গ্রামের মানুষ তাকে এখন আর আগের মতো ডাকে না। কেউ নাম ধরে ডাকলেও সেই ডাকের মধ্যে আর আগের উষ্ণতা নেই। যেন পরিচিত মুখের আড়ালে অচেনা এক দূরত্ব জমে উঠেছে। কুদ্দুস এসব বুঝতে শেখেছে অনেক আগেই।
এক সময় গ্রামের চায়ের দোকানে গেলে সবাই তার পাশে বসাত। গল্প করত, খোঁজখবর নিত। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরতে বেশি সময় লাগে না। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য জমি নদীগর্ভে বিলীন হলো, ব্যবসায় লোকসান হলো, তারপর একের পর এক বিপদ এসে তার সংসারের দরজায় কড়া নাড়তে লাগল। আজ কুদ্দুসের হাতে টাকা নেই, ভালো চাকরি নেই, সমাজে প্রভাব নেই। আর এই তিনটি জিনিস না থাকলে মানুষ কত দ্রুত একা হয়ে যায়, তা সে নিজের জীবন দিয়েই শিখেছে।
চায়ের দোকানে এখনো সে যায়। কিন্তু আগের সেই বেঞ্চে আর কেউ তাকে বসতে বলে না। সে নিজে গিয়ে বসলেও অনেকে অজুহাত খুঁজে উঠে যায়। কেউ চোখ ফিরিয়ে নেয়, কেউ ব্যস্ততার ভান করে। যেন তার দারিদ্র্য কোনো সংক্রামক রোগ, যা ছুঁয়ে গেলে সম্মান কমে যাবে।
কুদ্দুস এসব দেখে কষ্ট পায়। তবে মুখে কিছু বলে না। কারণ সে জানে, অভাবের যন্ত্রণা যতটা নয়, আপন মানুষের অবহেলা তার চেয়ে অনেক বেশি নির্মম।
একদিন সন্ধ্যায় বাজার থেকে ফিরছিল কুদ্দুস। পথে দেখা হলো তার স্কুলজীবনের বন্ধু রশিদের সঙ্গে। একসময় দুজন একসঙ্গে পড়াশোনা করত, একই স্বপ্ন দেখত। এখন রশিদ বড় ব্যবসায়ী।
— কেমন আছিস কুদ্দুস?
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
রশিদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর বলল,
— তুই এখন কী করিস?
কুদ্দুস মুচকি হেসে বলল,
— কাজ খুঁজছি। ছোটখাটো কিছু করি।
রশিদ মাথা নেড়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় তার চোখে এমন এক দৃষ্টি ছিল, যা কুদ্দুসকে অনেকক্ষণ তাড়া করে বেড়াল। সেই দৃষ্টিতে সহানুভূতির চেয়ে করুণা বেশি ছিল।
সেদিন রাতে কুদ্দুস ঘুমাতে পারেনি। মায়ের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল।
“বাবা বলতো, মানুষের কাছে বড় হতে যাস না। আল্লাহর কাছে বড় হওয়ার চেষ্টা কর।”
মা এখন বেঁচে নেই। কিন্তু তার দোয়া যেন এখনো কুদ্দুসকে আগলে রাখে।
দিন যেতে লাগল। কুদ্দুস লক্ষ্য করল, শুধু অবহেলাই নয়, তার বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য ষড়যন্ত্রও শুরু হয়েছে। কিছু নব্য প্রভাবশালী লোক তাকে নিয়ে নানা কথা ছড়াতে লাগল।
কেউ বলল, “কুদ্দুস নাকি পাগল হয়ে গেছে।”
কেউ বলল, “ওর সঙ্গে মিশলে সমস্যা হবে।”
কেউ আবার বলল, “ও সমাজের জন্য ভালো নয়।”
কুদ্দুস অবাক হয়ে ভাবত, সে তো কারও ক্ষতি করেনি। তাহলে মানুষ তার বিরুদ্ধে এত বিষ কেন ছড়াচ্ছে?
