ঢাকা, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১১:০৮:৫০ PM

“১৭ ডিগ্রিতে আমি”

মান্নান মারুফ
02-01-2026 08:51:21 PM
“১৭ ডিগ্রিতে আমি”

পর্ব ১: ঘাসফড়িংয়ের ডাক
শরতের শেষটা ঠিক শেষ বলে মনে হয় না। আবার শীতও পুরোপুরি আসে না। এই মাঝামাঝি সময়টাই সবচেয়ে অদ্ভুত। সকালবেলা ঘুম ভাঙলে গায়ে হালকা শিরশির, কিন্তু রোদ উঠলেই মনে হয়—না, এখনো শীত আসেনি।তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি। মোবাইলের স্ক্রিনে সংখ্যাটা দেখেই কেন যেন বুকের ভেতর দুরুদুরু শুরু হয়ে গেল। কোনো কারণ নেই। কোনো খবর আসেনি। তবু মনটা ঠিক স্থির হতে চায় না। যেন বহুদিন পর কেউ নাম ধরে ডাকছে—খুব দূর থেকে।

বারান্দার দরজাটা খুলে দিতেই হালকা ঠান্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগল। পাশের ঝোপে একটা ঘাসফড়িং লাফিয়ে উঠল, আবার মিলিয়ে গেল। ছোট্ট প্রাণ, অথচ তার ডানার শব্দে মনে হলো কিছু একটা শুরু হলো।

চাদরটা কাঁধে জড়িয়ে রোদে দাঁড়ালাম। এই রোদে জ্বালা নেই, কেবল আদর। শহর তখনো পুরো জেগে ওঠেনি। নিচের রাস্তায় দু-একটা বাস, চায়ের দোকানে ধোঁয়া, আর কোথাও যেন অদৃশ্য একটা নীরবতা জমে আছে।

আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকালাম। পরিচিত মুখ, তবু কেমন অচেনা। কবে থেকে জানি না—এই শহরের তাড়ায়, সময়ের চাপে, আমি ধীরে ধীরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি। নামটা আছে, কাজটা আছে, ঠিকানাও আছে। তবু কোথাও যেন আমি নেই।

শরতের শেষ আর শীতের শুরু—এই সময়টা ঠিক আমার মতোই। কোথাও পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি।

হঠাৎ মনে হলো, আজ যদি অফিসে না যাই? আজ যদি শুধু হাঁটি? কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়া। ভাবনাটা মাথায় আসতেই হালকা ভয় লাগল, আবার ভালোও লাগল। বহুদিন পর নিজের ইচ্ছেটাকে স্পষ্ট শুনতে পেলাম।

১৭ ডিগ্রিতে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পারলাম—এই দুরুদুরুটা ভয় নয়। এটা ডাক। নিজের ভেতর থেকে আসা এক নরম, কিন্তু জেদি ডাক।

ঘাসফড়িংটা আবার ডাক দিল।
আমি চুপচাপ শুনে রইলাম।


পর্ব ২: দুরুদুরু মন


রাস্তায় বেরোতেই বুঝলাম, আজ শহরটাও একটু আলাদা। ভিড় আছে, শব্দ আছে, কিন্তু সবকিছু যেন হালকা। যেন কেউ ভলিউম কমিয়ে দিয়েছে। আমি ধীরে হাঁটছিলাম, এমন ধীরে যে নিজের পায়ের শব্দও শুনতে পাচ্ছিলাম।

১৭ ডিগ্রির হাওয়াটা গালে লাগল আবার। বুকের ভেতরের দুরুদুরুটা তখনো থামেনি। এটা আর অস্থিরতা মনে হচ্ছিল না, বরং কৌতূহল। অনেকদিন পর নিজের মনটা কী চাইছে, সেটা জানতে ইচ্ছে করছিল।

একটা মোড়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ডান দিকে অফিসের পথ, বাম দিকে পুরনো পাড়ার রাস্তা। অফিসের রাস্তাটা চেনা—নিরাপদ, নির্দিষ্ট, নিস্তেজ। আর বাম দিকটা… অনেকদিন যাই না। সেখানে একটা পুরনো বইয়ের দোকান আছে, একটা ভাঙা চায়ের দোকান, আর কিছু স্মৃতি—যেগুলো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলি।

কেন জানি না, পা নিজে থেকেই বাম দিকে ঘুরে গেল।

হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ল, এক সময় আমার মনটা এত চুপচাপ ছিল না। তখন অল্পতেই উত্তেজনা হতো, গান শুনে চোখ ভিজত, হঠাৎ করে কাউকে ভালো লাগত। এখন এসব হলে আমি নিজেই অবাক হই—এগুলো এখনো আমার ভেতরে আছে নাকি?

