রেম মানে একে অপরের সঙ্গে থাকা, ভেতরের তাপ অনুভব করা, এবং নিজেকে হারানোর ভয় না করা।
ধীরে ধীরে রোদ কমতে শুরু করল। তবু হৃদয়ের ভেতরে সেই তাপ এখনও লেগে আছে।
আমরা বসে রইলাম।
কোনো শব্দ ছাড়া, কিন্তু পুরোপুরি সংযুক্ত।
পর্ব ৯: হলুদ পাতার চিঠি
পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম, রাস্তার ধারে এক হলুদ পাতার পত্রিকা পড়ে আছে। কেমন অদ্ভুত—শুধু পাতা, অথচ যেন কোনো অজানা গল্প বলছে। ধুলোয় চাপা পড়েও তার রঙ এখনও চোখে লাগে।
পদক্ষেপ থামালাম। আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখি। হঠাৎ মনে হলো, এই পাতার মধ্যেও কেউ আমার জন্য কিছু লিখেছে। কোনো শব্দ নেই, কিন্তু একটা বার্তা আছে। ছোট ছোট নরম প্রতীক, যেগুলো শুধু চোখে দেখা যায় না—মনে অনুভূত হয়।
একটু এগোতেই দেখি, দূরে সেই পুরনো বইয়ের দোকান। জানালা অর্ধ খোলা। দোকানের ভেতরে অজানা অম্লান গন্ধ। আমি ঢুকে গেলাম। বিক্রেতা নেই, তবু বুকের ভেতর একটা ঘ্রাণ এসে বসেছে। শেলফের পাশে লুকানো ছোট কাগজের টুকরো—লেখা নেই, শুধু ভাঁজ করা।
বাইরে ফিরে এসে পাতাটি ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, জীবন এমন—সবকিছু সরাসরি বোঝা যায় না। কিছু বার্তা আসে নিঃশব্দে, অপ্রত্যাশিতভাবে। ঠিক যেমন এই হলুদ পাতা।
স্মৃতি, ভালোবাসা, একা থাকা—সব মিলেমিশে পাতার রঙে ফুটে উঠল। আমি হাঁটতে থাকলাম, পাতাটি পকেটে রেখে। মনে হলো, এই পথচলায় কিছু অজানা সত্য প্রতিদিনই বেরিয়ে আসে, আর আমরা শুধু চোখ খুলে থাকতে পারি।
সূর্য একটু ঢলে এসেছে। হাওয়ায় পাতাগুলো নরমভাবে নড়ে। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোও ঠিক এমনই—সুন্দর, চুপচাপ, অপ্রত্যাশিত।
১৭ ডিগ্রিতে আজ বুঝলাম—সবকিছু লিখে রাখার দরকার নেই। জীবনের কিছু বার্তা নিঃশব্দে, ছোট ছোট হলুদ পাতার মতো আসে। শুধু শোনার দরকার।
আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকলাম।
শহর তখনো ব্যস্ত, কিন্তু আমার পকেটে সেই হলুদ পাতা আরেকটা নিঝুম গল্প হয়ে আছে।
পর্ব ১০: এই তাপমাত্রায় ঘর
সকাল থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যা—দিনটা একধরনের শান্ত নদীর মতো গড়িয়ে গেছে। বাইরের শহরটা যেমন ব্যস্ত, ভিড়, শব্দ, আলো—সবকিছু চলছে, কিন্তু আমার ভেতরের শহরটি এখন নিশ্চুপ।
চাদরটা কাঁধে জড়িয়ে জানালার ধারে বসে আছি। রোদটা আর হাওয়াটা ঠিক ১৭ ডিগ্রি—না বেশি গরম, না বেশি ঠান্ডা। ঠিক এমন তাপমাত্রা, যেখানে শরীর আর মন একসাথে শ্বাস নিতে পারে।
আজ আমি বুঝেছি, ঘর মানে কোনো স্থান নয়। ঘর মানে নিরাপদ এক অন্তর্গত অঞ্চল, যেখানে তুমি নিজেকে হারাতে বা খুঁজে পেতে পার। যেখানে স্মৃতি, প্রেম, নীরবতা, হাসি—সব একসাথে থাকে, কিন্তু তাড়াহুড়া নেই।
আজ আমি সেই ঘরটি তৈরি করেছি নিজের ভেতরে। ছোট ছোট অভ্যাস—চা, হালকা কুয়াশা, জানালার আলো, নিঝুম মুহূর্ত—সব মিলিয়ে ঘর গড়ে তুলেছে। আর সেই ঘরে আমি একা নই, কিন্তু সবাইকে ছেড়ে নিজের সঙ্গে শান্ত।
বাইরে শহরের শব্দ ঢুকে আসছে। হর্ন, মানুষ, গাড়ি—সব কিছু এখনও জীবন্ত। কিন্তু আমি আজ তাদের মধ্যে হারাইনি। আমি এখানে আছি। নিজের ঘরে, নিজের সঙ্গে।
চায়ের শেষ চুমুকটা শেষ করেছি। ধোঁয়া আর আলো ধীরে মিলছে। হৃদয়টা ভারী নয়, নয় দুরুদুরু। শান্ত। সঠিক ১৭ ডিগ্রিতে।
আমি জানি, এই ঘর আমি যেকোনো সময়ে ফিরতে পারব। যখনও মন দুরুদুরু করবে, যখনও শহরের ব্যস্ততা আমাকে ছেড়ে দেবে না—আমি শুধু জানালার ধারে বসে নিজের ভেতরের ঘরে ফিরব।
আজ বুঝেছি—ঘর মানে ঠিক এই: নিজেকে পাওয়া, নিজেকে থাকার জায়গা দেওয়া, আর সবকিছু ঠিক ১৭ ডিগ্রিতে মাপা।
আমি ধীরে চোখ বন্ধ করলাম।
শহরটা ব্যস্ত, রোদটা উষ্ণ, আর আমি—শেষমেষ, আমার ঘরে ঠিক আছি।