(ব্যক্তিগত শোক থেকে রাজনৈতিক দায়িত্বের অদম্য যাত্রা)
তার জীবন হঠাৎ করেই এক ধাক্কায় বদলে গেল।
একদিন যিনি কেবল একজন স্ত্রীর ভূমিকা পালন করতেন—ঘরের দায়িত্ব, সংসারের ছোট ছোট কাজ, স্বামীর পাশে নীরব সহযাত্রী—পরদিনই তার সামনে এল এক বিশাল শূন্যতা, এক অজানা দায়িত্ব।
৩০ মে, ১৯৮১।
সেদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চিরবিদায় নিলেন। তার জীবন, তার পরিবার, তার দেশ—সবকিছু এক মুহূর্তে অচেনা হয়ে গেল।
সে সকালটি কেমন ছিল, কেউ ভুলতে পারবে না। ঢাকা শহরের বাতাস ভারী, আর মানুষের মনে শোকের ছাপ। সংবাদসংস্থার কণ্ঠে বারবার একই নাম—জিয়াউর রহমান। প্রতিটি শব্দে ছিল অশ্রুবিন্দুর আভাস। আর তার ভেতরে? একটি অজানা শূন্যতার অনুভূতি, যা ভেঙে ফেলতে চাচ্ছিল প্রতিটি চেতনা।
তিনি প্রথমে কিছুই করতে পারেননি। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলেন, নিজের ভেতরের শূন্যতাকে অনুভব করছিলেন। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানদের নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে সময়ই তাকে বলল, এবার শুধু নিজেকে ভাঙতে দেওয়া যাবে না।
এই ভাঙ্গতে না দেয়াই তার জীবনের শক্তিতে পরিণত হলো।
রাতের অন্ধকারে বসে তিনি ভেতর থেকে নিজের মনকে প্রস্তুত করতে লাগলেন। তিনি বুঝলেন—একজন রাষ্ট্রনায়কের স্ত্রী হয়ে থাকা আর একজন রাজনৈতিক নেত্রী হওয়ার মধ্যে পার্থক্য বিশাল। রাষ্ট্রনায়কের স্ত্রী থাকলে সমালোচনা কম। মানুষ বোঝে—আপনি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ। কিন্তু নেত্রী হলে প্রত্যেক পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত চোখে পড়ে, প্রত্যেক কথা গণমাধ্যমে পৌঁছে।
এই উপলব্ধিই তাকে ভেতর থেকে দৃঢ় করেছিল।
পরবর্তী কয়েক মাসে তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির মাঠে পদচারণা শুরু করলেন। প্রথমে ছিলেন নীরব, কার্যত লক্ষ্যহীন। তবে মানুষ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং স্বামীর রাজনৈতিক কাজের সূত্রে তিনি দেখলেন—দেশের মানুষের প্রয়োজন একজন দৃঢ়, অবিচল নেতা।
তিনি বুঝলেন, শুধু পরিবার নয়, পুরো জাতির জন্য দায়িত্ব নিতে হবে।
১৯৮২ সালের জানুয়ারির প্রথম দিকে, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন। প্রথম দিনগুলো তার সহজ ছিল না। দলের অভ্যন্তরে অনেকের কাছে তিনি শুধুই জিয়াউর রহমানের স্ত্রী—কেউ তাকে নেত্রী হিসাবে দেখেনি।
কিন্তু তিনি পিছপা হননি।
প্রথম দিনের শুরুতে, তিনি দলীয় কার্যালয়ে ঢুকলেন। অফিসের দেয়াল, ফাইলের স্তূপ, কর্মীদের ব্যস্ত মুখ—সবকিছুই তাকে অজানা এক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করালো। কেউ তার দিকে তাকাচ্ছিল, কেউ নীরবে বিচার করছিল।
তিনি ধীরে ধীরে শিখলেন—রাজনীতি হলো শুধু বক্তৃতা দেওয়া নয়। রাজনীতি হলো মানুষকে বোঝা, তাদের দুশ্চিন্তা শোনা, এবং তাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া।
