শেষ পর্ব
আজ কুদ্দুছ মায়াকে মনে করে সময় পার করে। কিন্তু কুদ্দুছের সময় শেষ। হয়তো আর বেশিদিন তিনি নেই। নিজের আশা নিজেই ছেড়ে দিয়েছে কুদ্দুছ।
শহরের এক কোণে, ছোট্ট নিঃশব্দ ঘরে বসে কুদ্দুছ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। সময় যেন তার কাছে আর কোনো অর্থ বহন করে না। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, দিন বদলাচ্ছে—কিন্তু তার জীবনের গল্প যেন থেমে আছে এক জায়গাতেই।
মায়ার স্মৃতিতে।
আজকাল সে খুব বেশি বাইরে যায় না। শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকের ভেতরটা প্রায়ই চাপা পড়ে আসে। ডাক্তাররা বলে—সাবধানে থাকতে। কিন্তু কুদ্দুছ জানে, এই সাবধানতার কোনো মানে নেই।
কারণ সে নিজেই নিজের আশা ছেড়ে দিয়েছে।
একসময় সে বাঁচতে চাইতো—মায়ার জন্য। তার সাথে একটা ভবিষ্যৎ কল্পনা করতো। কিন্তু এখন সেই ভবিষ্যৎ নেই। স্বপ্ন নেই। শুধু কিছু স্মৃতি আছে—যেগুলো তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছে।
সকালে ঘুম ভাঙতেই সে প্রথমে জানালার বাইরে তাকায়। আকাশ দেখে। কখনো মেঘলা, কখনো পরিষ্কার। কিন্তু তার ভেতরের আকাশ সবসময়ই ধূসর।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসে। চা বানায়। সেই একই কাপ—যেটা একসময় মায়া হাতে নিয়ে বলেছিল,
“এই কাপটা শুধু আমার।”
কুদ্দুছ আজও সেই কাপটাই ব্যবহার করে।
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সে যেন অতীতে ফিরে যায়।
মায়ার হাসি, তার কণ্ঠ, তার চোখ—সবকিছু আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
“তুমি কি আমাকে ভুলে যাবে?”—মায়ার সেই প্রশ্নটা এখনও কানে বাজে।
কুদ্দুছ মৃদু হেসে বলে,
“আমি তো নিজেকেই ভুলে গেছি… তোমাকে কীভাবে ভুলবো?”
দিনগুলো এভাবেই কেটে যায়।
কখনো সে পুরোনো ডায়েরি খুলে পড়ে। নিজের লেখা শব্দগুলো পড়ে অবাক হয়—এগুলো কি সত্যিই তার লেখা?
প্রতিটি লাইনে আছে এক গভীর ভালোবাসা, এক অসীম কষ্ট।
একদিন বিকেলে হঠাৎ তার শরীরটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বুকের ভেতরটা যেন কেউ চেপে ধরেছে।
সে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
চারপাশে কেউ নেই।
এই নিঃসঙ্গতাটা আজ আর তাকে ভয় দেখায় না। বরং এটাই তার সবচেয়ে পরিচিত সঙ্গী।
সে চোখ বন্ধ করলো।
মনে হলো, ধীরে ধীরে সবকিছু দূরে সরে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই—একটা পরিচিত অনুভূতি।
কেউ যেন তার পাশে বসেছে।
সে চোখ খুললো।
মায়া।
ঠিক আগের মতোই—মৃদু হাসি, শান্ত চোখ।
কুদ্দুছ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।
“তুমি এসেছো?”—তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
মায়া ধীরে মাথা নাড়লো।
“হ্যাঁ… এবার আর যেতে দেবো না।”
কুদ্দুছের চোখ ভিজে উঠলো।
“আমি খুব ক্লান্ত মায়া…”
“জানি…”—মায়া তার হাতটা ধরলো।
এই স্পর্শটা এত বাস্তব, এত উষ্ণ—যেন কোনোদিন হারায়নি।
“আমি তোমাকে অনেক খুঁজেছি…”—কুদ্দুছ বললো।
মায়া মৃদু হেসে বললো,
“আমি তো সবসময়ই তোমার ভেতরেই ছিলাম।”
কুদ্দুছ চোখ বন্ধ করলো।
তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে।
মনে হচ্ছে, সেই দীর্ঘদিনের কষ্টগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে।
“আমরা কি আবার একসাথে হতে পারবো?”—সে আস্তে জিজ্ঞেস করলো।
মায়া তার কপালে হাত রেখে বললো,
“এইবার আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না…”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
বাইরে হালকা বাতাস বইছে।
জানালার পর্দা নড়ছে ধীরে ধীরে।
কুদ্দুছের শ্বাস ক্রমশ ধীর হয়ে আসছে।
তার ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটে উঠলো।
এই হাসিতে আর কোনো কষ্ট নেই—শুধু শান্তি।
তার শেষ নিঃশ্বাসটা যেন মায়ার হাতের স্পর্শে মিশে গেল।
সবকিছু থেমে গেল।
সময়ের গতি থেমে গেল।
একটা গল্প শেষ হলো।
কিন্তু ভালোবাসা শেষ হলো না।
পরদিন সকালে দরজা না খোলায় প্রতিবেশীরা এসে দেখে—কুদ্দুছ নিঃশব্দে শুয়ে আছে।
তার মুখে এক অদ্ভুত শান্তি।
যেন সে কোনো কষ্ট ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়েছে।
তার পাশে খোলা ডায়েরি।
শেষ পাতায় লেখা—
“মায়া,
আমি আসছি…”
মানুষজন জড়ো হলো, আলোচনা হলো—কেউ জানলো না তার ভেতরের গল্প।
কেউ জানলো না, কতটা ভালোবাসা নিয়ে সে বেঁচে ছিল, কতটা কষ্ট নিয়ে সে চলে গেল।
কিন্তু কোথাও, কোনো এক অদৃশ্য জগতে—
হয়তো কুদ্দুছ আর মায়া আবার দেখা করেছে।
হয়তো তারা আবার সেই প্রথম দিনের মতো—এক কাপ চা নিয়ে বসেছে।
হয়তো এবার তাদের গল্পের শেষ নেই।
শুধু শুরু।
সমাপ্ত।