কত দিন, কত রাত এই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকি—মিতু নিজেও জানে না। সময় যেন তার কাছে থেমে গেছে। দিনের পর দিন কেটে যায়, রাতের পর রাত নিঃশব্দে ভোর হয়, অথচ তার অপেক্ষার কোনো শেষ হয় না।
জানালার ওপাশে শুধু গাছপালা, আকাশ আর দূরের কিছু আলো চোখে পড়ে। বিকেলের নরম রোদ গাছের পাতায় এসে পড়ে, সন্ধ্যায় পাখিরা ফিরে যায় আপন নীড়ে, আর রাত নামলে আকাশ ভরে ওঠে অসংখ্য নক্ষত্রে। কিন্তু মিতুর চোখ যেন এসবের কিছুই দেখে না। তার চোখ খুঁজে ফেরে একজনকে—নয়ন।
কখনো কখনো হঠাৎ তার মনে হয়, কেউ যেন আসছে।
দূর থেকে ভেসে আসে পায়ের শব্দ।
মিতুর বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
“নয়ন?”
সে ছুটে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে শোনে। শব্দটা যেন ধীরে ধীরে কাছে আসছে। মনে হয়, এই বুঝি দরজায় কড়া নাড়বে। এই বুঝি পরিচিত কণ্ঠে ডাকবে—
“মিতু...”
কিন্তু না।
কেউ আসে না।
শুধু বাতাস এসে জানালার পর্দা দুলিয়ে দিয়ে চলে যায়।
মিতু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখের সামনে তখনও নয়নের মুখ।
নয়ন—যে একদিন বলেছিল, “আমি তোমাকে কখনো একা রেখে যাব না।”
সেই কথাটাই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
কিন্তু মানুষ কখনো কখনো নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতির চেয়েও দূরে চলে যায়।
নয়নও চলে গেছে।
অনেক দূরে।
কত দূরে, মিতু জানে না। শুধু জানে, সেই দূরত্ব তার হৃদয়ের ভেতরে প্রতিদিন আরও বড় হয়ে উঠছে।
সেদিন রাতটা ছিল অদ্ভুত নীরব।
বাড়ির সবাই অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা, যেন পৃথিবীর সব শব্দ কোথাও গিয়ে হারিয়ে গেছে। শুধু মাঝে মাঝে দূরে কোনো কুকুরের ডাক, আর জানালার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসের মৃদু শব্দ।
মিতুর ঘুম আসছিল না।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন তাকে ডাকছে।
“মিতু...”
সে চমকে উঠে বসে।
কণ্ঠটা খুব পরিচিত।
অত্যন্ত পরিচিত।
এই কণ্ঠ সে হাজার মানুষের ভিড়েও চিনে নিতে পারবে।
নয়ন!
মিতু ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গেল।
জানালার বাইরে চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে। লাউয়ের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে উঠোনটাকে অদ্ভুত সুন্দর করে তুলেছে। গাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতিও যেন কোনো অদৃশ্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।
মিতু জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে রইল।
“নয়ন?”
কোনো উত্তর নেই।
আবার মনে হলো, কেউ যেন খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
চারপাশে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু চাঁদের আলো।
শুধু গাছের ছায়া।
শুধু রাতের নিস্তব্ধতা।
মিতু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার জানালার কাছে ফিরে এল।
তার মনে হলো, হয়তো সে ভুল শুনেছে।
হয়তো দীর্ঘ অপেক্ষা আর একাকীত্ব তার কানে নয়নের কণ্ঠস্বর এনে দিয়েছে।
কিন্তু হৃদয় তো যুক্তির কথা শোনে না।
হৃদয় বিশ্বাস করতে চায়—নয়ন আসবে।
অবশ্যই আসবে।
আজ না হয় কাল।
কাল না হয় পরশু।
কোনো এক রাতে, হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়বে নয়ন। মিতু দরজা খুলে দেখবে, সেই পরিচিত মুখটি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তখন সে হয়তো কিছুই বলবে না।
শুধু নয়নের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদবে।
অনেক দিনের জমে থাকা কান্না।
অনেক রাতের অপেক্ষা।
অনেক না বলা কথা।
নয়ন আর মিতু এমন ছিল না।
পাড়ার সেই পুরোনো রাস্তা, বিকেলের হাওয়া, ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা—সবকিছুর মধ্যেই ধীরে ধীরে তাদের ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল।
প্রথমে বন্ধুত্ব।
তারপর অভ্যাস।
তারপর একে অপরকে ছাড়া দিন কল্পনা করতে না পারা।
মিতু যখন মন খারাপ করত, নয়ন বুঝে যেত।
নয়ন চুপ করে থাকলে মিতু বুঝত, তার ভেতরে কোনো ঝড় চলছে।
তাদের ভালোবাসায় বড় কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। ছিল ছোট ছোট যত্ম।
“খেয়েছ?”
“এত রাতে জেগে আছ কেন?”
“মন খারাপ?”
“আমি আছি তো।”
এই ছোট্ট কথাগুলোই ছিল তাদের পৃথিবী।
কিন্তু পৃথিবী সবসময় মানুষের ইচ্ছেমতো চলে না।
একদিন নয়নকে চলে যেতে হলো।
দূর শহরে।
নতুন জীবনের সন্ধানে।
বিদায়ের দিন মিতু অনেক কাঁদতে চেয়েও কাঁদেনি। শুধু বলেছিল,
“ফিরে আসবে তো?”
