(বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের জয়)
১৯৯১ সালের এই সকালটা ঢাকার আকাশে এক অদ্ভুত শীতলতা নিয়ে এসেছিল। বাতাসে ছিল স্বাধীনতার গন্ধ—কিন্তু এটি শুধু শারীরিক স্বাধীনতার নয়; এটি ছিল গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের শিখা। দেশের মানুষ দীর্ঘ ৮ বছরের স্বৈরশাসনের চাপ থেকে মুক্তির আশায়, ভোটকেন্দ্রগুলোতে পা বাড়াচ্ছিল। প্রত্যেক ঘরে প্রত্যেক জীবনে আশা জেগে উঠেছিল—“অবশেষে আমরা আমাদের অধিকার পেতে যাচ্ছি।”
আর এই নির্বাচনের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি—বেগম খালেদা জিয়া। তার চোখে মিশ্রিত ছিল আশা, উত্তেজনা, এবং নীরব দৃঢ়তা। রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ত্যাগ, গ্রেপ্তার, কারাবাস, আন্দোলন—সবই এই মুহূর্তের জন্য।
নির্বাচন—প্রত্যাশা ও উত্তেজনা
নির্বাচনের আগে কিছুদিন ধরে শহর, গ্রাম—সবত্রেতেই তার উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছিল। নির্বাচনী প্রচার সভায় তিনি মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেন। কারো সমস্যা, কারো অনিশ্চয়তা—সবই তার চোখে পড়ত।
“আমরা শুধু ভোট চাইছি না,” বলতেন তিনি, “আমরা চাই দেশের জন্য ন্যায্যতা, দেশের জন্য গণতন্ত্র।”
শহরজুড়ে তার সমর্থকরা মিছিল করছিল। তরুণ-যুবক, নারী, বৃদ্ধ—সবাই তার পাশে। শিক্ষার্থীরা, যারা তার ছাত্রদলের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিল, এবার কেন্দ্রে ভোটে অংশ নিচ্ছিল। তারা জানে—এই মুহূর্তে তাদের ভোট শুধু কাগজ নয়; এটি দেশের ভবিষ্যতের প্রতীক।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা
নির্বাচন শেষ। গণনা শুরু। প্রতিটি ভোটার, প্রতিটি কণ্ঠের হিসাব। উত্তেজনা আকাশে ভাসছিল। অবশেষে ফলাফল প্রকাশ হলো।
বেগম খালেদা জিয়া বিজয়ী। না শুধু বিজয়ী—তারা ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। তিনি হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তার চোখে আনন্দ, কিন্তু মুখে সংযম। কারণ জানতেন—এটি শুধু ব্যক্তিগত বিজয় নয়; এটি দেশের গণতন্ত্রের বিজয়।
প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
রাজ্যের প্রতিটি সংবাদপত্রে, রেডিওতে, মানুষের মুখে, ঘরে ঘরে—সবাই কথা বলছিল। নারী, শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক—সবার মুখে ছিল কৃতজ্ঞতা।
“নারীও নেতৃত্ব দিতে পারে, সাহস দেখাতে পারে,” বলছিল তারা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার হাতে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এসেছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে স্বৈরশাসনের থেকে স্বাধীন, ন্যায়পরায়ণ সরকারের দিকে।
দলের ভিতর ও জাতীয় রাজনীতি
বিএনপি একটি শক্তিশালী দল হিসেবে উঠে এল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে পাঁচটি আসনে প্রায় বিজয়ী হলেন। দলগত সংগঠন, ছাত্রদল, গণআন্দোলন—সবই এখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মূল শক্তি।
তিনি বুঝতেন—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে, দেশের গণতন্ত্র স্থায়ী হবে না। তাই সরকার গঠনের সাথে সাথে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা তাঁর প্রধান লক্ষ্য। দেশের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা—সবকিছুই পুনর্গঠনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে।
গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা
তিনি দেশের শাসনব্যবস্থায় মূল পরিবর্তন আনলেন। রাষ্ট্রপতি-শাসিত ক্ষমতা সীমিত করে সংসদকে সক্রিয় করলেন। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ—সবই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা হওয়া নিশ্চিত হল।
এই পরিবর্তন শুধুমাত্র আইনগত নয়। এটি মানসিক পরিবর্তনও। মানুষ বুঝল—এখন থেকে তাদের কণ্ঠ, ভোট, এবং অধিকারই দেশের পরিচালনায় প্রাধান্য পাবে।
ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা
১৯৯১ সালের বিজয় শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক অর্জন নয়। এটি তার জীবনের প্রতিটি সংগ্রাম, প্রতিটি ত্যাগের প্রতিফলন। গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন—সবই তাকে প্রস্তুত করেছিল এই মুহূর্তের জন্য।
তাঁর ব্যক্তিগত সাহস, আপসহীন মনোবল এবং ন্যায়পরায়ণতা দেশের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। তিনি দেখিয়েছেন—একজন নারী নেতা, যিনি আপস করেননি, যিনি প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করেছেন, তার নেতৃত্ব কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
জনগণের উৎসাহ ও সমর্থন
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম, বাজার, নদীঘাট—সবত্রেতেই মানুষের উদ্দীপনা। মিছিল, উল্লাস, সমাবেশ—সবই তার বিজয়ের প্রতীক।
শিশুরা স্কুলে বসে কাগজের পতাকা নিয়ে হাত নাড়ছে। নারীরা আনন্দের অশ্রু ঝরাচ্ছে। বৃদ্ধরা বলছে—“আমরা দেখেছি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
এই বিজয় শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও সূচনা। মানুষ বুঝল—নারীও নেতৃত্ব দিতে পারে, নারীর নেতৃত্ব দেশের জন্য নতুন আশা আনতে পারে।
ঐতিহাসিক মূল্য
১৯৯১ সালের এই বিজয় বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
- এটি প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে নারী নেতৃত্ব।
- এটি গণতন্ত্রের বিজয়, স্বৈরশাসনের পতন নয়, বরং জনগণের আশা পূরণের প্রতীক।
- এটি প্রমাণ করে, দৃঢ় নীতি, আপসহীন মনোবল এবং সাহসিকতা থাকলে যে কোনো প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করা সম্ভব।
পরিণতি
বিজয়ের পর দেশ শান্তি এবং নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যায়। সরকার গঠন, নীতি প্রণয়ন, অর্থনীতি, শিক্ষা—সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনেন তিনি। দেশের মানুষ তাকে দেখে আশা পায়—যে নেতা জনগণের পাশে দাঁড়ায়, যে নারী আপস করে না, তার নেতৃত্বে দেশ অগ্রগামী হতে পারে।
১৯৯১ সালের এই বিজয় কেবল একজন ব্যক্তির নয়, পুরো জাতির বিজয়। এটি দেখায়—সংগ্রাম, দৃঢ়তা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা মিলিয়ে তৈরি হয় সত্যিকারের ইতিহাস।