পুলিশ বাহিনীতে এক সহকর্মীর প্রতি অন্য সহকর্মীর অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন সাবেক ও কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা। বদলি, পদায়ন কিংবা পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হলেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুককে ব্যবহার করছে অপপ্রচার ও মানসিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে নয়, মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমন, তদন্ত কার্যক্রম এবং বাহিনীর সামগ্রিক কার্যকারিতার ওপরও পড়ছে।
গত এক মাসে সাবেক ও কর্মরত অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য উঠে এসেছে। আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অধিকাংশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন।
একজন সাবেক পুলিশপ্রধান বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর ভেতরে বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তার ভাষায়, একটি অংশকে অবিশ্বাসের চোখে দেখা হচ্ছে, অন্য অংশ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত। ফলে নেতৃত্ব, সমন্বয় ও জবাবদিহিতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক পুলিশ সপ্তাহেও সদস্যদের দায়িত্ব পালনে আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে—এমন কোনো সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়নি।
তার মতে, অতীতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে অনেক পুলিশ সদস্য আইনি জটিলতায় পড়েছেন। বর্তমানে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে কি না—এই অনিশ্চয়তা মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে ভীতি তৈরি করেছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও যদি সদস্যরা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত না হন, তাহলে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে ওসি, এসআই ও কনস্টেবলরা সরাসরি দায়িত্ব পালন করেন এবং তাদের নির্দেশনা দেন এএসপি থেকে এসপি পর্যায়ের কর্মকর্তারা। কিন্তু কোনো অভিযানে ভুল হলে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট নীতিমালা নেই।
বদলি-পদোন্নতিতে ফেসবুকভিত্তিক অপপ্রচার
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, কোনো কর্মকর্তার বদলি বা পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হলেই একটি চক্র তার অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে অতিরঞ্জিত কিংবা বানোয়াট তথ্য সংবলিত তথাকথিত ডসিয়ার তৈরি করে। পরে সেগুলো দেশের বাইরে অবস্থানরত কিছু অ্যাক্টিভিস্টের কাছে পাঠানো হয়। তাদের পরিচালিত ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এসব তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, এর উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মানসিক চাপে ফেলে তার পদায়ন বা পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত করা।
আরও জানা গেছে, বদলি বা পদায়নের আগেই সংবেদনশীল প্রশাসনিক তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কোথায় কে বদলি হচ্ছেন, কোন কর্মকর্তার ফাইল কতদূর অগ্রসর হয়েছে কিংবা কার বিরুদ্ধে অতীতে প্রশাসনিক তদন্ত ছিল—এসব তথ্য বাহিনীর ভেতরের একটি অংশ বিভিন্ন মাধ্যমে বাইরে পাচার করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “আগে প্রশাসনিক জবাবদিহির ভয় ছিল, এখন ফেসবুকের ভয় বেশি। কে কখন কার বিরুদ্ধে কী পোস্ট করাবে কিংবা কোন তথ্য ফাঁস হবে—এই আশঙ্কায় অনেক কর্মকর্তা রুটিন দায়িত্ব পালনেও দ্বিধায় থাকেন। ফলে কঠোর ও পেশাদার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস কমে যাচ্ছে।”
তার ভাষ্য, অপপ্রচারের সঙ্গে কারা জড়িত, তা অনেকেই অনুমান করতে পারলেও প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে চান না। কারণ, অভিযোগ তুললেই পরদিন ব্যক্তিগত তথ্য বা মিথ্যা অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
শৃঙ্খলা ও আস্থার সংকট
একজন সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, একটি শৃঙ্খলাবাহিনী পারস্পরিক আস্থা, পেশাদারিত্ব এবং চেইন অব কমান্ডের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সহকর্মীরা যদি একে অপরের বিরুদ্ধে ফেসবুককে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে বাহিনীর নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
তার মতে, পুলিশ সদর দপ্তরের আইটি ও সাইবার ইউনিটকে আরও কার্যকর করে তথ্য পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে শুধুমাত্র ফেসবুক পোস্ট বা বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে বদলি, পদায়ন বা পদোন্নতির সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি। যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে হবে।
অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক এই ভীতি মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমন কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে। বাহিনীতে একাধিক বলয় সক্রিয় থাকায় অনেক সদস্য সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। কোন নির্দেশ অনুসরণ করবেন বা কোনো অভিযানের পর কোন পক্ষ তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাবে—এই আশঙ্কায় অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। এর ফলে মাদকবিরোধী অভিযান, স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত এবং গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয়ের গতি কমে যাচ্ছে।
টুরিস্ট পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসান বলেন, এসব সংকট মোকাবিলায় পুলিশ সদর দপ্তর উদ্যোগ নিয়েছে এবং টুরিস্ট পুলিশও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার শুধু পুলিশের জন্য নয়, সাংবাদিকসহ সব পেশার মানুষের জন্যই ক্ষতিকর।
বিভক্তি ও রাজনৈতিক ট্যাগিং
একাধিক পুলিশ সুপার জানান, আগে বাহিনীর একটি অংশকে বিএনপি-জামায়াতঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো, আর এখন অনেককে “ফ্যাসিস্টের দোসর” আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন পেশাগত কাজের ভিত্তিতে নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার-প্রচারণার ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি সংসদে দাবি করেছেন, আগের ১০ থেকে ১৫ বছরের তুলনায় বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে এবং পুলিশের ভাবমূর্তি বেড়েছে। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন চিত্রও উঠে এসেছে।
বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেট
পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আগের প্রভাববলয় ভেঙে নতুন কয়েকটি গোষ্ঠী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মতের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত হলে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি, পেজ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়।
সংকট উত্তরণের প্রস্তাব
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) ডেল এইচ খান বলেন, পুলিশের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি ও পদোন্নতি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। তবে বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ দলীয় পরিচয়নির্ভর মূল্যায়ন এবং পেশাদারিত্বের ঘাটতি। তার মতে, সরকারকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে যে, বাহিনীর কোনো সদস্য দলীয় পরিচয়ে সুবিধা পাবেন না এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক সুপারিশে বদলি বা পদোন্নতি হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনী গভীর ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে শুধু বাহিনীকে দোষারোপ না করে সরকারকে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, সব সদস্যকে একসঙ্গে দোষারোপ না করে যারা ব্যক্তিস্বার্থে লবিং, অপপ্রচার বা বিভক্তি তৈরি করছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তার মতে, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পুলিশ বাহিনীতে আস্থা ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।