নয়ন মিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
“অবশ্যই ফিরব।”
“কবে?”
নয়ন মৃদু হেসেছিল।
“যেদিন তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না।”
মিতু সেদিন হেসেছিল।
সে জানত না, সেই হাসির আড়ালে একদিন এত দীর্ঘ অপেক্ষা লুকিয়ে থাকবে।
নয়ন চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা দিন মিতুর কাছে খুব কঠিন ছিল। তারপর সে অভ্যস্ত হয়ে গেল অপেক্ষা করতে।
প্রতিদিন ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকা।
প্রতিটি অচেনা নম্বরে বুক ধড়ফড় করা।
রাত হলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।
কখনো কোনো গাড়ির শব্দ শুনে মনে হতো, নয়ন এসেছে।
কখনো রাস্তার মোড়ে কোনো ছায়ামূর্তি দেখে মনে হতো, এই বুঝি সে।
কিন্তু প্রতিবারই ভুল।
দিন গড়িয়েছে।
মাস পেরিয়েছে।
তারপর ঋতু বদলেছে।
বসন্ত এসেছে, বর্ষা এসেছে, শরৎ পেরিয়ে শীত এসেছে।
কিন্তু নয়ন আসেনি।
তারপর একদিন ফোনটাও বন্ধ হয়ে গেল।
মিতু অনেকবার চেষ্টা করেছিল।
কোনো উত্তর পায়নি।
কেউ জানত না নয়ন কোথায়।
কেউ বলতে পারেনি, সে কেন যোগাযোগ করছে না।
শুধু অপেক্ষাটা থেকে গেল।
একটি অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির মতো।
সেই রাতেও মিতু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে, সে জানে না।
চাঁদের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল।
রাত যেন শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তার চোখে ঘুম নেই।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
তবু সে জানালা থেকে সরে না।
মনে হচ্ছিল, নয়ন আজ আসবেই।
হয়তো এই রাতেই।
হয়তো এই মুহূর্তে।
হঠাৎ আবার পায়ের শব্দ।
মিতুর হৃদয় থেমে যাওয়ার মতো হলো।
সে জানালার বাইরে তাকাল।
একজন মানুষ দূরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
মিতু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
মানুষটি কাছে এলো।
তারপর রাস্তার বাঁকে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মিতুর চোখে পানি এসে গেল।
“তুমি নও...”
সে খুব আস্তে বলল।
তারপর নিজের অজান্তেই হাসল।
“আমি কেন প্রতিবার তোমাকেই দেখি?”
কেউ উত্তর দিল না।
শুধু বাতাস এসে তার চুল এলোমেলো করে দিল।
মিতু চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো, নয়ন যেন খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
সে যেন বলছে—
“মিতু, আমি তো এসেছি।”
মিতু চোখ খুলল।
কেউ নেই।
আবার সেই শূন্যতা।
আবার সেই অপেক্ষা।
হঠাৎ দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো।
“আল্লাহু আকবার...”
মিতু চমকে উঠল।
সে বুঝতে পারল, রাত শেষ হয়ে গেছে।
আর কিছুক্ষণ পরই ভোর হবে।
পূর্ব আকাশে হালকা আলো ফুটতে শুরু করেছে।
মিতু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ তখনও পথের দিকে।
কিন্তু নয়ন এল না।
একবারও না।
মিতু ধীরে ধীরে জানালার গ্রিল থেকে হাত সরিয়ে নিল।
তার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি আসোনি, নয়ন...”
কথাটা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
কিন্তু তার হৃদয় তখনও বিশ্বাস করতে চাইছিল না।
হয়তো আজ নয়।
হয়তো কাল।
হয়তো অন্য কোনো রাতে।
হয়তো কোনো এক ভোরের আগে নয়ন ফিরে আসবে।
কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে হারানোর পরও অপেক্ষা করতে শেখায়।
মিতু জানালা বন্ধ করল না।
সে জানত, জানালাটা খোলা থাকবে।
নয়নের জন্য।
তার ফিরে আসার জন্য।
তার সেই পরিচিত কণ্ঠের জন্য—
“মিতু...”
ভোরের আলো ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
পাখিরা ডাকতে শুরু করল।
নতুন একটি দিনের জন্ম হলো।
কিন্তু মিতুর কাছে দিনটি নতুন ছিল না।
কারণ তার প্রতিটি দিন একই অপেক্ষায় শুরু হয়।
আর প্রতিটি রাত শেষ হয় একই প্রশ্নে—
নয়ন কি কোনোদিন ফিরে আসবে?
উত্তর কেউ জানে না।
শুধু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিতু জানে—
অপেক্ষারও একটি ভালোবাসা আছে।
যে ভালোবাসায় মানুষ কাছে না থেকেও হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে থাকে।
যে ভালোবাসায় দেখা না হলেও চোখ পথ চেয়ে থাকে।
যে ভালোবাসায় কোনো প্রতিশ্রুতি না থাকলেও মন বিশ্বাস করে—
একদিন সে আসবে।
আর সেই বিশ্বাস নিয়েই মিতু প্রতিটি রাত পার করে।
প্রতিটি ভোরের অপেক্ষায় থাকে।
নয়নের অপেক্ষায়।
ভালোবাসার অপেক্ষায়। সমাপ্ত।।