ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,
সময়: ০৫:১৫:৩১ PM

স্যারের মেয়ে পর্ব–২

মান্নান মারুফ
10-02-2026 03:34:18 PM
স্যারের মেয়ে পর্ব–২

পর্ব–২ : 

ভালোবাসা একদিন ভয়কে জয় করেই নেয়—
এই সত্যিটা কুদ্দুছ বুঝেছিল সেদিন।

অনেক দিন ধরেই বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো তাকে নিঃশ্বাস নিতে দিচ্ছিল না। প্রতিদিন ক্লাসে যাওয়া, প্রতিদিন সমাপ্তিকে দেখা, প্রতিদিন না বলা কথাগুলোর ভার—সব মিলিয়ে কুদ্দুছ যেন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিল।

ভয় ছিল।
ভয় যে খুব কম ছিল—তা না।
ভয় ছিল প্রচণ্ড।

স্যারের ভয়।
স্কুলের ভয়।
টিসির ভয়।
সম্মান হারানোর ভয়।

কিন্তু সেই ভয়গুলোর চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল একটা অনুভূতি—
সমাপ্তিকে না বলা ভালোবাসা।

সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই কুদ্দুছ বুঝেছিল, আজ কিছু একটা ঘটবে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা। মনে হচ্ছিল, আজ আর নিজেকে থামানো যাবে না। যত ভয়ই থাকুক, আজ কথা বলতেই হবে।

স্কুলে গিয়ে সে ঠিকমতো ক্লাস শুনতে পারেনি। বইয়ের পাতায় চোখ ছিল, কিন্তু মন ছিল সমাপ্তির দিকে। সে আজও আগের মতোই নীরব। বোরকা পরা, মাথা নিচু করে বসে আছে। শুধু মুখটা আর হাতের আঙুলগুলো দেখা যাচ্ছে।

আর ওই হাতের আঙুলগুলো—
কুদ্দুছের চোখ বারবার সেদিকেই চলে যাচ্ছিল।

ক্লাস শেষ হলো। ঘণ্টা বাজল। সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠল। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ গল্প করছে, কেউ বাড়ি যাওয়ার তাড়া।

কুদ্দুছ দাঁড়িয়ে রইল।

মনের ভেতর তখন দুইটা কণ্ঠস্বর লড়াই করছিল।

একটা বলছিল—
“থাম। আজ না। পরে বলবি।”

আরেকটা বলছিল—
“আজ না বললে আর কোনো দিনই বলা হবে না।”

হঠাৎ সে দেখল, সমাপ্তি গেটের দিকে এগোচ্ছে। বুকের ভেতর ধক করে উঠল। পা দুটো যেন নিজের ইচ্ছেতেই নড়ল। ভয় তখনো ছিল, কিন্তু সাহসটা ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল।

সব ভয়ভীতি পেরিয়ে
কুদ্দুছ গিয়ে দাঁড়াল
সমাপ্তির সামনে।

সময়টা যেন থমকে গেল।

চারপাশের শব্দ হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে এলো। স্কুলের কোলাহল, বন্ধুরা, ঘণ্টার আওয়াজ—সব যেন দূরে সরে গেল। তখন কেবল দুজন মানুষ, আর মাঝখানে জমে থাকা না বলা ভালোবাসা।

কুদ্দুছের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।
তবু সে কথা বলল।

“সমাপ্তি…”

নামটা উচ্চারণ করতেই বুকের ভেতর কাঁপন ধরল।

“আমি… আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

এই কথাটা বলতে তার কত বছর লেগে গেছে—তা সে নিজেও জানে না।

“আমি তোমার মায়ায় পড়ে গেছি। এমন মায়া—যেটা কাটাতে পারছি না। তোমাকে দেখলেই মনে একটা অদ্ভুত জোর পাই। নিজের ভেতর শক্তি পাই। কেন পাই, কবে থেকে পাই—আমি বুঝতে পারিনি।”

