পর্ব–৫
রাত আড়াইটা।
এই সময়টাতে এখন আর শুধু হ্যারির ফোন আসে না—ঐশির ভেতরের ভয়ও জেগে ওঠে।
এতদূর এসে গেছে বিষয়টা। হ্যারি বাংলাদেশে আসবে—এই কথা এখন আর নিছক স্বপ্ন নয়, বাস্তবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই পুরো ঘটনাটা এতদিন শুধু ঐশির বুকের ভেতর বন্দী ছিল। মা-বাবা কিছুই জানতেন না।
সেদিন বিকেলে হঠাৎ তার মনে হলো—আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।
একটা সম্পর্ক যদি বিয়ের দিকে যায়, তাহলে পরিবারের জানাটা জরুরি। না হলে সে নিজেই নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকবে।
বিকেলের আলো ঘরের ভেতর নরম হয়ে ঢুকছিল। মা রান্নাঘরে, বাবা বারান্দায় খবরের কাগজ পড়ছেন। ঐশির বুক কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনো অপরাধ স্বীকার করতে যাচ্ছে।
সে ধীরে গিয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াল।
“মা, একটা কথা বলবো?”
মা হাসলেন, “কী রে? এত সিরিয়াস কেন?”
ঐশি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“জার্মানির যে ছেলেটার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে… ও আমাকে খুব পছন্দ করে। এখন ও বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছে। তোমরা কী বলো?”
মা প্রথমে অবাক হলেন, তারপর মুখে ধীরে ধীরে একরকম উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল।
“জার্মানি? বিদেশি ছেলে? সত্যি?”
ঐশি মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
মায়ের চোখে তখন যেন স্বপ্নের আলো।
“ভালো হলে তো মন্দ কী! মেয়ের ভাগ্য খুলে যাবে।”
এই ‘ভাগ্য খুলে যাবে’ কথাটা ঐশির বুকের ভেতর হালকা ধাক্কা দিল।
তার কি সত্যিই ভাগ্য খুলবে? নাকি নতুন এক অজানা অধ্যায় শুরু হবে?
এবার বাবা কাগজ ভাঁজ করে উঠে এলেন। তার চোখে উচ্ছ্বাস নয়—ছিল চিন্তার রেখা।
“তোর চিন্তাভাবনা কী? খোলাখুলি বল।”
ঐশি বাবার সামনে বসে পড়ল। তার গলা শুকিয়ে আসছিল।
“ও আমাকে অনেক পছন্দ করে ফেলেছে। এখন আমিও ওকে পছন্দ করি। ও যদি বাংলাদেশে আসে, যদি আমাকে বিয়ে করতে চায়—তাহলে কি করবো?”
ঘরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল।
বাবা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন তার চোখের ভেতর সত্য খুঁজছেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“ভিনদেশি ছেলে তোকে পছন্দ করতে পারে। তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু তোদের বিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে?”
ঐশির বুক ধক করে উঠল।
“কেন, বাবা?”
বাবা গভীর শ্বাস নিলেন।
“তুই কি তাকে চেনিস? তার পরিবার? তার অতীত? তার জীবনযাপন? দূর থেকে ভালো লাগা আর কাছ থেকে সংসার করা এক কথা না।”
ঐশির মাথা নিচু হয়ে গেল।
সে কি সত্যিই হ্যারিকে চেনে?
তার মনে পড়ে যায় রাত আড়াইটা। ভিডিও কলের আলো। নিজের অস্বস্তি।
সে কি সেই মানুষটার ওপর জীবনভর ভরসা করতে পারবে?
মা তখন বললেন,
“দেখো, এখনকার যুগে বিদেশে বিয়ে করাটা অস্বাভাবিক কিছু না। ছেলে যদি ভালো হয়…”
বাবা মায়ের কথা কেটে দিলেন না, কিন্তু ধীরে বললেন,
“ভালো হওয়া মানে কী? টাকার পরিমাণ দিয়ে ভালো মানুষ মাপা যায় না।”
এই কথাটা ঐশির হৃদয়ে গিয়ে লাগল।
সে জানে, তার ভেতরে বিদেশের ঝলকানি কাজ করেছে।
পরিষ্কার রাস্তা, সচ্ছল জীবন—এই স্বপ্নগুলো তাকে টেনেছে।
কিন্তু বাবার চোখে সে দেখল ভয়।
মেয়েকে হারানোর ভয়।
অজানা দেশে পাঠানোর ভয়।
বাবা আবার বললেন,
“ও কি আমাদের সাথে কথা বলেছে?”
ঐশি মাথা নাড়ল।
“না।”
“তাহলে আগে ওকে আসতে দে। আমরা দেখবো, কথা বলবো। সবকিছু যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”
ঐশির মনে হলো, বাবার কণ্ঠে কঠোরতা নেই—আছে দায়িত্ব।
রাত নামল।
ঘড়ির কাঁটা আবার আড়াইটায় এসে থামল।
ঐশি বিছানায় শুয়ে আছে। মায়ের উচ্ছ্বাস, বাবার সন্দেহ—দুটোই তার মাথার ভেতর ঘুরছে।
হ্যারি মেসেজ পাঠিয়েছে—
“হ্যাভ ইউ টোল্ড দেয়েম?”
“আই ওয়ান্ট টু মিট ইউর পেরেন্টস।”
ঐশি উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, বলেছি। তারা তোমার সাথে কথা বলতে চায়।”
কিছুক্ষণ পর হ্যারির রিপ্লাই—
“নো প্রবলেম। আই’ম রেডি।”
কিন্তু ঐশির মনে অদ্ভুত অস্বস্তি।
সে কি সত্যিই প্রস্তুত তার বাবা-মায়ের সামনে এই সম্পর্ক দাঁড় করাতে?
তার বাবার কথা আবারও কানে বাজল—
“দূর থেকে ভালো লাগা আর সংসার এক না।”
ঐশি জানালার বাইরে তাকাল।
দূরে মসজিদের মিনার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। শহর নিস্তব্ধ।
সে বুঝতে পারছে, তার জীবন এখন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে।
একদিকে বিদেশের স্বপ্ন, অন্যদিকে পরিবারের সতর্কতা।
সে কি স্বপ্নের পেছনে ছুটবে?
নাকি বাবার আশঙ্কার ভেতর লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেবে?
তার চোখে জল এসে গেল।
ভালোবাসা কি এত কঠিন হওয়া উচিত?
রাত আড়াইটা আবারও সাক্ষী হলো—একটি মেয়ের দ্বিধা, পরিবারের ভালোবাসা আর অজানা ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাহসের।
আগামী দিনেই হয়তো হ্যারি সত্যিই আসবে।
তখন কি এই সম্পর্ক আলোয় ভাসবে, নাকি অন্ধকারে ডুবে যাবে?
ঐশি জানে না।
শুধু জানে—এইবার সিদ্ধান্ত শুধু তার একার নয়। এখন এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে তার পরিবারের সম্মান, বিশ্বাস আর ভালোবাসা।
রাত আড়াইটা ধীরে ধীরে ভোরের দিকে এগোয়।
কিন্তু ঐশির জীবনের ভোর কবে হবে—তার উত্তর এখনও অজানা।
চলবে...........