(নীরব প্রস্তুতি থেকে দলের শীর্ষে পৌঁছানো)
রাজনীতিতে পা রাখা মাত্রই বোঝা যায়—এটি কোনো সাধারণ পথ নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে চোখ থাকে, প্রতিটি কথায় মূল্যায়ন হয়। আর তিনি, যে নারী নীরবে প্রথম পদচারণা করেছিলেন, সেই নারী ধীরে ধীরে দলের শীর্ষে ওঠার পথে চলে এলেন।
১৯৮৩ সালে, বিএনপি-এর ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হলো। প্রথমবারের মতো কোনো পদক্ষেপ এত বড়—এমনকি নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছিল না। কল্পনাও করতে পারছিলেন না, যে ঘরের নীরব কোণে বসে যিনি শুধুই শোনতেন, আজ তিনি দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দায়িত্বে দাঁড়িয়ে আছেন।
প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা সহজ ছিল না। অফিসের কক্ষে নতুন দায়িত্বের বোঝা। কর্মীরা তাকিয়ে আছে—কেউ স্বাগত জানাচ্ছে, কেউ সন্দেহে। তিনি শান্ত, সংযত এবং স্থির। মনে মনে ভাবছিলেন—দলের বিশ্বাস অর্জন করতেই হবে, ভোটের আগে নয়, কাজের মাধ্যমে।
ভাইস-চেয়ারম্যান পদ পাওয়া মানে শুধু শিরোনাম নয়। মানে হলো—দলের নীতি, সিদ্ধান্ত, কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। মানে হলো নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।
প্রথম কয়েক মাস তিনি কাজ করলেন নীরবে। বড় সভায় খুব কম বক্তব্য। কিন্তু পেছনের কাজ, বিশ্লেষণ, মানুষের সমস্যা বোঝার ক্ষমতা—সবই প্রকাশ পেল। দলের অভ্যন্তরে নতুন প্রজন্মের নেতা তাকে দেখল। তারা বুঝল—এই নারী শুধু নামের জন্য নয়, সত্যিই নেতৃত্ব নিতে সক্ষম।
একটি দিনের কথা মনে আছে। দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি সভা চলছে। বিতর্ক, মতবিরোধ, উত্তেজনা—সব মিলিয়ে কক্ষে উত্তেজনার ছাপ। সাধারণ মানুষ হতো বা নেতারা, সবাই কণ্ঠ তুলছে। তিনি বসে চুপচাপ শুনলেন। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে মনোযোগ দিয়ে সবকিছু বিশ্লেষণ করলেন।
এরপর তিনি এক সুসংগত বক্তব্য রাখলেন। না, শব্দের খেলা নয়। কেবল সংক্ষেপে, স্থিরভাবে, যা সত্যি দরকার তা বললেন। শুনে সকলে স্তম্ভিত। তাদের মনে হলো—এ নারী কেবল স্বামীর পরিচয় নয়, নিজের শক্তি এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতায় নেতা হতে পারে।
এইই ছিল তার বিশেষতা—নীরব অধ্যবসায় এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
প্রথম ভাইস-চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকাকালীন, তিনি দলের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে গভীরভাবে শিখলেন। কমিটি সভায় নতুন পরিকল্পনা, জনগণকে সাহায্যের পদ্ধতি—সবই তার হাতে আসছিল। কিন্তু তিনি কেবল দেখছিলেন না, ভাবছিলেন—কীভাবে এই সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে বাস্তবায়িত হবে।
এ সময় তিনি দলের কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করলেন। গ্রামের প্রতিনিধি, শহরের কর্মকর্তা—সবার সঙ্গে বসে আলোচনা। শুধু শুনতে নয়, সমাধান খুঁজতে। মানুষ অনুভব করল—নেত্রী তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, শুধু কথা নয়, কাজের মাধ্যমে।
এই সময় তার নেতৃত্বের আরেকটি দিক জন্ম নিল—দৃঢ়তা এবং আপসহীন মনোভাব।