কথাগুলো এলোমেলো ছিল। গুছানো না। কিন্তু সেগুলো ছিল একদম সত্য।

সমাপ্তি কোনো কথা বলল না।

সে থেমে দাঁড়িয়ে রইল।
টেপ টেপ করে কুদ্দুছের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে কোনো রাগ ছিল না।
কোনো হাসিও না।
শুধু এক ধরনের গভীর নীরবতা।

কয়েক সেকেন্ড—না, কয়েকটা যুগের মতো সময়—সে তাকিয়ে রইল।

তারপর
কিছু না বলেই
সে ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে গেল।

একটাও শব্দ না।
একটাও প্রশ্ন না।
একটাও উত্তর না।

কুদ্দুছ দাঁড়িয়ে রইল।

চলে যাওয়া সমাপ্তির দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল—নীরবতাও অনেক সময় খুব ভারী হয়। এত ভারী যে, বুকের ভেতর চেপে বসে।

তারপরই ভয়টা এসে আছড়ে পড়ল।

“যদি স্যারকে বলে দেয়?”
“যদি সব শেষ হয়ে যায়?”
“যদি টিসি দিয়ে দেয়?”

এই ভাবনাগুলো কুদ্দুছের মাথায় ঝড়ের মতো ঘুরছিল।

সেদিন সে খুব ভয় পেয়েছিল।
অস্বাভাবিক রকম ভয়।

রাতে ঘুম এলো না। বারবার মনে পড়ছিল সমাপ্তির তাকিয়ে থাকা চোখ। সেই চোখ কি প্রশ্ন করছিল? না কি উত্তর লুকিয়ে রেখেছিল?

পরের দিন স্কুলে যেতে তার বুক কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, আজই সব জানা যাবে। আজই হয়তো স্যার ডাকবে। আজই হয়তো জীবনের দিক পাল্টে যাবে।

কিন্তু কিছুই হলো না।

স্যার আগের মতোই ক্লাস নিলেন। সমাপ্তি আগের মতোই নীরবে বসে থাকল। কেউ কিছু বলল না।

এই নীরবতা কুদ্দুছকে আরও অস্থির করে তুলল।

সে বুঝতে পারছিল না—এই চুপ থাকা কি না বলা সম্মতি? না কি আরও বড় ঝড়ের আগের শান্ত সময়?

দিন যেতে লাগল।

সমাপ্তি আগের মতোই থাকল। কিন্তু কুদ্দুছের মনে হতো—কিছু একটা বদলেছে। চোখে চোখ পড়লে সে আর আগের মতো দ্রুত চোখ সরিয়ে নিত না। খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও তাকিয়ে থাকত।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো কুদ্দুছের বাঁচার শক্তি হয়ে উঠল।

সে বুঝতে পারল—ভালোবাসা সব সময় কথা বলে না। কখনো কখনো সে নীরব থেকেও অনেক কিছু বলে দেয়।

তবু ভয় পুরোপুরি যায়নি।

প্রতিদিন সে ভাবত—আজ না কাল স্যার সব জেনে যাবে। আজ না কাল সব শেষ হবে।

কিন্তু ভালোবাসা তখন ধীরে ধীরে ভয়কে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।

কুদ্দুছ বুঝতে শুরু করল—
ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়ার আশা না।
ভালোবাসা মানে ঝুঁকি নেওয়া।
ভালোবাসা মানে ভয় নিয়েই সামনে এগোনো।

সেদিন সমাপ্তির সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের সবচেয়ে বড় ভয়কে জয় করেছিল।

উত্তর পায়নি—তবু হেরে যায়নি।

কারণ কিছু ভালোবাসা উত্তর পাওয়ার জন্য জন্মায় না।
কিছু ভালোবাসা জন্মায়
শুধু মনে থেকে যাওয়ার জন্য।

আর সমাপ্তি—
সে শুধু স্যারের মেয়ে ছিল না।
সে হয়ে উঠেছিল কুদ্দুছের সাহসের প্রথম পরীক্ষা।

এই গল্প এখানেই শেষ নয়।
নীরবতার ভেতর জমে আছে আরও অনেক কথা।
ভয়, ভালোবাসা আর অপেক্ষার আরও অনেক অধ্যায়।

চলবে…