ঢাকা, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৩:৫০:৫৭ PM

শোকের মহাকাব্য- পর্ব–১২

মান্নান মারুফ
04-01-2026 01:06:46 PM
শোকের মহাকাব্য- পর্ব–১২

(আপসহীন নীতি গণতন্ত্রের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা)

১৯৮৬ সালের একটি উষ্ণ বসন্তকাল। শহরের বাতাসে ঘূর্ণমান ধুলো, আর মানুষের মুখে অচেনা উদ্বেগ। সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে, রেডিওতেসবখানে একটি শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছে: নির্বাচন।

দেশের মানুষ আশা করেছিলগণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ, দেশের শাসনের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু সেই আশা কিছুতেই পূর্ণ হল না। প্রশাসনের শক্তি, স্বৈরশাসকের প্রভাব এবং নকল ভোটের প্রক্রিয়াসবই দেখিয়েছিল, নির্বাচন ছিল কারচুপির।

এদিন তিনি ছিলেন রাজধানীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে। চুপচাপ বসে তার চোখগুলো কর্মীদের দিকে। কেউ বোঝেনি, ভেতরে তিনি কী ভাবছেন। তিনি জানতেনদল এবং দেশের জন্য এই মুহূর্তটি গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হল। কারচুপির চিহ্ন স্পষ্টভোটের সংখ্যা, বিজয়ীদের তালিকা, ভোটারদের অভিযোগসবই একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার আভাস দিচ্ছিল।

অনেক নেতা স্থির হতে পারল না। কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস পেল না। কিন্তু তিনি স্থির ছিলেন। তার মনের ভেতর একটিমাত্র কথা ঘুরপাক খাচ্ছিলআপস নয়, ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার বজায় রাখা।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তিনি আলোচনা শুরু করলেন। কোন পথে এগোতে হবে? জনগণের আস্থা রক্ষা করতে হবে, নাকি স্বৈরশাসকের সঙ্গে আপস করে পরিস্থিতি মসৃণ করা যাবে? তার উত্তর স্পষ্ট ছিল। তিনি বললেনচলবে না।

তার সিদ্ধান্ত ছিল, এই নির্বাচন বর্জন করা। তিনি জানতেনএটি সহজ পথ নয়। নেতাদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা, এবং স্বার্থসংকুল মনোভাব ছিল। কিন্তু তার দৃঢ়তা সবার চেয়ে শক্তিশালী।

তিনি কেবল দলের নেতাদের সাথে কথা বললেন না, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও বজায় রাখলেন। গ্রাম, শহর, শিক্ষার্থী, শ্রমিকসবার কাছে স্পষ্ট করলেন, এই নির্বাচন শুধু ভোটের খেলা নয়, দেশের ভবিষ্যতের প্রতিফলন।

প্রথম দিনে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই তিনি দেখলেনঅনেকেই অবাক, অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত। কারো মনে প্রশ্ন, ‘একজন নারী নেতা কি এতটা সাহসী হতে পারে?’ তার প্রতিক্রিয়া চুপচাপ, কিন্তু দৃঢ়।

এরপর তিনি মাঠে নামলেন। গণমাধ্যম, মিছিল, সভাসব কিছুই তার নেতৃত্বের চিহ্ন হয়ে উঠল। কিন্তু তার ভাষা কখনো তিক্ত নয়। বরং সংযত, প্রাঞ্জল, মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর মতো।

ছাত্রদলের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে সংগঠিত করে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশা, নতুন শক্তি, নতুন দায়িত্ববোধ জন্মালো। শিক্ষার্থীরা তখনই বুঝতে শুরু করলনেত্রী শুধুই রাজনৈতিক অবস্থান নয়, জনগণের কণ্ঠস্বরের প্রতীক।

গ্রেপ্তার হুমকির আশঙ্কা ছিল, তবে তিনি ভীত হলেন না। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সময়ের সব হুমকি তার দৃঢ়তাকে আরও শক্তিশালী করল। তার মনের একমাত্র লক্ষ্য ছিলদেশে ন্যায্য ভোট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

নির্বাচন বর্জন কেবল একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়। এটি ছিল একটি নৈতিক অঙ্গীকার, একটি আপসহীন অবস্থান। তিনি দেখিয়েছিলেন, কোনো নেতা যদি জনগণের বিশ্বাস হারায়, তাহলে ক্ষমতা এবং পদ কোনো অর্থ রাখে না।

এরপরও, তিনি দলের ভিতরে শান্তি বজায় রাখলেন। কর্মীদের সংগঠিত করলেন, নেতাদের বোঝালেনভয় নয়, দৃঢ়তা। জনগণের আস্থা বজায় রাখার জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ খুঁজে বের করলেন।

এই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলোআপস নয়, ন্যায়পরায়ণতা এবং দৃঢ় নীতি মেনে চলাই প্রকৃত নেতৃত্ব।
তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী শুধু বলার জন্য নয়, কাজের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে।

পরবর্তী সময়ে এই নির্বাচন বর্জনের পদক্ষেপই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করল। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত হলো গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের জন্য স্বাধীন ন্যায্য নির্বাচন।

এই অধ্যায়ে তিনি প্রমাণ করলেনএকজন নারী নেতা ভয়কে জয় করতে পারে, স্বৈরশাসকের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য নয়, এবং জনগণের পাশে দাড়াতে পারে।

কারচুপির নির্বাচন বর্জন, নীরব সাহস, স্থির সিদ্ধান্তসব মিলিয়ে তাকে শুধু দলের নেতা নয়, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।

এভাবেই তিনি স্থির করলেনআপসহীন নীতি দৃঢ়তা ছাড়া রাজনীতি কখনো প্রকৃত অর্থে সফল হতে পারে না।

চলবে……………….