(নীরব প্রস্তুতি থেকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পথচলা)
১৯৮২ সালের শীতল সকালে ঢাকা শহর হঠাৎ অন্য রকম দেখাচ্ছিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বাইরে তাকালেন—রাস্তার ধুলো, মানুষের চুপচাপ ভিড়, দূরে হেঁটে যাওয়া স্কুলছাত্রীরা। সবকিছুই আগের মতোই, অথচ তার জীবন আর আগের মতো নেই। এখন তার জন্য প্রতিটি পদক্ষেপের মানে ভিন্ন।
রাজনীতিতে পা রাখা মানে ছিল শুধুই নয়—শিক্ষা বা ঘরের দায়িত্ব পালন নয়। রাজনীতি মানে মানুষের জীবনের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়া, তাদের আশা, হতাশা, আস্থা—সব কিছু হাতে নেওয়া।
বিএনপি-এর সাধারণ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়া তার প্রথম পদচারণা। সেই দিনটি তার মনে আজও ভাসে। কার্যালয়ের সাদা দেয়াল, ফাইলের স্তূপ, অফিসের হুলস্থুল—সবকিছুই যেন নতুন এক বাস্তবতার প্রতিফলন।
কর্মীরা তাকে তাকিয়ে দেখছিল। কেউ জানত না, যে শান্ত, সংযত নারী ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে, নীরবে সব পর্যবেক্ষণ করছে, তার ভেতরে এক অদম্য শক্তি জন্ম নিচ্ছে।
প্রথম দিনে তিনি কথাও কম বললেন। কারও সঙ্গে বেশি হাসলেন না। শুধু শুনলেন, লক্ষ্য করলেন। কারও আচরণ, কারও দৃষ্টিভঙ্গি—সব কিছুই তার মননে দাগ কাটছিল।
এই পদচারণার প্রথম পাঠ ছিল—মানুষকে বোঝা।
যারা দলের সদস্য, যারা সাধারণ মানুষ—সবাই ভিন্ন। কেউ ভয় পেয়েছে, কেউ অনিশ্চয়তায়, কেউ আগ্রহী। তার কাজ ছিল তাদের বুঝে নেওয়া।
প্রথম পদচারণার সময়, তিনি শিখলেন—রাজনীতি হলো শুধু বক্তৃতা দেওয়া নয়। রাজনীতি হলো মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করা। কোনো অফিসের অফিসার হিসেবেই নয়, একজন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখার ক্ষমতা লাগবে।
একদিন, তিনি অফিসের এক ছোট কক্ষে বসে একটি গ্রুপের কথা শুনলেন। তারা সাধারণ মানুষের অভিযোগ নিয়ে আসছে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজের সুযোগ। তিনি চুপচাপ তাদের কথা শুনলেন। কখনো কখনো ছোট্ট প্রশ্ন করেছিলেন, কিন্তু তার চোখ সবকিছু লক্ষ্য করছিল।
এই পর্যবেক্ষণই পরে তার শক্তি হলো। কারণ তিনি বুঝতে পারলেন—প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু কাগজে নয়, মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
তিনি ধীরে ধীরে দলের মিটিংয়ে অংশ নিতে শুরু করলেন। প্রথম দিনে কেউ তাকে নেত্রী হিসেবে দেখে নি। সবাই ভাবত—জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। কিন্তু তিনি নিজেকে সেই পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেন না। তার প্রত্যেক পদক্ষেপে ধৈর্য, সংযম এবং দৃঢ়চেতা মনোভাব প্রকাশ পেতে শুরু করল।
একটি ছোট উদাহরণ:
একবার তিনি দলের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করলেন,
“মানুষরা আমাদের কাছ থেকে কি আশা করে?”
