(নতুন শক্তি, নতুন আশা, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ)
১৯৮৪ সালের বসন্তকাল। শহরের রাস্তাগুলো তখনও শান্ত ছিল না, বরং এক অদৃশ্য উত্তেজনা অনুভূত হচ্ছিল। দেশের মানুষ জানে—স্বৈরশাসক সরকারের কঠোর নজরদারি, সেনা বাহিনীর টহল, কারফিউ এবং সাংবাদিকদের ওপর চাপ, সবই জনমানসে চাপ তৈরি করছে।
এই সময়ে, তিনি, যে নারী নীরবভাবে নিজের রাজনৈতিক পথচলা শুরু করেছিলেন, স্থির মনোভাবে দেখলেন—যদি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা যায়, তবে নতুন শক্তি দরকার। সেই শক্তি হলো—ছাত্রদল।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তখনো তুলনামূলকভাবে অগঠিত। অনেকেই মনে করেছিল, শিক্ষার্থীরা এই কঠিন সময়ে ভয়ে সরে যাবে। কিন্তু তিনি জানতেন—যেখানে সাহস আছে, সেখানে আন্দোলনের আগুন জ্বলে। তিনি নিজেই ছাত্রী ও ছাত্রদের মধ্যে সাহস, আশা এবং দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুললেন।
একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পটভূমিতে, একটি ছোট সভায় তিনি ছাত্রদের সামনে দাঁড়ালেন। চোখে দৃঢ়তা, কথায় স্পষ্টতা। তিনি বললেন,
“গণতন্ত্র শুধু ভোট নয়। গণতন্ত্র হলো আমাদের অধিকার, আমাদের ভবিষ্যৎ। আমাদের প্রিয় দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে আমরা সবাইকে একত্রিত হতে হবে।”
শুনতে শুনতে শিক্ষার্থীরা চমকে গেল। তারা বুঝতে পারল—এই নারী শুধু নেতা নয়, গণতন্ত্রের প্রেরণা। সে দিন ছাত্রদলের সদস্যরা এক নতুন শক্তি পেল।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে তিনি সরাসরি মাঠে নেমে ছাত্রদের প্রশিক্ষণ ও সংগঠন করলেন। আন্দোলনের কৌশল, শান্তিপূর্ণ মিছিলের পরিকল্পনা,সাধারন নাগরিকদের সঙ্গে সংযোগ—সবকিছুই শিক্ষা দিলেন। তারা শিখল—নেত্রী হয়তো জেলখানা ও কারফিউর ভয় দেখছে, কিন্তু তার মনোবল অটল।
শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিল্পকলা বিদ্যালয়—সবক্ষেত্রেই ছাত্রদল সক্রিয় হল। শিক্ষার্থীরা মিছিল, সভা, প্রকাশনা—সব মাধ্যমে জনগণকে জানাচ্ছে তাদের অধিকার। আর এই আন্দোলনের মুখপাত্র হচ্ছেন তিনি।
তাঁর নেতৃত্বের বিশেষ দিক ছিল—নীরব পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া। কখনো কোনো শিক্ষার্থী ভীত হয় বা বিভ্রান্ত হয়, তিনি ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে বসে কথা বলতেন, প্রশ্ন শুনতেন, ব্যাখ্যা করতেন। এতে ছাত্রদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্ম নিল।
একবার, একটি বৃহৎ মিছিলে, পুলিশ বাধা দিতে আসে। উত্তেজনা, ভয়, দ্বিধা—সবই লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তিনি সরাসরি সেখানে উপস্থিত, শান্ত, দৃঢ় মনোবল নিয়ে। কোনো হুমকি তাকে থামাতে পারল না। শিক্ষার্থীরা দেখল—নেত্রী ভয় দেখায় না। তখনই মিছিল সফলভাবে চলে।
এই সময়কাল তার জন্য শিক্ষণীয় ছিল। তিনি শিখলেন—ছাত্র শক্তি না থাকলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন অসম্পূর্ণ। ছাত্ররা শুধু আন্দোলনের অংশ নয়, তারা ভবিষ্যতের নেতৃত্ব।
ছাত্রদল ও গণআন্দোলনের এই সময়কালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সংগঠিত শক্তিই পরিবর্তনের মূল।
নেত্রী যদি দৃঢ় না হয়, তবে নতুন প্রজন্ম ভয় পায়। আর নতুন প্রজন্ম যদি ভয় পায়, গণতন্ত্রের প্রতীক হারায়।
পরবর্তী বছরগুলোতে এই ছাত্রদল ও গণআন্দোলনই স্বৈরশাসকের পতনের পথ তৈরি করল।
- গ্রেপ্তার ও হুমকির ভয়ে কেউ পিছপা হয়নি।
- শিক্ষার্থীরা নতুন সাহস নিয়ে বেরিয়েছে।
- জনগণ বুঝেছে—নেত্রী শুধু রাজনৈতিক পদ নয়, মানুষের আশা ও অধিকার রক্ষার প্রতীক।
এই অধ্যায়ের শিক্ষা হলো—নেত্রী এবং শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে দাঁড়ালে গণতন্ত্রকে রক্ষা করা সম্ভব।
তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী যে স্থিরচেতা, আপসহীন এবং সাহসী হতে পারে, তার নেতৃত্ব শুধু নিজের জন্য নয়, দেশের জন্য শক্তিশালী প্রেরণা হতে পারে।
গণআন্দোলনের এই অধ্যায় কেবল আন্দোলনের গল্প নয়। এটি এক নারীর সাহস, ছাত্রদলের শক্তি, এবং দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের ইতিহাস।
চলবে………