ঢাকা, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৩:৫৪:০৫ PM

শোকের মহাকাব্য- পর্ব–১১

মান্নান মারুফ
04-01-2026 12:57:28 PM
শোকের মহাকাব্য- পর্ব–১১

(গণতন্ত্রের জন্য এক নারীর দৃঢ় অঙ্গীকার)

১৯৮৩ সালের বাংলাদেশ। দেশের রাস্তাঘাটে তখনো শৃঙ্খলা নেই। আকাশ ভারী, মানুষের মনে ভয়। শহর জুড়ে সেনাবাহিনীর টহল, কারফিউর চাপ, সংবাদপত্রে সেনা সরকারের নিয়ন্ত্রণসবই প্রকাশ করছে, এখানে কেউ স্বাভাবিকভাবে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে না।

এই সময়ে, তিনিযিনি স্বামীর স্ত্রী হিসেবে সংসারের নীরব দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যিনি নীরবভাবে দলের ভিতরে নিজের অবস্থান তৈরি করছিলেনতার ভেতর জন্ম নিল এক অদম্য শক্তি। শক্তি, যা তাকে শুধুই নেতা বানাবে না, বরং দেশের মানুষের কাছে আশার প্রতীক বানাবে।

চেয়ারপারসন হওয়ার পর, তিনি প্রথম বুঝলেনরাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়। রাজনীতি মানে জনগণকে তার অধিকার, গণতন্ত্র এবং ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া।

প্রথম দিকে, মানুষকে বোঝা কঠিন ছিল। স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের শাসন এমন এক দমনের পদ্ধতি চালাচ্ছিল, যেখানে ভয় মানুষের মুখে পড়ে। তবে তার চোখে ভয় ছিল না। সে দেখেছেমানুষের ভেতরে আছে এক অবিস্মরণীয় আশা, যা কেউ নিভিয়ে দিতে পারবে না।

তিনি দলের ভিতরে উদ্যোগী হয়ে উঠলেন। শুরু হলো সাতদলীয় জোট গঠনের পরিকল্পনা রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত করতে, নেতা হিসেবে নীতিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে, জনগণের আস্থা অর্জন করতেসবকিছুই তখন তার দায়িত্বে পড়ল।

সাতদলীয় জোটএটি ছিল শুধু রাজনৈতিক জোট নয়। এটি ছিল গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের প্রতীক। যখন দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ভেঙে ভেঙে স্বার্থের খেলার মধ্যে লিপ্ত, তখনও তিনি স্থির ছিলেন। তার লক্ষ্য একটাইদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা

এই সময়ে তিনি বারবার সভায় বসতেন। নেতা হিসেবে নয়, প্রথমে একটি সতর্ক পর্যবেক্ষক হিসেবে। কিন্তু মনোভাব স্পষ্টযেখানে অন্যরা ভয় পাচ্ছে, সে সময়ও তিনি স্থির থাকতেন। কোনো নেতা তার সঙ্গে আপস করতে চাইলেও তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেনআপস নয়, ন্যায়বিচার

জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে প্রথম পদক্ষেপ ছিল কঠিন। দলগুলো বিভক্ত, জনগণ ভীত। তবে তিনি ধীরে ধীরে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুরু করলেন। গ্রাম থেকে শহর, শিক্ষার্থী থেকে শ্রমিকসবাইকে সংগঠিত করা, তাদের বোঝানো যে তাদের অধিকার আছে, তাদের ভোটাধিকার আছেতখনই কাজ শুরু হলো।

তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলোদৃঢ়তা এবং আপসহীন নীতি তিনি জানতেন, স্বৈরশাসকের সঙ্গে আপস করলে সবকিছু নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তিনি একরূপভাবে বললেনচলবে না।

এই সময় ছাত্রদলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করল। তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে সংগঠিত করলেন। শিক্ষার্থীরা তখনই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের মধ্যে নতুন শক্তি, নতুন আশা, নতুন আগ্রহসবই তিনি কাজে লাগালেন। ছোট ছোট সভা, আলোচনা, আন্দোলনের প্রস্তুতিসব মিলিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক নতুন শক্তি গড়ে তুললেন।

গ্রেপ্তার হুমকি তার জন্য নতুন কিছু নয়। তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা তাকে প্রস্তুত করেছিল। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার, হুমকি, জিজ্ঞাসাবাদসবই তার দৃঢ়তাকে আরও শক্তিশালী করল। কখনো সে পিছপা হয়নি। কখনো ভয় দেখানো অবসরে তাকে থামাতে পারেনি।

তার শ্লেষ বা কঠোর বক্তব্য কখনো ব্যক্তিগত রাগ নয়। বরং ছিল ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার। জনগণ বুঝেছিলএই নারী শুধু নেত্রী নয়, এই নারী গণতন্ত্রের প্রতীক।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার নেতৃত্ব শুধু সভায় বা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সরাসরি মাঠে গিয়েছিলেন। শহরের রাস্তায়, গ্রামের পথঘাটে। মানুষকে বুঝিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, এবং তাঁদের সাহস দিয়েছেন।

এই সময়টিতে তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, একজন গণতান্ত্রিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। দেশের প্রতিটি প্রান্তে তার নাম ছড়িয়ে যায়। 'আপসহীন নেত্রী'—এই নাম তখন গড়ে ওঠে।

পরবর্তী বছরগুলোতে এই উদ্যোগই পরিণত হলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিত্তি। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত হলো বিতর্কিত নির্বাচন বর্জন, আন্দোলন, এবং অবশেষে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

তার মূল বিষয় হলোনেতৃত্ব মানে ভয়কে জয় করা, আপস নয়, দৃঢ় নীতি বজায় রাখা এবং জনগণের পাশে থাকা।
তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী যে নারীর মতো সংযত, দৃঢ়চেতা এবং সাহসী হতে পারে, তার নেতৃত্ব শুধু নিজের জন্য নয়, গোটা জাতির জন্য প্রেরণা হতে পারে।

১৯৮৩ সালের এই সময়কাল, এই সংগ্রাম, এই নীরব কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপসব মিলিয়ে তাকে শুধু দলের নেতা নয়, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।

এভাবেই শুরু হলো এক নারীর স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, যা পরবর্তী ইতিহাসে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের পথে একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে থেকে যাবে।

চলবে……………….