ঢাকা, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৩:৫৩:৫৯ PM

শোকের মহাকাব্য- পর্ব–১৭

মান্নান মারুফ
04-01-2026 01:33:38 PM
শোকের মহাকাব্য- পর্ব–১৭

(দেশের শাসনব্যবস্থায় নতুন আলো, জনগণের ভোটের বিজয়)

১৯৯১ সালের দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমুল্য অধ্যায়। দীর্ঘ বছরের স্বৈরশাসনের চাপ, সেনা শাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, মানুষের নীরব ভয়সব কিছু মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক বাতাবরণ ছিল গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু সেই অন্ধকার ভেদ করেছিল এক নারী নেতাবেগম খালেদা জিয়া। তার সাহস, দৃঢ়তা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা দেশের রাজনীতিতে নতুন আলো জ্বালিয়েছে।

নির্বাচনের বিজয়ের পর তার সামনে ছিল এক বৃহৎ চ্যালেঞ্জসংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। শুধু বিজয়ই যথেষ্ট নয়; দেশের মানুষকে দিতে হবে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারের অংশগ্রহণের সুযোগ, স্বাধীন নীতি-নির্ধারণের অধিকার এবং জনগণের সত্যিকার কণ্ঠ।

অবস্থা এবং চ্যালেঞ্জ

নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পরিচালিত সরকার দেশের প্রতিটি বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করেছিল। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসবকিছু স্বৈরশাসকের ইচ্ছা অনুযায়ী পরিচালিত হত। নাগরিকদের কণ্ঠাধিকার নেই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত। সাংবাদিকরা ভয় পাচ্ছিলেন, নেতারা নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছিলেন।

এই পরিবেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সহজ কাজ নয়। এজন্য দরকার ছিল দৃঢ় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল, দলগত সমন্বয় এবং জনগণের আস্থা। বেগম খালেদা জিয়া ঠিক জানতেনএখনই সেই মুহূর্ত, যখন দেশের মানুষের আশা নেতৃত্বের সাহস মিলিয়ে নতুন ইতিহাস লেখা সম্ভব।

প্রস্তুতি এবং পদক্ষেপ

বিজয়ের পর প্রথম দিন থেকেই তিনি দলের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী কর্মপরিকল্পনা সাজালেন। তিনি জানতেনসংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই দলের অভ্যন্তরীণ একতা, আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়া, সংসদে কার্যক্রমের পদ্ধতিসবকিছু পুনঃসংগঠিত করা জরুরি।

তিনি প্রায় প্রতিদিন দলের সিনিয়র নেতা সাধারণ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। তিনি বলেন,
আমাদের লক্ষ্য শুধু ক্ষমতা নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের মানুষের কণ্ঠকে প্রতিষ্ঠিত করা, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা।

ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে নিয়মিত সভায় অংশগ্রহণ করানো হলো। তার লক্ষ্য ছিলসংসদীয় গণতন্ত্র শুধুমাত্র আইন বা প্রক্রিয়ায় নয়; এটি মানুষের মনেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

প্রথম কার্যক্রম

প্রধানমন্ত্রীর দফতর গ্রহণের পর, তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নিলেন:

  1. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা হলো, যাতে সংসদ সরকারের প্রধান হিসেবে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
  2. সংসদে ভোট আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলো।
  3. বিচারব্যবস্থায় স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে আনা হলো।
  4. প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করা হলো।

এই পদক্ষেপগুলি একদিকে যেমন আইনগত পরিবর্তন, তেমনি জনগণের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করল। মানুষ বুঝলএখন থেকে তাদের ভোট, মতামত এবং অধিকারই দেশের নীতি-নির্ধারণে প্রাধান্য পাবে।

জনগণের সাড়া

দেশজুড়ে জনগণ দেখল নতুন নেতৃত্বের দৃঢ়তা। রাস্তায়, বাজারে, স্কুল-কলেজে, গ্রামেসকলেই উদ্দীপনা। মানুষ জানল, তারা শুধু নির্বাচন করেছে না; তারা দেশের ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছে।
অবশেষে আমাদের কণ্ঠ শোনা যাবে,” বলছিল সাধারণ মানুষ।
নারীরা, যারা আগে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে থাকতেন, এবার সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করলেন। শিক্ষার্থীরা, যারা ছাত্রদলের মাধ্যমে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, এবার সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে শুরু করলেন।

পারস্পরিক সহযোগিতা এবং স্থিতিশীলতা

সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা মানে শুধু আইন নয়; এটি মানসিক পরিবর্তনও। রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, জনগণসবকেই একত্রিত করা হলো। তিনি বারবার বলতেন,
সংসদে আমাদের শৃঙ্খলা থাকতে হবে। পার্থক্য থাকলেও আমরা দেশের কল্যাণে একসাথে কাজ করব।

এমন নেতৃত্ব দেশের রাজনীতিকে স্থিতিশীল করল। স্বৈরশাসনের ছায়া ধীরে ধীরে শেষ হলো। প্রশাসন, বিচার, শিক্ষাসবক্ষেত্রে জনগণ তার অধিকার ফিরে পেল।

ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দৃঢ়তা

সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তার জন্য কোনো সহজ কাজ ছিল না। রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বিরোধী দলের চাপ, সরকারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বসবই তাকে পরীক্ষা করল। কিন্তু তার সাহস, দৃঢ় মনোবল এবং ন্যায়পরায়ণতা তাকে প্রতিটি বাঁধা অতিক্রম করতে সাহায্য করল।

ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ

১৯৯১ সালের এই অর্জন শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এটি দেশের জনগণের ভবিষ্যতের বিশ্বাস, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার প্রতীক।

  • রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপান্তর।
  • জনগণের কণ্ঠের প্রতিফলন নীতি নির্ধারণে।
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নেতৃত্বের শক্তিশালী পুনর্গঠন।

পরিণতি

সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল। দেশের মানুষ বুঝলযে নেতা জনগণের পাশে দাঁড়ায়, যে নেতা আপস করেনি, দেশের জন্য দৃঢ় নীতি নিয়েছে, তার নেতৃত্বে গণতন্ত্র অটল হয়।

বেগম খালেদা জিয়ার এই পদক্ষেপ শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি ছিল একজন আপসহীন নেত্রীর সাহস, ন্যায়পরায়ণতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জীবন্ত প্রমাণ।

দেশের মানুষ এই অধ্যায়টি আজও মনে রাখেযে দিন সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলো, সেই দিন জনগণের আশা নেতৃত্ব একত্রিত হয়ে ইতিহাসে স্থায়ী হলো।

 

চলবে……………….