ঢাকা, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ১১:০৮:১২ PM

“১৭ ডিগ্রিতে আমি”

মান্নান মারুফ
02-01-2026 08:53:42 PM
“১৭ ডিগ্রিতে আমি”

পর্ব ৪: ব্যস্ত শহরে হারানো আমি

পার্ক থেকে বেরোতেই শহরটা আবার নিজের আসল চেহারা দেখাল। হর্নের শব্দ, বাসের ধাক্কাধাক্কি, মানুষের তাড়া—সবকিছু একসঙ্গে ফিরে এল। যেন কেউ হঠাৎ করে রেডিওর ভলিউম বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমি ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম। চারপাশে এত মানুষ, অথচ কারও চোখে চোখ পড়ছে না। সবাই কারও না কারও কাছে পৌঁছাতে ব্যস্ত। আর আমি? আমি যেন মাঝখানে ঝুলে আছি—কোথাও পৌঁছানোর তাড়া নেই, আবার পুরো থেমেও নেই।

একটা বড় কাচের বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভেতরে মানুষ কাজ করছে—কম্পিউটারের স্ক্রিন, ফাইলের স্তূপ, কফির কাপ। এই ছবিটা আমার খুব চেনা। এত চেনা যে একসময় আমি এটাকেই জীবন ভেবে নিয়েছিলাম।

হঠাৎ মনে পড়ল, কবে থেকে আমি নিজের কথা বলা কমিয়ে দিয়েছি। “ভালো আছি”—এই বাক্যটাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি। কেউ আর জিজ্ঞেসও করে না, ভালো মানে ঠিক কী।

একটা বাস স্টপেজে বসে পড়লাম। পাশে বসা একজন ফোনে বলছে, “সময় নেই।” কথাটা শুনে বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। সময় কি সত্যিই নেই, নাকি আমরা কাউকে দিতে চাই না?

১৭ ডিগ্রির হাওয়া আবার গায়ে লাগল। শহরের মাঝখানেও এই হাওয়াটা ঠিক নিজের মতোই রয়ে গেছে—ব্যস্ত নয়, তাড়াহুড়া নেই। আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম, শহরে হারিয়ে যাইনি আমি। আমি নিজেকে সময় দিইনি বলেই নিজেকে খুঁজে পাইনি।

বাস এল, গেল। আমি উঠলাম না। আজ আর কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। আজ শুধু বুঝতে চাই—আমি কে, যখন কেউ কিছু চায় না আমার কাছ থেকে।

চারপাশের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হলো, হারিয়ে যাওয়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো হারিয়ে যাওয়াই দরকার—নিজের দিকে ফিরে আসার জন্য।

আমি হাঁটতে থাকলাম।
শহর তখনো ব্যস্ত।
আমি ধীরে ধীরে কম ব্যস্ত হচ্ছিলাম।


 

পর্ব ৫: হালকা কুয়াশা মেশা মিষ্টি সকাল

রাতটা কবে পেরিয়ে গেল টের পাইনি। জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো ঢুকতেই ঘুম ভাঙল। ঘরের ভেতরটা এখনো আধো-অন্ধকার, কিন্তু বাতাসে একটা আলাদা গন্ধ—হালকা কুয়াশার গন্ধ।

জানালাটা খুলে দিলাম। বাইরের পৃথিবীটা ধোঁয়ার মতো নরম। দূরের বাড়িগুলো ঝাপসা, গাছের ডালগুলো যেন আঁকা। এই সময়টাতে শহরটাও সত্যি কথা বলে—কোনো মুখোশ নেই, কোনো ভান নেই।

একটা চাদর কাঁধে জড়িয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, এই সকালটা খুব যত্ন করে তৈরি করা। যেন কেউ জানে—আজ আমার এমন এক সকাল দরকার।

চুলোর ওপর চায়ের জল বসালাম। ফুটতে শুরু করতেই ঘরের ভেতর পরিচিত শব্দ। চায়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ধীরে ধীরে। এই গন্ধটা সবসময় আমাকে শান্ত করে দেয়। কাপে চা ঢেলে জানালার ধারে এসে বসলাম।

