(নতুন উদ্যোগ, দেশের উন্নয়ন ও নারীদের ক্ষমতায়ন)
১৯৯১ সালের বিজয়ী সরকারের প্রথম দিনগুলোতে দেশের বাতাবরণ ছিল একদম পরিবর্তনের দিকে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে, কিন্তু দেশের অর্থনীতি তখনও চরম চ্যালেঞ্জের মুখে। জনগণ আশাবাদী, কিন্তু বাস্তবতা কঠোর। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিল্পক্ষেত্রে স্থবির অবস্থা—সবই দেশের সাধারণ মানুষকে চিন্তিত করছিল।
বেগম খালেদা জিয়া জানতেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য। তাই তিনি শুরুর দিনগুলোতেই অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেন।
দেশের অর্থনৈতিক চিত্র
স্বৈরশাসন শেষ হওয়ার পর দেশের শিল্প ও বাণিজ্য ধীর গতিতে কাজ করছিল। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ঋণের অভাবে স্থবির, গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা উৎপাদন বাড়াতে পারছে না, এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নারীদের কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা।
তিনি বুঝলেন—দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যথেষ্ট নয়; মানুষের জীবনের গুণগত মান উন্নত করতে হবে। অর্থাৎ, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে, শিল্প ও বাণিজ্যকে সচল করতে হবে, এবং নারী শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।
কর্মসংস্থানে নতুন উদ্যোগ
প্রথমে, তিনি তৈরি পোশাক শিল্পকে গুরুত্ব দিলেন। এটি ছিল একদিকে দেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ, অন্যদিকে নারীদের কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ। তিনি সরকারের নীতিমালা এমনভাবে সাজালেন, যাতে ব্যবসায়ীরা নতুন প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য উৎসাহিত হয়, এবং নারীরা সহজে কাজের সুযোগ পায়।
সরকারি প্রণোদনা, ঋণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি—সবকিছুই নারীদের স্বনির্ভর হতে সাহায্য করল। গ্রামে বসবাস করা নারী, যারা আগে ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তারা কারখানায়, অফিসে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যখাতে কাজ করতে পারছিল।
এক স্কুলের শিক্ষক বলেছিলেন,
“এখন আমাদের মেয়েরা শুধু পড়াশোনা নয়, স্বাধীনভাবে কাজও করছে। তারা আত্মনির্ভর এবং আত্মবিশ্বাসী।”
শিল্প ও ব্যবসার উন্নয়ন
বেগম খালেদা জিয়ার নীতি অনুযায়ী, নতুন শিল্প-প্রতিষ্ঠান খুলতে সরকার ঋণ এবং প্রণোদনা দেয়। ছোট ব্যবসায়ীরা শুরুর উদ্বেগ ছাড়াই উদ্যোগ নিতে পারে। সরকার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যবসায়ীদের সহায়তা করে।
ঢাকার বাইরে, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী—সব জায়গায় ছোট ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ শুরু হয়। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়, এবং দেশের আয় বাড়ে। এছাড়াও, কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি প্রবর্তন করা হয়, যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হয়।
নারীদের ক্ষমতায়ন
নারী শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিই ছিল প্রধান লক্ষ্য। বেগম খালেদা জিয়া বিশ্বাস করতেন—যদি নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়, তবে সমাজের গুণগত মানও বৃদ্ধি পায়।
তিনি নতুন সরকারি এবং বেসরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করেন। নারীরা হাতে-কলমে নতুন দক্ষতা অর্জন করে, যেমন সেলাই, তৈরি পোশাক, হ্যান্ডিক্রাফট, শিক্ষাদান ও স্বাস্থ্যসেবা। এতে তাদের ঘরে বসে আয় করার সুযোগও তৈরি হয়।
এক গ্রামীণ মহিলা বলেছিলেন,
“আমরা এখন শুধু পরিবারের জন্য নয়, নিজের জন্যও আয় করি। আমরা গর্বিত।”
কর্মসংস্থানের সামাজিক প্রভাব
শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক দিক থেকেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা আর সমাজের নিচে নয়, তারা এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। পরিবারের ভিতরে তাদের গুরুত্ব বাড়ছে। শিশুদের শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে। পরিবারের জীবনযাত্রা সমৃদ্ধ হচ্ছে।
পুরুষদেরও এতে প্রেরণা মিলছে। তারা দেখছে, নারীর শক্তি এবং কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
বেগম খালেদা জিয়ার সরকার শুধু ক্ষণস্থায়ী উদ্যোগ নিয়েছে না। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। এতে রয়েছে:
- নতুন শিল্প এবং ব্যবসায়ে বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি।
- গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করা।
- নারীদের প্রশিক্ষণ ও স্বনির্ভরতা।
- বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ।
- শিক্ষিত যুবক এবং যুবতীদের জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।
তিনি সবসময় বলতেন,
“দেশের উন্নতি মানে শুধু বড় শহরের উন্নতি নয়, গ্রাম-গঞ্জেও মানুষ উন্নত হবে। নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া দেশের অগ্রগতি অসম্পূর্ণ।”
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র—সবত্রেতেই মানুষের মুখে মুখে প্রশংসা। শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী—সবাই জানে, বেগম খালেদা জিয়ার এই উদ্যোগ তাদের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন এনেছে।
শিশুরা স্কুলে পড়াশোনা করতে পারছে, মেয়েরা ঘরে বসে আয় করতে পারছে, পরিবারের জীবনমান উন্নত হয়েছে। এই কর্মসংস্থান শুধু অর্থ নয়, মানুষের আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার প্রতীক।
ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ
১৯৯১ সালের এই উদ্যোগ কেবল সরকারের পদক্ষেপ নয়। এটি দেশের মানুষের জন্য নতুন আশা, নতুন দিশা, এবং নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক।
- তৈরি পোশাক শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি।
- নতুন শিল্প এবং বাণিজ্য সচল হয়ে অর্থনীতি সমৃদ্ধ।
- গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নত হয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান।
এই সময়ের অর্জন দেখায়, যে নেতা জনগণের পাশে দাঁড়ায়, সমাজের সমস্ত স্তরের উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা করে, নারীর শক্তিকে কাজে লাগায়, তার নেতৃত্ব দেশের জন্য স্থায়ী হয়ে যায়।
পরিণতি
বেগম খালেদা জিয়ার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত উদ্যোগ দেশের মানুষের জীবনে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। আজকের বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং নতুন শিল্পের বিকাশ—সবই তার নেতৃত্বের ফল।
এই অধ্যায় থেকে আমরা শিখি—দৃঢ় নেতৃত্ব, নীতি এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
চলবে……………..