একটা লাল সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ফোনটা বের করলাম। কোনো নতুন নোটিফিকেশন নেই। তবু আঙুলটা থেমে রইল একটা পুরনো নামের ওপর। অনেকদিন কথা হয় না। না রাগ, না অভিযোগ—শুধু সময়ের দূরত্ব।

মেসেজটা লিখেও পাঠালাম না। আবার ডিলিট করলাম। দুরুদুরু মনটা তখন একটু ভারী হয়ে উঠল। কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না, শুধু শব্দ হারিয়ে ফেলে।

চায়ের দোকানে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে হালকা ধোঁয়া, কাঁচের গ্লাসে চা। প্রথম চুমুকেই মনে হলো—এই তো, এইটুকুই তো দরকার ছিল। কোনো বড় সিদ্ধান্ত না, কোনো নাটক না—শুধু এই মুহূর্তটা।

চায়ের কাপ হাতে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। মানুষ যাচ্ছে, জীবন চলছে। আর আমি? আমি আজ নিজের পাশে দাঁড়িয়েছি।

১৭ ডিগ্রিতে বুঝলাম—মন যখন দুরুদুরু করে, তখন সেটাকে চুপ করাতে নেই। একটু শুনতে হয়। কারণ এই দুরুদুরুই হয়তো আমাকে আবার আমার কাছেই ফিরিয়ে দেবে।

আমি ধীরে হাসলাম।
আজ আর অফিসে যাওয়া হলো না।


 

পর্ব ৩: রোদের আদর

চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে আসতেই রোদটা ঠিক মুখের ওপর এসে পড়ল। এমন রোদ, যা চোখ বন্ধ করতে বাধ্য করে না—বরং চোখ বন্ধ করলে ভালো লাগে। আমি হাঁটা থামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করে নিজেকে ছুটি দেওয়া খুব অদ্ভুত এক বিলাস।

একটা পার্কের ভেতর ঢুকে পড়লাম। গাছগুলো এখনো পুরো খালি হয়নি। পাতার রঙে হলুদ আর সবুজের মিশেল। বেঞ্চে বসে চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম। সোয়েটার পরার দরকার হয়নি এখনো। ১৭ ডিগ্রি—না বেশি, না কম। ঠিক মাঝামাঝি।

রোদের আদরটা যেন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছিল। বহুদিন পর নিজের শরীরটা অনুভব করলাম—শ্বাস নেওয়া, বসে থাকা, কিছু না করা। এই ‘কিছু না করা’-টুকু কতদিন যে ভুলে গিয়েছিলাম।

মনে পড়ল, একসময় সকালগুলো এমনই হতো। কোনো তাড়া নেই, কোনো হিসেব নেই। তখন মনে হতো সময়টা আমার। এখন সময় আমাকে নিয়ে চলে।

পার্কের এক কোণে এক বৃদ্ধ চুপচাপ পত্রিকা পড়ছিলেন। দূরে কয়েকটা বাচ্চা দৌড়াচ্ছে। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না, তবু সবাই যেন এক অদৃশ্য সুতায় বাঁধা। আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম—এই মুহূর্তে আমার কিছুই চাইবার নেই।

মোবাইলটা পকেটেই রইল। কোনো ছবি তুললাম না। কিছু মুহূর্ত ছবি না হয়ে স্মৃতি হয়ে থাকাই ভালো।

রোদ একটু ঢলে পড়তেই হালকা ঠান্ডা আবার টের পেলাম। চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিলাম। নিজের যত্নটা নিজেই নিতে পারছি—এই বোধটাই আজ সবচেয়ে নতুন লাগছিল।

১৭ ডিগ্রিতে বসে বসে মনে হলো, হয়তো সুখ মানে খুব বড় কিছু নয়। হয়তো সুখ মানে—রোদের নিচে বসে থাকা, নিজের সঙ্গে একটু সময় কাটানো, আর কোথাও যাওয়ার তাড়া না থাকা।

আমি চোখ বন্ধ করলাম।
রোদটা তখনো আদর করছিল।   

চলবে.....................