চ্যালেঞ্জ আসলেই তিনি পিছপা হননি। দলের ভিতরে কোনো বিতর্ক বা চাপ থাকলেও স্থির ছিলেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কোনো হঠকারিতা নেই, কোনো আবেগপ্রবণতা নেই। সবকিছু বিশ্লেষণ করে, স্থিরভাবে পদক্ষেপ নিতেন।
পরবর্তী বছরগুলোয়, তার দ্রুত উত্থান আরও স্পষ্ট হলো। ১৯৮৪ সালে, বিএনপি-এর চেয়ারপারসন নির্বাচিত হলেন তিনি। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে, নীরব পর্যবেক্ষক থেকে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ওঠা—এই উত্থান ছিল অভূতপূর্ব।
চেয়ারপারসন পদে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। দলের প্রতি দায়িত্ব, সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্ব, দেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তার কাঁধে ভারী বোঝা। কিন্তু তিনি ভীত হননি। তার ভেতরের দৃঢ়তা, সংযম এবং স্থিরতা তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
চেয়ারপারসন হওয়ার পরই তার নেতৃত্বের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো আরও প্রকাশ পেল—দৃঢ়তা, নৈতিকতা, জনসংযোগ, এবং আপসহীন নীতি। দলের নেতা হিসেবে তিনি বুঝলেন—জনগণের আস্থা অর্জন করা সবকিছুর আগে। কারণ নেতা যদি মানুষের বিশ্বাস হারায়, তাহলে পদ বা ক্ষমতা কোনো অর্থ রাখে না।
প্রথম কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে—নেতৃত্ব মানে শুধু মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া নয়। নেতা হওয়া মানে প্রতিটি পদক্ষেপে ন্যায়, সততা, এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা।
এই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—দৃঢ় মনোভাব এবং ধৈর্যই দ্রুত উত্থানের মূল চাবিকাঠি।
যেখানে কেউ তাড়াহুড়ো করে পদক্ষেপ নেয়, সেখানে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। আর তিনি দেখালেন—ধীরে, স্থিরভাবে, নীরবভাবে পদক্ষেপ নিলে দ্রুত উত্থান সম্ভব।
এই উত্থান শুধু নিজের জন্য নয়। দলের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য, দেশের জন্য। তিনি বুঝেছেন—নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত খেলা নয়, এটি দায়িত্বের প্রতিফলন।
চেয়ারপারসন হিসেবে তার প্রথম পদক্ষেপ ছিল দলের ভিতরকার অরাজকতা এবং অনিশ্চয়তা দূর করা। তিনি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনলেন, সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া স্থির করলেন, কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি করলেন। দলের নেতাদের জন্য তিনি ছিলেন নীরব গাইড, সাধারণ মানুষের জন্য তিনি হয়ে উঠলেন আশা।
নেতৃত্বে দ্রুত উত্থান মানে ছিল—কেবল পদে ওঠা নয়।
এটি মানে হলো—দৃঢ়তার সঙ্গে মানুষের হৃদয়ে স্থান তৈরি করা।
এটি মানে হলো—শিকড়কে ভুলে না যেয়ে নতুন ভবিষ্যত গড়া।
এই অধ্যায়ে তিনি প্রমাণ করলেন—নারী হওয়া কোনো বাধা নয়।
প্রকৃত নেতৃত্ব আসে দৃঢ় মনোভাব, ন্যায়পরায়ণতা, এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক দায়িত্ববোধ থেকে।
পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য তার চোখ স্থির ছিল। তিনি জানতেন—এখন সময় এসেছে দেশ এবং দলের জন্য আরও বড় প্রতিকূলতা মোকাবেলা করার।
এই অধ্যায়ে তার দ্রুত উত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়।
এটি ছিল একজন নারী নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশের গল্প।
চলবে…………..