একদিন গ্রামের এক অনুষ্ঠানে সে গেল। অনুষ্ঠানটি ছিল এলাকার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা সভা। কুদ্দুস চুপচাপ পেছনের দিকে বসেছিল। হঠাৎ একজন বলে উঠল,
— এখানে সবাই সম্মানিত মানুষ বসেছে। কিছু লোকের আসলে এসব জায়গায় আসা উচিত না।
কথাটা সরাসরি কুদ্দুসকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছিল।
চারপাশে হাসির রোল উঠল।
কুদ্দুস মাথা নিচু করল। কিন্তু তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলতে লাগল।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
নিজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই দুর্বল নস। তোর টাকা নেই, কিন্তু আত্মসম্মান আছে। তোর ক্ষমতা নেই, কিন্তু সাহস আছে। তুই হারবি না।”
সেদিন থেকেই তার জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
সে প্রতিশোধ নিতে চাইল। তবে সেই প্রতিশোধ ছিল না কারও ক্ষতি করার। ছিল নিজের অবস্থান তৈরি করার প্রতিশোধ।
যারা তাকে অপমান করেছে, তাদের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রতিশোধ।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে কাজ খুঁজতে বের হতো। কেউ ফিরিয়ে দিত, কেউ তাড়িয়ে দিত। কিন্তু সে থামত না।
একদিন শহরের এক প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী কাজ পেল। বেতন খুব কম। তবু সে মন দিয়ে কাজ করতে লাগল।
অন্যরা যখন সময় নষ্ট করত, কুদ্দুস তখন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করত।
সাত বছর কেটে গেল।
যে মানুষটিকে একসময় সবাই ব্যর্থ বলত, সে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করল।
তার সততা ও পরিশ্রমের কারণে প্রতিষ্ঠানের মালিক তার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করলেন।
আরেক বছর পরে কুদ্দুস পদোন্নতি পেল।
এরপর আরও কয়েক বছর।
একদিন সেই কুদ্দুসই একটি ছোট ব্যবসার মালিক হলো।
যদিও সে ধনী হয়নি, কিন্তু স্বাবলম্বী হয়েছে।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটল তখন, যখন মানুষ আবার তাকে খুঁজতে শুরু করল।
যারা একসময় তার পাশে বসতে চাইত না, তারাই এখন চায়ের দোকানে তাকে ডেকে বসায়।
যারা তাকে পাগল বলেছিল, তারাই এখন বলে,
— কুদ্দুস খুব বুদ্ধিমান মানুষ।
যারা তাকে সমাজ থেকে দূরে সরাতে চেয়েছিল, তারাই এখন অনুষ্ঠানের প্রথম সারিতে বসার আমন্ত্রণ জানায়।
কুদ্দুস শুধু হাসে।
কারণ সে জানে, মানুষ বদলায়। পরিস্থিতি বদলালে মানুষের ব্যবহারও বদলে যায়।
একদিন রশিদ তার অফিসে এল।
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বলল,
— কুদ্দুস, তোকে আমি ভুল বুঝেছিলাম।
কুদ্দুস মৃদু হেসে বলল,
— সমস্যা নেই। মানুষ ভুল করতেই পারে।
রশিদের চোখ নিচু হয়ে গেল।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে কুদ্দুস আকাশের দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ হলো সফলতা নয়, বরং নিজেকে হারিয়ে না ফেলা।
যারা তাকে ভাঙতে চেয়েছিল, তারা পারেনি।
যারা তাকে ছোট করতে চেয়েছিল, তারা ব্যর্থ হয়েছে।
যারা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছিল, তারা আজ নিজেদের কথার কাছেই পরাজিত।
কুদ্দুস কখনো তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেনি। কারও ক্ষতি করার চেষ্টা করেনি। কারণ সে বুঝেছিল, প্রতিহিংসা মানুষকে সাময়িক শান্তি দিতে পারে, কিন্তু সম্মান এনে দিতে পারে না।
তার প্রতিশোধ ছিল নিজের উন্নতি।
তার জবাব ছিল পরিশ্রম।
তার অস্ত্র ছিল ধৈর্য।
আর তার শক্তি ছিল আল্লাহর ওপর অটুট বিশ্বাস।
গ্রামের মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে একদিন কুদ্দুস ভাবছিল, জীবনের পথ কত অদ্ভুত। যেদিন সবাই তাকে ছেড়ে গিয়েছিল, সেদিন যদি সে ভেঙে পড়ত, তাহলে আজকের দিনটি দেখত না।
দারিদ্র্য তাকে কষ্ট দিয়েছে, অপমান তাকে আহত করেছে, মানুষের অবহেলা তার হৃদয় ভেঙেছে। কিন্তু এসবই তাকে আরও শক্ত করেছে।
আজও সে সাধারণ জীবনযাপন করে।
আজও সে মাটির কাছাকাছি থাকে।
কারণ সে জানে, মানুষকে বড় করে টাকা নয়, চরিত্র।
সমাজের সম্মান নয়, আত্মসম্মান।
অন্যের প্রশংসা নয়, নিজের সততা।
কুদ্দুসের গল্প এখানেই শেষ নয়। সে এখনো চলছে।
যারা একসময় তার পথ বন্ধ করতে চেয়েছিল, তারা থেমে গেছে।
কিন্তু কুদ্দুস থামেনি।
তার চোখে এখনো স্বপ্ন আছে।
তার হৃদয়ে এখনো সাহস আছে।
তার কণ্ঠে এখনো সেই দৃঢ় উচ্চারণ—
“আমি কারও করুণায় বাঁচতে চাই না। আমি মানুষের মতো বাঁচতে চাই। আমার পথ আমি নিজেই তৈরি করব। আমার ভরসা একমাত্র মহান আল্লাহ। গন্তব্য যত দূরেই হোক, আমি থামব না। আমি চলব, আর চলতেই থাকব।”
সমাপ্ত।।