কর্মী হতবাক হয়ে শুধু বলল,
“নেত্রী, তারা আশা করে ন্যায়বিচার।”
এই সাধারণ কথায় তিনি ভেতর থেকে চিন্তিত হলেন। ন্যায়বিচার? এই এক শব্দই তখন তার মাথায় নতুন দায়িত্বের সৃষ্টি করল। তিনি বুঝলেন, নেতা হওয়া মানে কেবল ভোট জেতা নয়, জনগণের বিশ্বাস অর্জন করা।
প্রথম পদচারণার সময়, তিনি নিজেকে কখনো বড় মানুষ হিসেবে ভাবেননি। বরং প্রতিটি কর্মীকে সমান চোখে দেখতেন। এটা তার স্বভাব, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি পরবর্তীতে বড় শক্তি হিসেবে প্রমাণিত হলো।
তার শেখার আরেকটি দিক ছিল—ভয়কে মোকাবেলা করা।
রাজনীতিতে অনেক সময় হুমকি, গুজব, চাপে পড়তে হয়। প্রথম পদচারণার সময়ও তিনি দেখেছেন—কিছু নেতা অবিচল থাকে, কেউ ভয়ে পিছিয়ে যায়। তিনি ভীত হননি। নীরবভাবে, কিন্তু স্থিরভাবে তার পদক্ষেপ অব্যাহত রাখলেন।
একটি দিনের কথা মনে আছে। তিনি গ্রামের একটি এলাকায় গিয়েছিলেন। মানুষ ভীড় করছে, তাদের মুখে হতাশা, হতভম্ব দৃষ্টি। তিনি তাদের পাশে দাঁড়ালেন, শুধু চোখে চোখ রাখলেন। কোনো বক্তৃতা নয়, কোনো বড় কথা নয়। কিন্তু মানুষ অনুভব করল—ওরা বোঝে তাদের কষ্ট।
এই নীরব উপস্থিতি, সেই ছোট্ট পদচারণা—সব মিলিয়ে তাকে দলের ভিতরে স্বীকৃতি দিতে শুরু করল।
একটি রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই যাত্রা সহজ ছিল না। প্রথম পদচারণার সময় তিনি হেলদোল করলেন না, কেউ নাকচ করল না। বরং ভেতর থেকে শক্তি অর্জন করলেন।
এই সময়েই তার নেতৃত্বের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য জন্ম নিল—নীরব পর্যবেক্ষণ এবং স্থিরতা।
যখন অনেকেই কথা বলছে, উত্তেজিত হচ্ছে, সে সময় তিনি চুপচাপ বুঝতে চেষ্টা করতেন—কার আশা কি, কার ভয় কি, কার বিশ্বাস কোথায়।
প্রথম পদচারণার শেষে তিনি ঘরে ফিরতেন। সন্তানরা খেলছে, সংসার চলছে। তিনি আবারও নিজের শান্ত কোণে বসে, দিনের সব ঘটনা বিশ্লেষণ করতেন। রাজনীতির শেখা, মানুষের বোঝাপড়া—সবই এখন তার জীবনের অংশ।
এই পদচারণা তাকে শুধুই রাজনৈতিকভাবে নয়, মানসিকভাবে প্রস্তুত করল। দেখিয়েছিল—প্রথম পদক্ষেপ ছোট হলেও, তার প্রভাব বড়। স্থিরভাবে, নীরবভাবে এগোলে মানুষ অনুভব করে।
এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাজনীতিতে পা রাখা মানে কেবল নেত্রী হওয়া নয়। তা হলো মানুষের পাশে থাকা, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বোঝা এবং নিজের শক্তি প্রস্তুত রাখা।
প্রথম পদচারণা শেষ হলেও, তার অন্তর জানতো—এটি শুধু শুরু। সামনে আরও বড় পরীক্ষা, আরও কঠিন দায়িত্ব অপেক্ষা করছে।
একজন রাষ্ট্রনায়কের স্ত্রী থেকে প্রথম পদচারণা করা রাজনৈতিক নেতা—এই পরিবর্তনের গল্প তার জীবনকে নতুন রঙ দিয়েছে। এবং সে জানে, ধৈর্য, সংযম, স্থিরতা—এসবই তার পথের প্রয়োজনীয় সঙ্গী।
চলবে…………………