ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। আকাশের গায়ে হালকা নীলচে ছোঁয়া, পাখিরা একটু একটু করে ডানা ঝাপটাতে শুরু করেছে। চারপাশে এক ধরনের শান্ত নীরবতা, যেন পৃথিবী একটু থেমে আছে। এই নীরবতার মাঝেই বিছানায় শুয়ে থাকা কুদ্দুছের বুকটা হালকা ভারী লাগছিল। বয়স খুব বেশি হয়নি, কিন্তু জীবন যেন তাকে অনেক আগেই ক্লান্ত করে ফেলেছে।
হঠাৎ করেই তার মনে হলো—যদি এই ভোরটাই হয় শেষ ভোর?
ভাবনাটা তাকে চমকে দিলেও অদ্ভুতভাবে ভয় পেল না সে। বরং বুকের ভেতর জমে থাকা অনেক না বলা কথা যেন একসাথে ভিড় করে উঠলো। মনে হলো, এতদিন যা বলতে পারেনি, তা আর কখনও বলা হবে না।
কুদ্দুছ উঠে বসলো। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। জীবনে সে অনেক কিছু পেয়েছে—টাকা, সম্মান, পরিচিতি—কিন্তু একটা জিনিস সবসময় হারিয়েছে, সেটা হলো মানুষের মন।
ছোটবেলায় সে এমন ছিল না। গ্রামের সেই কাঁচা রাস্তা, খোলা মাঠ, বন্ধুদের সাথে দৌড়ঝাঁপ—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের সরল আনন্দ। তখন সে হাসত, মানুষকে ভালোবাসত, আর সহজেই “দুঃখিত” বলতে পারত। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে যেন বদলে গেল সব।
শহরে এসে ব্যবসা শুরু করলো। প্রথমে ছোট, তারপর বড়। টাকার পরিমাণ বাড়লো, পরিচিতি বাড়লো, কিন্তু ধীরে ধীরে তার ভেতরের মানুষটা ছোট হয়ে গেল। সে কঠিন হতে শিখলো। ভুল হলেও “আমি ঠিক”—এই কথাটাই তার মুখে লেগে থাকত।
স্ত্রী রাশিদা একদিন বলেছিল,
—“মানুষকে একটু নরমভাবে কথা বলো কুদ্দুছ, সবাই তোমার কর্মচারী না।”
কুদ্দুছ তখন রাগ করে বলেছিল,
—“তুমি বুঝবে না, এই দুনিয়ায় নরম হলে টিকে থাকা যায় না।”
সেদিন রাশিদা চুপ করে গিয়েছিল। কিন্তু সেই চুপ করে যাওয়া কথাগুলো আজও যেন কুদ্দুছের কানে বাজে।
তার ছেলে সোহেল, একদিন পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে বলেছিল,
—“আব্বু, তুমি সবসময় রাগ করো কেন?”
সে উত্তর না দিয়ে শুধু বলেছিল,
—“তুই পড়াশোনা কর, অযথা কথা বলিস না।”
সোহেল আর কিছু বলেনি। কিন্তু সেদিন থেকেই বাবা-ছেলের মাঝে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
বন্ধুরা? একসময় ছিল অনেক। কিন্তু কুদ্দুছ যখন বড় হলো, তখন সে ভাবলো—বন্ধুদের আর দরকার কী? টাকা থাকলে সবকিছু পাওয়া যায়।
এক এক করে সবাই দূরে সরে গেল। কেউ ঝগড়া করে, কেউ চুপচাপ।
আজ এতদিন পর, এই ভোরে বসে কুদ্দুছ বুঝতে পারলো—সে আসলে একা।
তার ফোনে অনেক নাম্বার আছে, কিন্তু এমন একজন মানুষও নেই যাকে এখন ফোন করে বলা যায়—“আমার একটু ভয় লাগছে।”
বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠলো। সে ধীরে ধীরে টেবিলের কাছে গেল। একটা খাতা বের করলো। কলম হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।
তারপর লিখতে শুরু করলো—
“হয়তো কোন এক ভোরে হঠাৎ করে থেমে যাবে আমার নিঃশ্বাস। নীরব হয়ে যাবে সব অভিমান, সব না বলা কথা…”
লিখতে লিখতে তার হাত কাঁপছিল। চোখের কোণে জল জমে উঠছিল, কিন্তু সে থামেনি।
“যাদের সাথে প্রতিদিন কথা বলি, হয়তো তারা শুধু একটা কথাই শুনবে—কুদ্দুছ নেই…”
এই লাইনটা লিখে সে থেমে গেল। সত্যিই তো—একদিন হঠাৎ করেই মানুষটা নেই হয়ে যায়। থেকে যায় শুধু নাম, আর কিছু স্মৃতি।
কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো কেমন?
কুদ্দুছ নিজের মনে প্রশ্ন করলো—মানুষ তাকে কীভাবে মনে রাখবে?
একজন কঠিন মানুষ হিসেবে?
একজন অহংকারী?
