(দৃঢ় নীতি, অসীম সাহস ও আপসহীন নেতৃত্ব)
১৯৮৩ সাল। দেশের রাজনীতি তখনো উত্তাল। গণতন্ত্রের স্বপ্ন ভেসে আসছে দূরে, আর স্বৈরশাসক সরকারের চাপ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এই সময়ে, একজন নারী নেতা, যিনি নীরবভাবে নিজের পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, হঠাৎ দেশের রাজনীতির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে গেলেন।
তার চোখে ভয় ছিল না, কিন্তু সামনে যে ঝড় আসছে তা স্পষ্ট। দেশের মানুষ জানে—যে নেতা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তার জন্য কোনো সুরক্ষা নেই। কিন্তু তার মনোবল, তার দৃঢ়তা, তার ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার—সবই শক্তিশালী।
প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৯৮৩ সালে। সকালবেলা ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ করা ডাকে। দরজার বাইরে সেনাবাহিনীর টহল। নীরবতার ভেতর হঠাৎ ভাঙন। তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো নিরাপত্তা দফতরে।
সেখানে তার সঙ্গ ছিল না স্বচ্ছতার। প্রশ্ন—কেন রাজনীতি করছেন, কেন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তিনি কোনো ভীতি দেখাননি। কেবল স্থির চোখে উত্তর দিয়েছিলেন,
“আমি মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি। আমি গণতন্ত্রের জন্য দাঁড়াচ্ছি।”
কিছু দিন জেল খাটার পর মুক্তি পেলেও, এটি তাকে ভাঙতে পারেনি। বরং শক্তি দিয়েছে। গ্রেপ্তার এবং নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে—ভয়কে জয় করতে হবে। আপস নয়, ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে হবে।
পরবর্তী কয়েক বছর ধরে, বারবার গ্রেপ্তার করা হলো। প্রতিবারই ভিন্ন কৌশল, ভিন্ন চাপ। জিজ্ঞাসাবাদ, মানসিক চাপ, কখনো শারীরিক নির্যাতন। কিন্তু তার মনোবল অটল।
একবার একটি ছোট কক্ষে তাকে রাখা হলো। চারপাশে অফিসারদের ঘুরপাক, চাপ, হুমকি। কিন্তু তিনি শুধু চুপচাপ বসে ছিলেন। ভেতরে মন শান্ত, ভেতরে দৃঢ়তা। অফিসাররা প্রশ্ন করল,
“আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?”
তিনি ধীরে উত্তর দিলেন,
“ভয়? আমি মানুষের পাশে আছি। মানুষের আশা এবং গণতন্ত্রের জন্য দাঁড়িয়েছি। এই জন্য কোনো ভয় আমার মনে স্থান পাবে না।”
এই দৃঢ়তা, এই সাহসিকতা দেখে অনেকেই অবাক। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার অবস্থান আরও দৃঢ় হলো। গ্রেপ্তার, হুমকি, নির্যাতন—সবই তাকে গড়ে তুলল।
গ্রেপ্তার এবং কারাবাসের সময়, তার মন খালি ছিল না। পরিবার, দলের নেতা, সাধারণ মানুষ—সবাইকে নিয়ে চিন্তা করতেন। মনে করতেন—যেখানে আমি আছি না, সেখানে কীভাবে দল এবং আন্দোলন চলবে?
এই সময়ে ছাত্রদলের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা তার সাহস দেখে অনুপ্রাণিত হলো। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—সবত্রেতেই ছাত্রদল কার্যক্রম চালু হলো। তারা মিছিল, সভা, বিতর্ক—সবকিছুতে সক্রিয় হয়ে উঠল।
তার মনোবল, সাহস, আপসহীন নীতি—এগুলো দেখিয়েছে দেশের মানুষকে, সত্যিই একজন নেতা কীভাবে গণতন্ত্রের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে।
গ্রেপ্তার এবং নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি পরীক্ষা—সবই তার নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে। দেশজুড়ে তার নাম ছড়িয়ে গেছে। মানুষ বোঝে—এই নারী কেবল রাজনৈতিক নেতা নয়, গণতন্ত্রের প্রতীক।
এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ভয়কে জয় করলেই নেতা হয়ে ওঠা সম্ভব। আপসহীন নীতি এবং দৃঢ় মনোবলই রাজনৈতিক শক্তি।
তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী যে নারীর মতো সংযত, দৃঢ়চেতা এবং সাহসী হতে পারে, তার নেতৃত্ব শুধু নিজের জন্য নয়, গোটা জাতির জন্য প্রেরণা হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে তার এই সাহসিকতা এবং নেতৃত্বই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করল। গ্রেপ্তার এবং নির্যাতনের অধ্যায় কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায় নয়, এটি এক নারীর অদম্য সাহস, দৃঢ়তার এবং দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প।
চলবে……….