কাঁচের ওপর কুয়াশার ছোপ। আঙুল দিয়ে একটা দাগ টানলাম। সেই দাগের মধ্যে দিয়ে বাইরে তাকিয়ে মনে হলো—সময়টাও ঠিক এমনই। পরিষ্কার নয়, তবু সুন্দর।

মনে পড়ল, একসময় কেউ এই জানালার পাশে আমার সঙ্গে চা খেত। খুব বেশি কথা হতো না। দরকারও ছিল না। কিছু মানুষ থাকে, যাদের পাশে নীরবতাও ভারী লাগে না।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কষ্টের নয়, স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস।

১৭ ডিগ্রির সকালটা তখন পুরোপুরি জেগে উঠেছে। না অত ঠান্ডা, না গরম। ঠিক যেমন অনুভূতিগুলো—না সুখ, না দুঃখ। মাঝখানে কোথাও।

চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখলাম। আজকের দিনটা আলাদা হবে—এমন কোনো নাটকীয় কারণে নয়, শুধু এই কারণে যে আমি আজ মন দিয়ে সকালটাকে দেখেছি।

কুয়াশা ধীরে ধীরে কাটছে।
আর আমার ভেতরের ঝাপসাটাও, অল্প অল্প করে, সরে যাচ্ছে।


 

পর্ব ৬: জানলার কাঁচটাতে স্মৃতির মহাকাল

জানালার কাঁচটা পরিষ্কার করার কথা ছিল। অনেকদিন ধুলো জমে আছে। তবু আজ হাত বাড়িয়েও থামিয়ে নিলাম। এই কাঁচটার ভেতরেই যেন সময় আটকে আছে। মুছে ফেললে হয়তো কিছু স্মৃতিও মুছে যাবে।

কাঁচে জমে থাকা কুয়াশার ফোঁটাগুলো রোদে চিকচিক করছে। প্রতিটা ফোঁটা যেন আলাদা একটা মুহূর্ত ধরে রেখেছে। ছোটবেলা, দুপুরবেলা ঘুম না আসা, ছাদে উঠে আকাশ দেখা—সব একসঙ্গে ভিড় করছে।

মনে পড়ল, এই জানালার পাশে বসেই প্রথম কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলাম। ছন্দ মিলত না, শব্দগুলোও ঠিক বসত না। তবু মনে হয়েছিল—আমি কিছু বলতে পারছি। সেই অনুভূতিটা কোথায় হারিয়ে গেল?

সময় কেবল এগোয় না, জমেও থাকে। এই ঘরে, এই কাঁচে, এই নীরবতায়। আমি বুঝতে পারলাম, স্মৃতি মানে শুধু অতীত নয়—স্মৃতি মানে আমি কে ছিলাম, তার প্রমাণ।

একসময় এই ঘরে হাসি ছিল বেশি। শব্দ ছিল বেশি। এখন নীরবতা বেশি। তবু এই নীরবতার মধ্যেও ভয় নেই আজ। কারণ আমি পালাচ্ছি না। আমি তাকিয়ে দেখছি।

কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম। একটু ক্লান্ত, একটু বদলে যাওয়া। তবু চোখের ভেতরে কোথাও সেই পুরনো আমি এখনো আছে। যে সহজে উত্তেজিত হতো, যে প্রশ্ন করত, যে ভালোবাসতে ভয় পেত না।

১৭ ডিগ্রির আলোটা ঘরে ঢুকে পড়েছে। জানালার কাঁচ দিয়ে ছেঁকে আসা এই আলোটা খুব নরম। মনে হলো, সময় আমাকে দোষ দিচ্ছে না। বরং বলছে—তুমি যেমন হয়েছ, ঠিক তেমনই হয়ে উঠেছ।

আমি ধীরে কাঁচে হাত রাখলাম। ঠান্ডা স্পর্শ। বাস্তব।

আজ বুঝলাম—সব স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলাই বোঝা নয়। কিছু স্মৃতি পথ দেখায়।

আমি জানালাটা বন্ধ করলাম না।
সময়ের সঙ্গে আজ আর আড়াল করলাম না নিজেকে।