নাকি একজন যে কাউকে ভালোভাবে কথা বলতে জানতো না? এমন মানুষ হিসাবে।
তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।
সে আবার লিখতে শুরু করলো—
“কত মানুষ আমার আচরণে কষ্ট পেয়েছে, কত মানুষ নীরবে দূরে সরে গেছে তার হিসাব নেই…”
প্রতিটা শব্দ যেন তার নিজের বুক থেকে বেরিয়ে আসছিল।
তার মনে পড়লো পাশের বাড়ির করিম চাচার কথা। একদিন সামান্য বিষয় নিয়ে তাকে অপমান করেছিল। করিম চাচা কিছু বলেননি, শুধু বলেছিলেন—
—“বাবা, কথা বলারও একটা আদব আছে।”
সেদিন সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।
আজ মনে হচ্ছে—কত বড় ভুল ছিল সেটা।
মনে পড়লো অফিসের সেই পুরনো কর্মচারী রহিমের কথা। সামান্য ভুলের জন্য তাকে সবার সামনে অপমান করে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিল।
রহিম কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল—
—“স্যার, আমার সংসারটা ভেঙে যাবে।”
কুদ্দুছ তখন বলেছিল—
—“আমার কিছু যায় আসে না।”
আজ সেই কথাগুলো তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
সে লিখলো—
“এখন মনে হচ্ছে এই ক্ষণিক জীবনের কত অহংকার। মানুষকে সহজে কত আঘাত করছি…”
লেখার সময় তার চোখ থেকে জল পড়ে কাগজ ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
সে বুঝতে পারছিল—ক্ষমা চাওয়া এত সহজ নয়। এটা শুধু একটা শব্দ না, এটা একটা স্বীকারোক্তি। নিজের ভুলকে মেনে নেওয়ার সাহস।
কুদ্দুছ কলম থামালো। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো।
তারপর আবার লিখলো—
“তাই চলে যাওয়ার আগে বলে যেতে চাই, কখনও কাউকে কোন সময় কোন কথায় বা আচরণে কষ্ট দিয়ে থাকি ক্ষমা করে দিও…”
তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু সে থামেনি।
“কারণ মৃত্যু এসে দরজায় কড়া নাড়ার আগে, কারো অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না…”
এই লাইনটা লিখে সে গভীর একটা শ্বাস নিলো।
মনে হলো বুকটা একটু হালকা হচ্ছে।
“আমি ক্ষমা চাই, বেশি করে ক্ষমা চাই সকলের কাছে…”
এই কথাটা লিখতে গিয়ে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। কান্নায় ভেঙে পড়লো।
এতদিনের জমে থাকা কঠিন মানুষটা যেন ভেঙে পড়লো এক মুহূর্তে।
সে লিখলো—
“জেনে না জেনে, অজ্ঞাতসারে, বুঝিয়া না বুঝিয়া যত অন্যায় করেছি, তার জন্যই ক্ষমা চাই…”
তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল একের পর এক মুখ—রাশিদা, সোহেল, রহিম, করিম চাচা, তার পুরনো বন্ধুরা…
সবাই যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে লিখলো—
“ভাই, বন্ধু, পাড়া প্রতিবেশী—সবাই ক্ষমা করো আমাকে…”
শেষ লাইনে এসে তার হাত থেমে গেল—
“চোখ বুঝলে কোন অহংকার থাকবে না। থাকবে শুধু নিরব, নিস্তব্ধ এক নিথর দেহ…”
কলমটা তার হাত থেকে পড়ে গেল।
কুদ্দুছ চুপ করে বসে রইলো।
বাইরে তখন সূর্য উঠে গেছে। আলো ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে।
কিন্তু তার ভেতরের অন্ধকারটা আজ একটু আলোকিত হয়েছে।
সে উঠে দাঁড়ালো।
প্রথমে গেল স্ত্রীর কাছে।
রাশিদা অবাক হয়ে তাকালো—
—“কি হয়েছে?”
কুদ্দুছ ধীরে বললো—
—“আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
রাশিদা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর তার চোখ ভিজে উঠলো।
তারপর সে ছেলের কাছে গেল।
সোহেল অবাক হয়ে বললো—
—“আব্বু?”
কুদ্দুছ তার মাথায় হাত রেখে বললো—
—“আমি তোমার সাথে ঠিকভাবে কথা বলিনি কখনও। আমাকে ক্ষমা করো।”
সোহেল কিছু বললো না, কিন্তু সে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো।
কুদ্দুছ বুঝতে পারলো—সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি এখনও।
সে ফোন বের করলো। একে একে পুরনো নাম্বারগুলোতে কল করতে লাগলো।
কেউ ধরলো, কেউ ধরলো না। কিন্তু সে থামেনি।
প্রতিটা কলেই একটাই কথা—
“ক্ষমা করে দাও।”
দিনটা কেটে গেল অন্যরকম এক অনুভূতিতে।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কুদ্দুছ সেই খাতাটা আবার খুললো।
লেখাগুলো দেখে তার চোখ ভিজে উঠলো।
সে বুঝলো—মৃত্যুর আগে ক্ষমা চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বেঁচে থাকতে বেঁচে থাকা অবস্থাতেই বদলে যাওয়া।
সে খাতাটা বন্ধ করলো।
বাইরে রাত নেমেছে।
কিন্তু তার ভেতরে আজ এক নতুন ভোরের শুরু।
আর সেই ভোরের নাম—ক্ষমা।