প্রথম কয়েক মাস, তিনি নীরব পর্যবেক্ষক ছিলেন। দলের মিটিংয়ে কম কথা বলতেন, তবে চোখে চোখ রেখে সব কিছু বোঝার চেষ্টা করতেন। জিজ্ঞাসা করতেন না, কিন্তু মনের ভেতর বিশ্লেষণ করতেন।
এই সময়ই তার ভেতরের নেতৃত্ব বিকশিত হতে শুরু করল। মানুষকে বোঝার ক্ষমতা, দৃঢ়তার পরিচয়—সবই তখন থেকে জন্ম নিল।
পিছনের পটভূমি সহজ ছিল না।
সেনা পরিবারের একজন স্ত্রী হিসাবে তার জীবন শৃঙ্খলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেই শৃঙ্খলা নতুনভাবে কাজে লাগল—আনুষ্ঠানিক নিয়ম, সময়পালন, দায়িত্ব পালন। এই গুণগুলো তাকে দলের মধ্যে দ্রুত গ্রহণযোগ্য করে তুলল।
তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—অবিচল স্থিরতা। চাপে পড়লেও, সংকট আসলেও, তিনি শান্ত থাকতেন। অন্যরা যখন উদ্বিগ্ন, তখনও তার চোখে দৃঢ়তা থাকত। এই দৃঢ়তা মানুষকে আকর্ষণ করত।
ধীরে ধীরে, তিনি বিএনপির নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ সভায় ডাক পেতে লাগলেন। দলের ভিতরে নতুন প্রজন্মের নেতা তাকে শোনার জন্য আসতে লাগল। তিনি প্রথমে নির্দেশ দেননি, শুধু পথ দেখালেন।
তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়, তিনি শিখলেন—একজন নেতা শুধু বক্তৃতা দিয়ে জনগণকে প্রভাবিত করতে পারে না। তাকে নিজের আচরণ, নিষ্ঠা, এবং দৃঢ়তার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়।
তার স্বাভাবিক স্বভাব, সংযম, এবং দৃঢ়চেতা মনোভাব—সব মিলিয়ে তাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করল।
এই সময়ে দেশের পরিস্থিতিও সহায়ক ছিল। স্বৈরশাসনের ছায়া, সাধারণ মানুষের আশা, রাজনৈতিক দলে অভ্যন্তরীণ চাপে—সব মিলিয়ে একটি ভাঙা অবস্থান। ঠিক এই অবস্থানেই একজন দৃঢ়, নীরব শক্তি মানুষের চোখে ধরা দেয়।
তিনি বুঝলেন—এখন সময় এসেছে নিজেকে নেতা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার।
বছরের শেষে, তিনি ধীরে ধীরে দলের মধ্যে পরিচিত হয়ে উঠলেন। স্বামীর নামের পরিচয় সহ্য না করে, নিজের শক্তি এবং দৃঢ়তা দেখাতে শুরু করলেন।
এই সময়টিই তাকে রাষ্ট্রনায়কের স্ত্রীর স্থান থেকে প্রথম নারী নেত্রী হওয়ার পথে নিয়ে গেল।
একটি সাধারণ, সংযত, ঘরের মেয়ে—ধীরে ধীরে একজন স্থির, দৃঢ়, এবং আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে রূপ নিলেন।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—তার শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়েছে।
যখন পুরো জাতি শোকাহত, ব্যথিত এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে, তখনও একজন নারী নিজেকে প্রস্তুত করতে পারল—পরবর্তী দিনের জন্য।
এই অধ্যায়ে তিনি নীরবভাবে—কিন্তু দৃঢ়ভাবে—প্রমাণ করলেন যে, শুধুই স্বামীর পরিচয়ে নয়, নিজের প্রতিভা, সংযম, এবং দৃঢ়চেতা মনোভাবের দ্বারা একজন নারী নেতৃত্বের পথ তৈরি করতে পারে।
চলবে…………..